ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২১ মে ২০২৪, ১২ জিলকদ ১৪৪৫

শিল্প-সাহিত্য

প্রতিদিনের ধারাবাহিক

টানেল | এর্নেস্তো সাবাতো (৩৩) || অনুবাদ: আলীম আজিজ

অনুবাদ উপন্যাস / শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৪১৭ ঘণ্টা, নভেম্বর ৫, ২০১৪
টানেল | এর্নেস্তো সাবাতো (৩৩) || অনুবাদ: আলীম আজিজ অলঙ্করণ: মাহবুবুল আলম

___________________________________

এর্নেস্তো সাবাতো (২৪ জুন ১৯১১-৩০ এপ্রিল ২০১১) আর্জেন্টাইন লেখক এবং চিত্রকর। লেখালেখির জন্য পেয়েছেন লিজিওন অফ অনার, মিগুয়েল দে সেরভেন্তেস পুরস্কার।

এছাড়াও তিনি ছিলেন লাতিন আমেরিকান সাহিত্য জগতের বেশ প্রভাবশালী লেখক। তাঁর মৃত্যুর পর স্পেনের এল পায়েস—তাঁকে উল্লেখ করেন ‘আর্জেন্টিনাইন সাহিত্যের শেষ ধ্রুপদী লেখক’ বলে।
‘এল তুনেল’ (১৯৪৮), ‘সবরে হেরোস ইয়া টুম্বাস’ (১৯৬১), ‘অ্যাবানদন এল এক্সতারমিনাদোর’ (১৯৭৪) তাঁর জগদ্বিখ্যাত তিন উপন্যাস।
___________________________________

৩২তম কিস্তির লিংক

(৩৩তম কিস্তি)
চিৎকার করতে গিয়ে জেগে উঠলাম। স্টুডিওর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি। স্বপ্নে এরকমই দেখলাম। আরও কয়েকজন লোক, আমিসহ, এক লোকের বাসায় আসার কথা, বাড়ির কাছে পৌঁছে দেখলাম, বাইরে থেকে অন্য আর দশটা বাড়ির মতোই এটাও, ভেতরে ঢুকলাম। তবে বাড়ির ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আমার এরকম অনুভূতি হল যে এটা একেবারে একরকম না, অন্য আর দশটা বাড়ি থেকে এটা বেশ আলাদাই। বাড়ির মালিক বলল:
‘আমি আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছি। ’
তখুনি আমার সন্দেহ হল আমি কোনো একটা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছি, পালানোর চেষ্টা চালালাম। অনেক কসরৎ করলাম, কিন্তু দেরি হয়ে গেছে বেশ: দেখলাম আমার শরীর আর আমার নির্দেশ মানছে না। হাল ছেড়ে দিলাম বাধ্য হয়েই, তারপর নিজেকে প্রস্তুত করলাম এ রকম করে দেখি না কী ঘটে, যেন এর সঙ্গে আমার কোনো সর্ম্পক নেই।

লোকটা আমাকে পাখিতে পরিণত করতে শুরু করল, মানুষ-সমান এক পাখি। আমার পায়ের দিক থেকে শুরু করল সে: আমি দেখলাম আমার পা ক্রমশ মোরগের পায়ের থাবার মতো হয়ে যাচ্ছে। তারপর আমার পুরো শরীর পাল্টাতে শুরু করল, পা থেকে উপরের দিকে, অনেকটা চৌবাচ্চার পানি যেমন উপরের দিকে উঠতে থাকে। বুঝলাম আমার একমাত্র ভরসা বলতে এখন, আমার বন্ধুরা, কিন্তু ওরা, কোনো অব্যাখ্যাত কারণে, এখনও এসে পৌঁছায়নি। শেষে ওরা যখন এসে পৌঁছাল, ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটল: ওরা আমার এই রূপান্তর খেয়ালই করল না। একদম স্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করলো ওরা, যাতে এটাই প্রমাণ হয় আমাকে বরাবরের মতোই দেখাচ্ছে। নিশ্চিত বুঝলাম ওই জাদুকরী লোকটা এমন কোনো মন্ত্রজাল তৈরি করেছে যে কারণে আমাকে ওরা একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবেই দেখছে, আমি দ্রুত সঙ্কল্প করলাম আমার যে এ অবস্থা করেছে লোকটা—ওদেরকে এটা খুলে বলতে হবে। ঠাণ্ডা মাথায় এই অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার কথা জানাতে হবে ওদের—কারণ আমার হঠকারী কোনো পদক্ষেপের কারণে দেখা গেল পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে মোড় নিল, এতে জাদুকর লোকটা দেখা গেল আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল (এ কারণে আরও ক্ষতিকর কিছু একটা করে বসল সে)— কিন্তু আমি যখন কথা বলতে শুরু করলাম, দেখি তারস্বরে কথা বেরুচ্ছে আমার গলা থেকে। তখন দুটো ব্যাপার আমাকে একেবারে বিস্ময়াভিভূত করে ফেলল: যেসব শব্দ আমি বলতে চাচ্ছি তা কেমন চিৎকার হয়ে বেরিয়ে আসছে, আমার কানে এই  চিৎকারকে মনে হচ্ছে অসম্ভব মরিয়া আর ভিনদেশী, এর কারণ এমন হতে পারে যে তখনও হয়তো আমার মধ্যে মানুষের কিছুটা হলেও অবশিষ্ট আছে, কিন্তু, এর অশেষ ক্ষতিকর দিকটা হল, আমার বন্ধুরা এই চিৎকারের কিছুই শুনতে পাচ্ছে না, ওরা ঠিক যেমন আমার বিশালাকৃতির এই পাখি-শরীরটাকেও দেখতে পাচ্ছে না। উল্টো, ওদের দেখে মনে হচ্ছে ওরা আমার স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরেই স্বাভাবিক সব কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছে, কারণ ওদেরকে একটুও বিস্মিত দেখাচ্ছে না। আতঙ্কে, নীরব হয়ে গেলাম আমি।

বাড়ির মালিক লোকটা চোখের কোণে কেমন অবোধ্য, এক উপহাসের দৃষ্টি ফুটিয়ে দেখছে আমাকে—যে কোনো কারণেই হোক, ওটা শুধু আমিই দেখতে পাচ্ছি। আমি তখনই বুঝলাম যে কারো পক্ষেই কোনোদিন আর জানা সম্ভব হবে না, যে আমি একটা পাখিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছি। মৃত্যু ঘটে গেছে আমার; আমার সঙ্গে সঙ্গে এই গোপনীয়তাটুকুও কবরে চলে যাবে।

(চলবে)

৩৪তম কিস্তির লিংক



বাংলাদেশ সময়: ১৪১৭ ঘণ্টা, নভেম্বর ৫, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।