ঢাকা, শনিবার, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

ট্রাভেলার্স নোটবুক

পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫৫)

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১০০৩ ঘণ্টা, মার্চ ৩০, ২০২০
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫৫)

বাবর আলী। পেশায় একজন ডাক্তার। নেশা ভ্রমণ। তবে শুধু ভ্রমণ করেন না, ভ্রমণ মানে তার কাছে সচেতনতা বৃদ্ধিও। ভালোবাসেন ট্রেকিং, মানুষের সেবা করতে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের এই ডাক্তার হেঁটে ভ্রমণ করেছেন দেশের ৬৪ জেলা। সেটা আবার ৬৪ দিনে। কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা? সেটা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন বাংলানিউজের ট্রাভেলার্স নোটবুকে। ৬৪ দিনে থাকবে ৬৪ দিনের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা।

দিন ৫৫
ভোলা-মজু চৌধুরীর হাট (লক্ষ্মীপুর)-নোয়াখালী= ৪২.৭০ কিমি


ভোলাতে নাঈম ভাইদের বাড়িটার নাম বাকলাই বাড়ি। কোনো ঝরনার নামে নতুন নামকরণ, এমনটা ভাবার অবকাশ নেই।

বহু পুরনো বাড়ি, বহু পুরনো নাম। ভোলা এমন একটা জায়গায় অবস্থিত যেখান থেকে আশপাশের অন্য কোনো জেলায় সড়ক যোগাযোগ নেই। যেহেতু আগেরদিন লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরী হাট হয়েই এসেছি, তাই পরিকল্পনা ছিল অন্য কোনোদিক হয়ে এখান থেকে বেরুবার।  

স্বাধীনতা জাদুঘর, ভোলা। আমার পছন্দ ছিল দৌলতখান হয়ে চর আলেকজান্ডার। কিন্তু লঞ্চের টাইমিং শুনে দমে যেতে হলো। তার উপর নাঈম ভাই আর তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী যাবেন চট্টগ্রাম। ওনার মজু চৌধুরী ঘাট হয়েই যাবেন। নাঈম ভাই-ই অনুরোধ করলেন একসঙ্গে যেতে। সেটাই সই।

ইলিশা ঘাট থেকে লঞ্চে ওঠা শেষ তিন যাত্রী ছিলাম আমরা তিনজন। আমরা লঞ্চে ওঠামাত্রই ঘাটে বেঁধে রাখা দড়িটা তুলে নেওয়া হতেই লঞ্চ ছেড়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো দুলুনি আর হাওয়ার দাপট। এরকম কাছাকাছি মাত্রার রোলিং পেয়েছি বর্ষার শেষদিকে সেন্ট মার্টিন্স গিয়ে। কোনো জায়গায় ঠেস দিয়ে না দাঁড়িয়ে কিংবা কিছু না ধরে দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছিল না। একেক দুলুনিতে বড়সড় লঞ্চটা একবার ডানে, একবার বামে কাত হচ্ছে। গতকাল যখন এই নদী ধরেই ভোলা এসেছি তখন আমি লঞ্চে ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। সেসব এখন অসম্ভব কল্পনা বলেই মনে হচ্ছে। মিনিট ত্রিশেক পরে অবশ্য নদী বেশ শান্ত। লঞ্চের ছাদে বসে কাটিয়ে দিলাম বাকি সময়টা। মজু চৌধুরী ঘাট থেকে নাঈম ভাই আর তার স্ত্রী উঠে গেলেন চট্টগ্রামের বাসে আর আমি পা চালালাম নোয়াখালী পানে।

সী ট্রাকের ছাদ। মজু চৌধুরী ঘাট থেকে যখন হাঁটা শুরু করেছি তখন ঘণ্টার কাঁটা এগারোটা পেরিয়েছে। এ যাত্রায় পদযাত্রা শুরু করতে এত দেরি আর কখনো হয়নি। ভোলা বেশ ভালোই পরীক্ষা নিচ্ছে। একটু সামনে এগিয়েই মহাসড়ক ছেড়ে ছোট রাস্তা ধরে পথ। এ পথের প্রথমদিকের কিছু অংশ ইটের সলিং আর বাকিটুকু মাটির। বিক্রমপুর ধাঁচের টিনের বাড়ি এদিকেও আছে বেশ। আর বাড়ির সামনে কিছু থাকুক না থাকুক খড়ের গাদা থাকবেই। প্রচুর সুপারি গাছ বসতবাড়ির আশপাশে। এক পিচ্চির তরতর করে সুপারি গাছ বেয়ে উঠে যাওয়া দেখে আমি হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম কিছুটা সময়। কি রিফ্লেক্স আর কি দ্রুততার সঙ্গে উঠে গেলো ছেলেটা। চলতে শুরু করা নাগাদ চারপাশ থেকে প্রচুর প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে। মনে হচ্ছিল পরীক্ষার ভাইভা দিতে বসেছি। প্রফেসররা কঠিন সব প্রশ্ন ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে করছেন। বারকয়েক শুনতে হলো - 'কি ভাই? কিয়া বেঁচেন?' এক পর্যায়ে মেজাজ খারাপ হয়ে একজনকে বলেই ফেললাম- আমি কি আপনাকে বলেছি আমি কিছু বেঁচি?

এই রাস্তাটা বেশ সরু। খড় বোঝাই একেকটা ভ্যান যাচ্ছিল আর আমি তাদের সাইড দিতে পার্শ্ববর্তী বিলের কোণায় চলে যাচ্ছিলাম। পুরো রাস্তাজুড়ে খড় আর খড়। রাস্তার উপর বেশ কয়েক ইঞ্চি পুরু করে শুকোতে দেওয়া। এর মধ্যে দিয়ে হাঁটাই মুশকিল। আজ সকাল থেকেই বেশ হাওয়া চলছে।  

মজু চৌধুরী ঘাট সন্নিকটে। একেকটা বাতাস আসে আর হালকা কাঁপুনি উপহার দিয়ে চলে যায়। টুমচরের জনতা বাজারে এক টমটমওয়ালা তার যাত্রীকে আমাকে দেখিয়ে বলল, 'এই ব্যাডা টাওয়ারের কাম করে!' নিমতলা বাজার পার হয়ে আবির নগরের কাছে লক্ষ্মীপুর-রামগতি সড়কে উঠে শান্তি। এই প্রথম বড় রাস্তায় উঠে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। সকাল থেকে ছেলে-বুড়ো সবাই মিলে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলেছে আমাকে। এরকম কৌতূহল সবশেষ দেখেছিলাম যশোর- চুয়াডাঙ্গার দিকের লোকের।

ওয়াপদা খালের ওপরে পিয়ারাপুর সেতু পার হয়ে ভবানীগঞ্জ। ভবানীগঞ্জ চৌরাস্তা থেকে মোড় নিলাম বামে। কিছুদূর এগোতেই তেওয়ারীগঞ্জ বাজার। ভবানীগঞ্জ থেকে তেওয়ারীগঞ্জের রাস্তা পিচ হলেও এরপরের রাস্তাটুকু পিচ হবার প্রতীক্ষায়। আপাতত খোয়া আর বালি মেশানো পথ। শান্তিরহাটের কাছাকাছি একটা ট্রাক পানি ছিটিয়ে যাচ্ছে পুরো রাস্তায়। তাই বালির রাস্তা হলেও রাস্তায় নেই ধূলাবালি। লোকাল দোকান থেকে অপেক্ষাকৃত বড় রাস্তা ছেড়ে আরো ছোট রাস্তায় ঢুকলাম। বিশাল লম্বা বেশ কিছু ঝাউগাছ দেখলাম এ পথে। সাধারণত সমুদ্র সৈকতেই ঝাউগাছ দেখে অভ্যস্ত আমরা। এখানে এই গাছ দেখে খানিকটা অবাকই হলাম। তাও আবার সেগুলোর দৈর্ঘ্য ভিরমি খাওয়ার মতোই। আন্নে কে? কোনায় যাইবেন? - যেতে যেতে এই দুটো প্রশ্ন শুনতে শুনতে কান পচে গেল। এদিকের কিছু বিলে এখনো ধান কাটা হয়নি। অথচ দেশের অন্যান্য জায়গায় ধান কাটা শেষে অন্য ফসল লাগানোর তোড়জোড় এখন।

খলিশাটোলা পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা। নোয়খালী সদর উপজেলায় প্রবেশ করলাম নতুন হাট থেকে। 'বীথি, তুই বাইত যা। আর হেরাইভেট আছে' (বীথি, তুই বাড়িতে যা। আমার প্রাইভেট আছে) - এই জেলায় প্রবেশ করেই কর্ণকুহরে প্রবেশ করা প্রথম বাক্য হলো এটা। যে রাস্তা ধরে পথ চলছি তার নাম ইসলামিয়া রোড। বৈকুণ্ঠপুর বাজার ছাড়িয়ে নলুয়ার কাছাকাছি আসতেই দিনের আলো মরে এলো।  

খড় বিছানো রাস্তা। এতক্ষণ খোয়া মেশানো রাস্তায় চললেও হাকিমপুর বাজার থেকে আবার পাকা রাস্তা। মোবাইলের টর্চ লাইট জ্বালিয়ে পথ চলছি। একে একে পেরিয়ে এলাম ইসলামগঞ্জ বাজার, সালেহপুর বাজার, মইশপুর বাজার। মাইজদী পৌঁছালাম সাড়ে আটটা নাগাদ। মাইজদীর গ্র‍্যান্ড রেস্টুরেন্টের সামনে আমাকে রিসিভ করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন বন্ধু নাহিয়ানের অফিস সহকারী সাইদ।  

নাহিয়ান নোয়াখালীতে কর্মরত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে। গতকাল রাতে হঠাৎ ওর চাচা মারা যাওয়ায় ও আজ দুপুর নাগাদ চলে গেছে চট্টগ্রাম। যাওয়ার আগে সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। গ্র্যান্ডে হালিম-রুটি খেয়ে সোজা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে। এখানেই চারতলার একটা গোছানো ঘরে থাকে সে। আমি থাকবো ওর ঘরেই। বেশ তোফা ব্যবস্থা। অফিস সহকারী টিফিন ক্যারিয়ারে রাতের খাবার দিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেল - 'এইখানে স্যার কোনো সমস্যা নাই। শুধু একটাই সমস্যা রাতে বাইর হইতে পারবেন না। ' আমি মনে মনে বললাম, আমি ঘুম থেকে বেরোতে পারলে তবেই না বাইরে বেরোতে যাবো!

চলবে...

আরও পড়ুন...

** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫৪)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫৩)
**পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫২)
 ** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫১)
 **  পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫০)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৯)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৮)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৭)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৬)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৫)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৪)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪৩)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪২)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪১)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪০)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৯)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৮)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৭)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৬)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৫)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৪)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৩)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩২)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩১)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩০)​
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৯)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৮)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৭)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৬)​
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৫)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৪)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৩)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২২)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২১)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২০)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৯)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৮)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৭)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৬)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৫)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৪)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৩)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১২)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১১)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১০)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৯)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৮)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৭)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৬)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪)
** পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (দিনাজপুর-৩)
** পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা (ঠাকুরগাঁও-২)
** পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা (পঞ্চগড়-১)

বাংলাদেশ সময়: ০৯৪৭ ঘণ্টা, মার্চ ৩০, ২০২০
এএ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa