ঢাকা, বুধবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২২ মে ২০২৪, ১৩ জিলকদ ১৪৪৫

প্রবাসে বাংলাদেশ

পারিশ্রমিক-বঞ্চিত জাহাঙ্গীর আজ হোটেল-রিসোর্টের মালিক

জাহিদুর রহমান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৫৪১ ঘণ্টা, এপ্রিল ১২, ২০১৭
পারিশ্রমিক-বঞ্চিত জাহাঙ্গীর আজ হোটেল-রিসোর্টের মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন

পাতায়া (থাইল্যান্ড) থেকে: ছিলেন দর্জিদোকানের সামান্য কর্মচারী। দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করেও প্রথম দিকে জুটতো না পারিশ্রমিক।তিন মাস কাজ করিয়েও বেতন দেয়নি মালিক। এমন হাজারো বঞ্চনার শিকার সেই মানুষটিই আজ বিলাসবহুল হোটেল আর রিসোর্টের মালিক। গল্প নয়, সত্যি।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডের পাতায়ায় সাফল্যের এই আলো জ্বেলেছেন বাংলাদেশের সন্তান জাহাঙ্গীর হোসেন (৫৩)। সততা, নিষ্ঠা আর একাগ্রতাই তাকে পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের চূড়ায়।

অনেকের কাছে তিনি আদর্শ। আপদে-বিপদে আপনজন। একারণে আজ তিনি ছিমছাম থাই পর্যটনশহর পাতায়ায় বাংলাদেশ কমিউনিটির সভাপতি।

অথচ প্রথম জীবনের গল্পটাই অসাধারণ সংগ্রামের। সঙ্গে ছিল সীমাহীন বঞ্চনা। সেসব ঠেলেই উঠেছেন সাফল্যের চূড়ায়। সৈকতনগর পাতায়ায় গড়ে তুলেছেন রিসোর্ট, আন্তর্জাতিক মানের চার-তারকা "ইউনিক রিজেন্সি পাতায়া" হোটেল।

নির্মাণের পথে একই এলাকায় পাঁচ তারকা আরেকটি আন্তর্জাতিক মানের হোটেল। রয়েছে রিয়েল এস্টেট ব্যবসাসহ নানা ব্যবসা।

বাবা মৃত আজগর আলী সরকার। বাড়ি কুমিল্লা শহরের পুলিশলাইন সংলগ্ন ছোটরা মহল্লায় হলেও দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট জাহাঙ্গীর হোসেনের শৈশব ও বেড়ে ওঠা ঢাকার খিলগাঁও থানার শাজাহানপুরে।

জগন্নাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেই শুরু করেন ঠিকাদারি। শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগে ঠিকাদারিতে তেমন সুবিধে করতে না পেরে ভাগ্য-অন্বেষনে ১৯৯০ সালে পাড়ি দেন থাইল্যান্ডে। ইচ্ছে ছিলো, সেখান থেকেই পাড়ি দেবেন জাপানে।

ছয় মাস ধরে চেষ্টা করেও জাপানের ভিসা না পেয়ে যখন হতাশ, তখন ইকবাল নামের এক বন্ধু খোঁজ দিলেন পাতায়ায় থাকা জসিম উদ্দিন খান মাসুদের। সেখানে আড়াই হাজার "বাথ" বেতনের সামান্য কর্মচারী হিসেবে যোগ দিলেন জসিম উদ্দিন খান মাসুদের দর্জিদোকানে।

"তিন মাস খাটিয়ে মেরেছে। তবু একটি টাকাও পারিশ্রমিক পাইনি। কেবল বাংলাদেশিই নয়। ভারতীয় ও থাই মালিকানাধীন বিভিন্ন দোকানমালিকরাও নিয়েছে এমন অসহায়ত্বের সুযোগ। হয় পারিশ্রমিক দেয়নি, নয়তো এখানে বৈধভাবে থাকার বন্দোবস্ত করে দেবার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েও পরে তা রাখেনি।

এভাবে অতীত বঞ্চনার এমন অনেক কথাই তুলে আনছিলেন জাহাঙ্গীর হোসেন। এক ফাঁকে জানালেন প্রেম ও বিয়ের কথাও: ভালোবেসে বিয়ে করি এখানকার নাগরিক সুনান হোসেনকে।

এক পর্যায়ে ৫০ হাজার বাথ খরচে বৈধভাবে থাকার বন্দোবস্ত করার শর্তে কাজ নিলাম একটি দর্জিদোকানে।

প্রতি মাসে বেতন থেকে কাটা হতো খরচের টাকা। শর্ত মতো দু'বছর কাজ করে ১৯৯৪ সালে নিজেই দিলাম কোয়েল ফ্যাশন নামের একটি দর্জিদোকান। তেমন পূঁজি ছিলো না বলে ব্যস্ততম এলাকায় দোকান নিতে পারিনি।

পরের বছর কাস্টমারদের অর্ডার আনতে চলে গেলাম ইউরোপে। প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য এভাবে শুরু হলো দিনরাতের পরিশ্রম। জার্মান ভাষা বেশ রপ্ত করে নিলাম। ঘনিষ্ঠতা বাড়লো ইউরোপের নানা দেশের মানুষের সঙ্গে।

এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ অপেক্ষাকৃত ব্যস্ত এলাকা পাতায়ার সেকেন্ড রোডে ‘ইউনিক ফ্যাশন’ নামের আরেকটি দোকান নিই। তারপর কেবলই এগিয়ে যাওয়া। ২০০৫ সালে শুরু করলাম রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা। সেখান থেকে আজ আমি একাধিক রিসোর্ট ও হোটেলের মালিক।

সুদৃশ্য বহুতল হোটেল নির্মাণের পর এবার ৩০ তলা আরেকটি হোটেল নির্মাণকাজের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। দূর থেকে এ দেশে থাকা স্থানীয় ও প্রবাসীরা যখন উঁচু হোটেল দেখিয়ে বলেন এটা বাংলাদেশের। তখন বাংলাদেশি হিসেবে গর্বে বুক ভরে ওঠে।

যারা এক সময় আমাকে বঞ্চনা করেছেন। আজ তারা যখন নানা প্রয়োজনে আমার কাছে আসেন, আমার সাহায়্য-সহযোগিতা আর সেবা নেন, তখন নিজেকে বেশ সার্থক মনে হয়। বলছিলেন জাহাঙ্গীর হোসেন।

এখানে বাস করলেও হৃদয় পড়ে থাকে বাংলাদেশে। যৌবনের শাজাহানপুরে। খুব মনে পড়ে বাংলাদেশি বন্ধুদের। বছরজুড়েই ভারত,চীন আর বহু আরবদেশ থেকে আসা পর্যটকদের ভিড়ে জমজমাট থাকে আমার হোটেল ও মোটেল। তবে বাংলাদেশের মানুষদের জন্যে হিসেবটা ভিন্ন। এই পরিচয়ে কেউ এলে তখন তিনি আমার একান্ত অতিথি। দেশের মানুষ হিসেবে যথেষ্ট ছাড় ও সেবা দিয়ে ভিন্নভাবে সন্মান জানাই আমি।

বলছিলেন জাহাঙ্গীর হোসেন, বহু পরিশ্রম আর কষ্ট করে প্রতিষ্ঠিত জাহাঙ্গীর হোসেন যেন এখনো সেই আগের মানুষ। নেই কোনো অহংকার। শিশুসুলভ সরলতা দিয়েই মেশেন সবার সাথে। প্রবাসে বহু মানুষ এখন নিজেদের প্রতিষ্ঠার পেছনে স্মরণ করেন জাহাঙ্গীর হোসেনের অবদানকে। কমিউনিটির নেতা হিসেবে সব সময় এই প্রবাসে জাহাঙ্গীর হোসেন সবার আপনজন।

বাংলাদেশ সময়: ১১৩৮ ঘণ্টা, এপ্রিল ১২, ২০১৭
জেএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।