ঢাকা, শনিবার, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

ট্রাভেলার্স নোটবুক

পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫৮)

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩২১ ঘণ্টা, এপ্রিল ৩, ২০২০
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫৮)

বাবর আলী। পেশায় একজন ডাক্তার। নেশা ভ্রমণ। তবে শুধু ভ্রমণ করেন না, ভ্রমণ মানে তার কাছে সচেতনতা বৃদ্ধিও। ভালোবাসেন ট্রেকিং, মানুষের সেবা করতে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের এই ডাক্তার হেঁটে ভ্রমণ করেছেন দেশের ৬৪ জেলা। সেটা আবার ৬৪ দিনে। কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা? সেটা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন বাংলানিউজের ট্রাভেলার্স নোটবুকে। ৬৪ দিনে থাকবে ৬৪ দিনের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা।

দিন ৫৮
নয় টিলা মাজার ( মিরসরাই, চট্টগ্রাম) - মানিকছড়ি ( খাগড়াছড়ি) = ৪১.১৬ কি. মি.

রাস্তায় নামতেই ঘন কুয়াশা। ফুট বিশেক দূরের জিনিসও দেখা যায় না ঠিকঠাক।

খানিকটা পথ এগিয়ে দিতে অনেক মাস পর এত ভোরে উঠলো মাহমুদ। ওর অবশ্য আশা কয়েক কিলোমিটার হাঁটলেই ওর উদীয়মান ভুঁড়িটা নাই হয়ে যাবে। সিএনজিতে নয় টিলা মাজার পৌঁছে ওখান থেকেই পায়ের উপর নির্ভরশীলতা শুরু। কুয়াশায় রাস্তা পুরোটা ভেজা। একটু এগোতেই শুরু হলো পাহাড়। নানা পাখির আওয়াজ শুনে চলছি পথ। আওয়াজ শুনি কিন্তু কুয়াশার কারণে পাখি অদেখাই থেকে যাচ্ছে। নিচে শ’খানেক ফুটের খাদগুলো মাঝে মাঝে দৃশ্যমান হচ্ছে। বিজিবি চেকপোস্টে থামালো এক জওয়ান। হরেক রকম প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তবেই মুক্তি। বেশিরভাগই অবান্তর প্রশ্ন। কিছু পরেই বামদিকে সঙ্গী হলো ছোট একটা ছড়া। বেশ চড়াই-উৎরাই এ পথে। বাইকারদের বড় একটা গ্যাং কুয়াশা ফুঁড়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

অসংখ্য সিএনজি আর কাঠবাহী ট্রাক এ পথে। কদাচিৎ দু-একটা যাত্রীবাহী বাস। বেশিরভাগই খাগড়াছড়িগামী। মিরসরাই উপজেলার সীমানা বিস্তৃত কয়লা বাজার পর্যন্ত। বালুটিয়া বাজার থেকে ফটিকছড়ি উপজেলার সীমানা শুরু। যে পাকা রাস্তা ধরে চলছি তাতে এসে মিশেছে অনেকগুলো ছোট ছোট লাল মাটির রাস্তা। বেশ নির্জন এই রাস্তা। তেমন কোনো বসতি নেই। এই রাস্তার বেশিরভাগ সেতুই বানানো হচ্ছে নতুন করে। শ্রমিকেরা অস্থায়ী টিনের ঘর বানিয়েছে পাশেই। এরা সংখ্যায় প্রচুর। সোনাই রাস্তার মাথা পেরিয়ে দাঁতমারা রাবার বাগান।

পাহাড়ি খাল।

হেঁয়াকো পশ্চিম বাজারের সামনে দিয়ে যাবার সময় হঠাৎ একজন নাম ধরে ডাক দিল। অপরিচিত মুখে ডাক শুনে আমি খানিকটা অবাক হয়ে এগিয়ে গেলাম ভদ্রলোকের দিকে। কাছে যেতেই চায়ের দোকানে নিয়ে বসিয়ে দিলেন তিনি। কথায় কথায় জানতে পারলাম উনি বাপ্পী ভাইয়ের বন্ধু। নাম মোস্তফা। হেঁয়াকো বনানী স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক। দেখতে উনি খানিকটা মুন্না ভাই এমবিবিএস মুভির ‘আনন্দ ভাই’ চরিত্রের মতো। বাপ্পী ভাই-ই বলে রেখেছিলেন আজ সকালে আমি এই রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করবো। আমার বেশ-ভূষা দেখে উনি আন্দাজ করে নিয়েছেন। নাশতা খেতে খেতে বেশ গল্প হলো। উনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার পথে।

হেঁয়াকো বাজার থেকে ডানে দাঁতমারার রাস্তায়। অল্প যেতেই দুইপাশে রাবার বাগান। গাছের কান্ডে লাগানো কালো পাতিলে সাদা রসের গড়িয়ে পড়া দেখতে দেখতেই পথচলা। এই রাবার বাগানের মাঝামাঝিতেই চোখে পড়লো একটা বধ্যভূমি। ইসলামপুর ছাড়িয়ে নিচিন্তার কাছেই ছোট্ট একটা চা বাগান।

রাস্তার পাশে সুন্দর একটা অ্যাগ্রো ফার্ম। ড্রোনের মতো দুটা যন্ত্র দিয়ে পানি ছিটানো হচ্ছে ফার্মে। দাঁতমারা বাজারের আগ পর্যন্ত লোকের কথায় নোয়াখালী-ফেনীর টান থাকলেও এরপরের লোকালয়গুলোতে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার টান প্রবল। রাস্তার দুপাশ সম্প্রসারণের কাজ চলছে বিধায় গাড়ি চলাচলের রাস্তা হয়ে গেছে সরু।

বটতলী বাজার হয়ে শান্তিরহাট। এখান থেকে বামে বড়ইতলীর রাস্তা। ইটের সলিন রাস্তা ধরেই পরের পথটুকু। হাঁটাপথে আজকের গন্তব্য মানিকছড়ির দূরত্ব কম হলেও আমি আজ অপেক্ষাকৃত বেশি দূরত্বের গাড়ির রাস্তা ধরেই হাঁটছি। পাহাড়ি এলাকায় নেটওয়ার্ক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়াই মূলত উদ্দেশ্য। নেটওয়ার্ক না থাকলে নেভিগেট করাটা বেশ সমস্যা। দুই ধারে অনেক আম-কাঁঠালের বাগান। অনেক দূর পর পর একেকটা বাড়ি। বেশ কয়েকটা ছোট পাহাড় চড়ে ফেলেছি ইতিমধ্যেই। সবকয়টা পাহাড়েই সামাজিক বনায়নের গাছ। লাল মাটির এইসব পাহাড়ে সামাজিক বনায়নের গাছ কেমন জানি লামা উপজেলার পাহাড়ের অনুভূতি দিচ্ছে।

রাবার বাগানের ভেতরের বধ্যভূমি।

শান্তিরহাটের পর থেকেই মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই। তবে সুখের ব্যাপার হলো জিপিএসের সৌজন্যে গুগল ম্যাপের ডিরেকশনটা কাজ করছে। রাস্তা থেকে বেশ নিচে আছে কিছু ঘর-বাড়ি। এ বাড়িগুলোর সঙ্গেই আছে সমতল ফসলি জমি। দুটা চড়াইয়ের পর একটা উৎরাই। তারপরেই সমতল জায়গাতে কালাপানি নতুন বাজার।

এখান থেকেই খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি উপজেলায় প্রবেশ করলাম। ইটের সলিন রাস্তা শেষে পিচ রাস্তাও এখান থেকে শুরু। এদিকে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। সব বাড়ির উপরেই শোভা পাচ্ছে সোলার প্যানেল। রাস্তায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আধিক্য। বেশ আগ্রহ নিয়েই তাকাচ্ছে আমার দিকে। দক্ষিণ কালাপানিতে বড় একটা জায়গাজুড়ে সেমুতাং গ্যাস ক্ষেত্র। তার পরপরই একটা খাল। গভীরতা বেশি না হলেও বেশ প্রশস্ত খাল। খালের উপরের সেতু ছাড়িয়ে কিছুটা সামনে যোগ্যাছোলা বাজার।

বাজারের পর থেকে পাকা রাস্তা শেষে আবারো ইটের সলিন। এখানে দাপট পাহাড়ি পাঠাও সার্ভিসের। মোটরসাইকেলই মোটামুটি একমাত্র বাহন হিসেবে রাজত্ব করছে এ রাস্তায়। সুন্দর একটা পাহাড়ি খাল লাগোয়া দশখিল পাড়া। চড়াই-উৎরাইয়ের ভাঙা রাস্তায় খুব নির্বিকারচিত্তে ৪ জন নিয়েই চলছে মোটরসাইকেল। যাত্রী-চালক কারোই এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই। শনিবার মানিকছড়িতে বাজারের দিন বলে মোটরসাইকেলও সংখ্যায় বেশি।

কুয়াশামাখা পাহাড়ি পথ।

চেংগুছড়া বাজার থেকে পেয়ে গেলাম পাকা রাস্তা। এদিকে মূলত দুধারেই আছে আকাশমণি গাছ। কিছুদূর পর টানা আনারস বাগান। যাত্রাপথে মোটামুটি প্রত্যেকটা মোটরসাইকেলওয়ালা আমাকে দেখে সমূহ অর্থপ্রাপ্তির আশায় দাঁড়িয়ে পড়ছে। সবাইকে আমি হাসিমুখে নিরাশ করছি। দক্ষিণ একসত্যা হয়ে বিকেল চারটা নাগাদ মানিকছড়ি বাজার।

আজকে রাতে ফরহাদ ভাইয়ের বাসাতেই আমার অতিথি হবার কথা। আমার মোবাইলে নেই নেট আর ফরহাদ ভাইয়ের মোবাইলে ঢুকছে না কল। পুরো মানিকছড়িতেই সকাল থেকে ইলেক্ট্রিসিটি নেই। সাথে মোবাইল নেটওয়ার্কও নেই। চায়ের দোকানে দু কাপ চা পান করে দোকান থেকে বের হতে যাব এমন সময় এলেন ফরহাদ ভাই। আরও এক কাপ চায়ে চুমুক দিয়ে উনার বাড়িতে। তার বাড়ির ঠিক পেছনেই লাল মাটির পাহাড় আর পাশ ঘেঁষে বেশ বড় একটা পাহাড়ি খাল।

চলবে...
 

আরও পড়ুন
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫৭)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫৬)
**পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫৫)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫৪)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫৩)
**পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫২)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫১)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫০)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৯)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৮)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৭)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৬)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৫)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৪)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৩)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪২)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪১)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪০)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৯)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৮)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৭)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৬)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৫)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৪)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৩)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩২)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩১)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩০)​
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৯)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৮)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৭)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৬)​
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৫)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৪)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৩)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২২)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২১)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২০)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৯)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৮)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৭)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৬)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৫)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৪)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৩)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১২)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১১)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১০)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৯)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৮)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৭)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৬)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (দিনাজপুর-৩)
** পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা (ঠাকুরগাঁও-২)
** পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা (পঞ্চগড়-১)

বাংলাদেশ সময়: ১৩২০ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৩, ২০২০
এইচএডি/

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa