ঢাকা, সোমবার, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৬ মে ২০২২, ১৪ শাওয়াল ১৪৪৩

ফিচার

৫ম পর্ব

জগৎশেঠকে সপরিবারে হত্যা করা হয় যে প্রাসাদে

এরশাদুল আলম প্রিন্স, ল’ এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৪০৩ ঘণ্টা, এপ্রিল ১১, ২০১৭
জগৎশেঠকে সপরিবারে হত্যা করা হয় যে প্রাসাদে মুর্শিদাবাদের পথে পথে

মুর্শিদাবাদ ঘুরে: লক্ষীপৎ, জগপৎ, মহীপৎ ও ধনপৎ- এই চার ভাইয়ের কিসের ব্যবসা ছিলো তা সঠিক জানা যায় না। কেউ বলে, তারা বর্গি-দস্যু ছিলেন আবার কেউ বলে তারা ছিলেন বহুমূল্যবান মণি-মুক্তার ব্যবসায়ী।  

ব্যবসায়ী হওয়ায় মুর্শিদাবাদের অন্যতম ধনপতি জগৎশেঠের সঙ্গে তাদের ছিলো দহরম-মহরম। তাই জগৎশেঠেরই সহায়তায় চার ভাই নবাবের কাছ থেকে  ১২শ টাকায় এই বিশাল প্রাসাদ সংলগ্ন এলাকা কিনে নেন।

 

কি ছিলো না এই প্রাসাদে? হেরেম, জলসাঘর, মন্দির, বাগান, পুকুর, পাইক-পেয়াদা, বরকন্দাজ, শাহী-লস্কর আরও কতো কী! আজ শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই প্রাসাদ ও বাগান। সেই সঙ্গে রয়ে গেছে ইতিহাস।  

নবাবের কাছে মন্দির বানানোর কথা বলে এই জমি নেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী মন্দির নির্মাণও হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এখানে তারা গড়ে তুলেছিলেন মুর্শিদাবাদের সেরা ফুলের বাগান।  

কাঠগোলা প্রাসাদের প্রধান ফটক

চারপাশে শাহী ফুলের বাগান, প্রধান ফটকে শাহী লস্কর আর ভেতরে মন্দির। এ যেনো এক স্বর্গের টুকরা। বোঝার উপায় নেই যে, এর আড়ালে অন্য কিছু হতে পারে।  

বাগানের মাঝেই রয়েছে উঁচু একটি মঞ্চ। এটিই ছিলো নাচঘর বা জলসাঘর। সেই আমলে জগৎশেঠ বা অন্য শেঠরা এখানে এসে একটু জিরিয়ে যেতেন। একটু ফুলের সুবাস, সুরা ও সঙ্গে নাচ-গান —শেঠজিদের এ ছিলো এক রুটিন কাজ। সেই সঙ্গে ব্রিটিশ বাবুদেরও আনাগোনা ছিলো এই প্রাসাদে।  

বাবুদের মনোরঞ্জনের জন্য ভারতবর্ষের সেরা-সেরা বাঈজিদের এখানে আনা হতো। তারা বাবুদের আমোদ-ফূর্তিতে ভাসিয়ে দিয়ে নিজেরাও আয়-রোজগার করে বাড়িতে ফিরতেন। সে আমলের হীরাবাঈও নাকি এখানে আসতেন। হীরাবাঈ যে এখানে আসতেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় জগৎশেঠের বাড়ি থেকেই। জগৎশেঠের বাড়িতে হীরাবাঈয়ের ছবিও রয়েছে।  
 নাচঘর

এই প্রাসাদে যে একটি গুপ্ত পথ রয়েছে তা আগেই বর্ণিত হয়েছে। এই গুপ্তপথ দিয়ে দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জগৎশেঠের বাড়িতে যাওয়া যেতো। শুধু তাই নয়, বলা হয়, এ গুপ্তপথ ভাগীরথী নদীর সঙ্গেও নাকি সংযুক্ত।  

এই গুপ্তপথ দিয়ে জগৎশেঠের বাড়িতে যাওয়ার কথা সত্যি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, জগৎশেঠের বাড়িতেও একটি গুপ্তগুহার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা এখনও বিদ্যমান।  

আবার গুপ্তগুহার সঙ্গে যে ভাগীরথী নদীর সংযোগ রয়েছে তাও বোঝা যায়। কারণ, ভাগীরথীর জোয়ার ভাটায় এ গুপ্তপথেও পানির ওঠা-নামা হয়।  

পুকুর পাড় থেকে প্রাসাদ

জানা যায়, ফুলের বাগানের আড়ালে ধনপতি ভাইরা চোরা-কারবারি করতেন। নবাবের দৃষ্টির আড়ালেই চলতো এসব বাণিজ্য। সহযোগিতায় ছিলো রাজ-কর্মচারী জগৎশেঠ। বাণিজ্যসূত্রে এখানে ইংরেজ বাবুদেরও আনা-গোনা ছিলো। আনাগোনা হতো রাজপুরুষ ও বহু রইস আদমিদের। ফুলের বাগান ও মন্দিরের আড়ালে অবৈধ ব্যবসায় সরগরম ছিলো এই প্রাসাদ।

শেঠরা ব্যবসা করতে গিয়ে ঝামেলায় পড়লে এই গুপ্তগুহা দিয়ে ভাগীরথীর দিকে ধনরত্ন নিয়ে পালিয়ে যেতে পারতেন, অথবা অন্য কোনো আস্তানায়ও যেতে পারতেন।  

আলীবর্দির সময় থেকেই ইংরেজদের সঙ্গে নবাবের দূরত্ব বাড়তে থাকে। আলীবর্দির মৃত্যু হলে সিরাজউদ্দৌলা মসনদে বসেন। কিন্তু তাতে ইংরেজদের সঙ্গে নতুন নবাবের সম্পর্কের কোনো উন্নতি হয়নি। বরং, স্বার্থের জন্য জগৎশেঠ, মীরজাফর ও উমিচাঁদরা ইংরেজদের সঙ্গেই তলে তলে হাত মেলালেন। ইতিহাস বলে, ইংরেজদের সঙ্গে মীরজাফর গংদের মিলিত হওয়ার অন্যতম আখড়া ছিলো এ প্রাসাদ।  

জগৎশেঠের বাড়ি যাওয়ার জন্য গুপ্তপথ

কিন্তু বর্তমানে সৌন্দর্যের আড়ালে ইতিহাস ঢেকে ফেলার এক সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা লক্ষ্যণীয় এ প্রাসাদে। শুধু এখানেই নয়, এ প্রচেষ্টা মুর্শিদাবাদের সর্বত্র। ইতিহাস আড়াল ও বিকৃত করার এক মহাযজ্ঞ চলছে মুর্শিদাবাদে। ষড়যন্ত্রকারীদের পরবর্তী বংশধররাই তা করছে বা করাচ্ছে। কিন্তু তাতে হতাশ হওয়া কিছু নেই কারণ, সাধারণ মানুষ ও পর্যটকরা এতে মোটেই বিভ্রান্ত হন না।  

পলাশী ও পলাশী পরবর্তী অনেক হটকারী ঘটনারই সাক্ষী এ প্রাসাদ ও বাগানবাড়ি।  

প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে একটি বড় কামরায় বিরাট একটি টেবিল আর গদি চেয়ার। এখানে শেঠজিরা বসে ব্যবসায়িক আলাপ-আলোচনা করতেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধ জয়ের তিনদিন পর এই প্রাসাদের এই টেবিল ঘিরে বসে মীরজাফর, জগৎশেঠ, উমিচাঁদের সঙ্গে দুই ইংরেজ রাজপুরুষ উইলিয়াম ওয়াটস ও ওয়ালশের বৈঠক হয়। এ বৈঠকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ষড়যন্ত্রকারীরা লাভ-লোকসানের শর্ত নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেন।  

বাগান থেকে প্রাসাদ 

এখানে বসেই উইলিয়াম ওয়াটস ও ওয়ালশ পলাশীর বিশ্বাসঘাতকদের পূর্ব শর্তমোতাবেক যার যার পুরস্কার বুঝিয়ে দেন। তাই এই টেবিল ও প্রাসাদ বিশ্বাসঘাতক-বেইমানকে পুরস্কৃত করার এক কলঙ্কিত স্থান।

ধারণা করা হয়, এ বাড়িটি মূলত জগৎশেঠেরই বাড়ি ছিলো। জগৎশেঠ, মীর জাফর ও ইংরেজরা এখানে বসেই বাংলার নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু পাপ কাউকে ছাড়ে না..। স্বার্থ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মীর জাফরের ছেলে মীর কাসিম ১৭৬৩ সালে জগৎশেঠকে সপরিবারে এখানেই হত্যা করেন।  

তারপর একশো বছরেরও বেশি কাল বাড়ির সবকিছুই বন্ধ ছিলো। ১৮৭০ সালে লক্ষ্মীপতি সিং দুগার এটিকে আবার খুলে দেন ও বর্তমান প্যালেসটি পুনর্নির্মাণ করেন।

বাংলাদেশ সময়: ১০০৫ ঘণ্টা, এপ্রিল ১১, ২০১৭
এসএনএস 

**
আগের পর্ব পড়ুন-
** ১ম পর্ব: এক যে ছিলো মুর্শিদাবাদ
** ২য় পর্ব: কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ
** ৩য় পর্ব: মানুষ যে হায় ভুলে গেছে চির মধুর ভালোবাসা
** ৪র্থ পর্ব: চার ভাইয়ের বাগান বিলাস ও একটি গুপ্তপথ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa