[x]
[x]
ঢাকা, শুক্রবার, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
bangla news

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট সংবাদ নয়

মাজেদুল হক, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৮-০২-১০ ১১:০৭:০৮ পিএম
আলমগীর হোসেন, এডসন সি টানডর জুনিয়র, দামার হারসানতো ও এলান সুন

আলমগীর হোসেন, এডসন সি টানডর জুনিয়র, দামার হারসানতো ও এলান সুন

ঢাকা: ভবিষ্যতে কাগজের পত্রিকা থাকবে কিনা সেই বিতর্ক এখন আর টেবিলে নেই। বরং অনলাইন বা ডিজিটালের দাপটে কাগজের পত্রিকা কত বছরের মধ্যে বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে চলছে তারই কাউন্টডাউন।

সিঙ্গাপুরের গুণেমানে বিখ্যাত দ্যা স্ট্রেইটস টাইমসের এডিটর অ্যাট লার্জ হান ফুক কুয়াংতো বলেই দিয়েছেন, সংবাদপত্রের আয়ু আর ৫ বছর।

দুনিয়াজুড়ে নতুন দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের মধ্যে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সংবাদ মাধ্যম হতে পারবে না। অন্তত বর্তমান প্রেক্ষাপট তাই বলছে। যখন কিনা মার্ক জুকারবার্গ নিজেই 'ভ্রান্ত খবর' ঠেকাতে ফেসবুকে ব্যক্তিগত টাইমলাইনে সংবাদকে প্রাধান্য কম দেওয়ার ঘোষণা দিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তিগত কোনো পোস্ট বড়জোর সংবাদের তথ্য হতে পারে, সেটাও নির্ভর করবে সত্যতা যাচাই-বাছাইয়ের উপর।

কেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সংবাদ মাধ্যম নয়? এর উত্তরে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। সময়টা ২০১৫ সালের মাঝামাঝি। কুয়ালালামপুরে একটি হোটেলের লবিতে বাংলাদেশি একজন কর্মকর্তা আমাকে এসে বললেন, 'তুরস্ক থেকে যুদ্ধ জাহাজ পাঠানো হচ্ছে রোহিঙ্গাদের উদ্ধার করতে মিয়ানমারকে আক্রমণ করার জন্য।' আমি জানতে চাইলাম, আপনি খবরটি কোথায় পেয়েছেন? তিনি বললেন, আপনাদের অনলাইনে। আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, দেখি কোথায়! তিনি ফেসবুকের একটি পেজে শেয়ার হওয়া একটি ভ্রান্ত ছবি দেখালেন। আমি বললাম, এটা সংবাদ মাধ্যম নয়। এটার সত্যতা নেই।

আসলেই তুরস্ক মিয়ানমার আক্রমণ করেনি। এরফলে ওই ব্যক্তি কি আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা ফটোশপের ছবি বিশ্বাস করবেন! আমার মনে হয় না। আবার গত মার্কিন নির্বাচনেও মানুষকে দ্বিধায় ফেলেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ফলে এই 'ভ্রান্ত সংবাদ' বা 'ফেক নিউজ' ঠেকাতে দুনিয়াজুড়ে চলছে তৎপরতা। ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরে সরকারের ক্যাম্পেইন রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেক নিউজ চেনার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে। আমাদের দেশেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো ফেক ছবি নিয়ে বিভিন্ন সময় ঘটেছে বিশৃঙ্খলা। যেটা প্রমাণ করে এই মাধ্যমটি সংবাদ মাধ্যম হয়ে ওঠার জন্য কতটা পিছিয়ে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ অনেক তথ্য শেয়ার করছেন। এসব কি তবে সংবাদ? দেশের শীর্ষ অনলাইন নিউজপোর্টাল বাংলানিউজটোয়েন্টিফোরের এডিটর ইন চিফ আলমগীর হোসেন বলেন, এসব তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থাকাকালীন সময়ে সংবাদ নয়। তবে সাংবাদিক যদি সেই তথ্য যাচাই-বাছাই করে সংবাদ মাধ্যমে উপস্থাপন করেন, তখন সেটি সংবাদ হয়ে উঠবে। ফেসবুক বা সামাজিক মাধ্যমে কোনো পরিবেশনা নিউজ বা সংবাদ না। এটাকে সুস্পষ্টভাবেই বলা হচ্ছে ‘পোস্ট’ বা ‘স্ট্যাটাস’। কোনো সাংবাদিক ফেসবুক বা অন্য যোগাযোগ মাধ্যম থেকে নিউজের প্রাথমিক উপাদান (নিউজ পেগ) হিসেবে বেছে নিয়ে তা যাচাই-বাছাই করে পরিবেশন করেন তবেই তা হবে ‘সংবাদ’।

‘দুটো মাধ্যমের নাম সুস্পষ্টভাবেই ভিন্ন। একটি সংবাদ মাধ্যম। আর অন্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। দুটোর দায়বদ্ধতাও ভিন্নতর।’

বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের জনক বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তি মনের মর্জিমতো কথা বলছে, মিথ্যা বললেও তার দায়বদ্ধতা নেই। তবে সংবাদ মাধ্যমের রয়েছে দায়বদ্ধতা। সংবাদমাধ্যমের কন্টেন্ট বাস্তবতা। তাই চূড়ান্তভাবে মানুষ সংবাদ মাধ্যমের তথ্যকেই গ্রহণ করবেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নয়।

হংকং ভিত্তিক দ্যা স্প্লাইস নিউজরুমের কো-ফাউন্ডার এলান সুন বাংলানিউজকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে সংবাদ মাধ্যমের জনপ্রিয়তা পাওয়ার ইচ্ছেও ভুল প্রমাণিত হবে খুব শিগগিরই। কারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংবাদের শিরোনামের পর সংবাদে ঢুকছে কম। আবার সংবাদ মাধ্যমে প্রবেশ করলেও সেই মাধ্যমের নাম মনে রাখছে না। ফলে অনলাইনকে নিজেদের কন্টেন্টের উপরই গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতের সংবাদ মাধ্যম বেঁচে থাকবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার উপর। কারণ, প্রতিদিন ঘটে যাওয়া খবরগুলো যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসতে থাকবে, মানুষ সেগুলোকে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অংশ করে নেবে। তবে বিশেষ সংবাদের জন্য সংবাদ মাধ্যমেই ঢুঁ মারতে হবে।

এরপরও যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে সংবাদ মাধ্যমের হুমকি হিসেবে দেখছেন, তাদের জন্যে সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজি ইউনিভার্সিটির উই কিম উই স্কুল অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের একটি জরিপ তুলে ধরা যাক। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ২ হাজার ৫০২ জন ফেসবুক ব্যবহারকারী ব্যক্তির উপর জরিপ চালান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এডসন সি টানডর জুনিয়র। গবেষণায় তিনি দেখতে পান, ৭৩ দশমিক ৬০ শতাংশ মানুষ ফেসবুকের মিথ্যা খবর এড়িয়ে যান। এর মধ্যে ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ লোক মিথ্যা পোস্ট সরাতে ফেসবুকে রিপোর্ট করেন।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অত্যাচারের কিছু মিথ্যা ছবি এবং সংবাদ বাংলাদেশে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। এতে কি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সামর্থ্য গণমাধ্যমের চেয়ে বেশি, এটা প্রমাণ করে কিনা? জানতে চাইলে তিনি বাংলানিউজকে বলেন, এটা সামাজিক প্রেক্ষাপটের উপর নির্ভর করবে। তবে সরকারকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেক নিউজের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ক্যাম্পেইন করতে হবে।

ফেসবুক, টুইটার বা অন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সংবাদ মাধ্যম হয়ে উঠলে সাংবাদিকদের কি হবে? এমন উত্তরে ইন্দোনেশিয়ার দ্যা জাকার্তা পোস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দামার হারসানতো বলেন, এটা হবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সংবাদের সোর্স হিসেবে দ্রুতই তার মূল্য হারাবে। কারণ ফেক নিউজ ইন্ডাস্ট্রিও এখন বেশ শক্তিশালী। এই ফেক নিউজই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চেয়ে সত্যিকারের সংবাদ মাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে।

বাংলাদেশ সময়: ১০০৬ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮
এমএন/এএ

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মুক্তমত বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache