ঢাকা, বুধবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২২ মে ২০২৪, ১৩ জিলকদ ১৪৪৫

বছরজুড়ে দেশ ঘুরে

বৃষ্টিভেজা ভ্রমণ 

মোহাম্মদ আজহার, ইউনিভার্সিটি করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১০২৭ ঘণ্টা, জুন ১২, ২০২৩
বৃষ্টিভেজা ভ্রমণ  ...

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: ভোর ৪টা ৫০ মিনিট। মোবাইলের টুংটাং শব্দে ঘুম ভাঙতেই দেখি অনেকগুলো মিসড কল।

তাড়াতাড়ি উঠে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। বৃষ্টির পরিমাণ কম। তাই ব্যাগে থাকা ছাতা বের করিনি। সোহরাওয়ার্দী হল মোড়ে এসে দেখা বন্ধু মাহবুবের সঙ্গে। এরপর জিরো পয়েন্ট অবধি একসঙ্গে গেলাম। সেখানেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে একটি বাস।  

সাড়ে ৫টায় বাস ছাড়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ৬টায় ক্যাম্পাস ছেড়ে যাই আমরা। নগরের জিইসি মোড়ে এলে আরও বেশ কয়েকজন যোগ দেন আমাদের সঙ্গে। এরপর কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (চবিসাস) মিনি ট্যুরের জন্য নির্ধারিত বাসটি। কোনো বিরতি ছাড়াই বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) গিয়ে পৌঁছাই আমরা।  

অবশ্য মাঝপথে র‌্যাফেল ড্রয়ের টিকিট বিক্রির দায়িত্ব পড়ে আমার কাঁধে। প্রথমবারের মতো বাসে যাত্রীদের কাছে কিছু বিক্রির অভিজ্ঞতা হলো। এ নিয়ে সারাদিন মজাও কম হয়নি। শিডিউল অনুযায়ী সকাল ১০টায় বার্ডে এসে প্রথমেই সবাই মিলে গ্রুপ ছবি তুলি। বার্ডে এটা আমার দ্বিতীয় ভ্রমণ। আগেরবার এসেছিলাম লোকপ্রশাসন বিভাগের ফিল্ডওয়ার্কের কাজে। তখন ৪ দিন থাকা হয়েছিল বার্ডের মনোরম পরিবেশে। তাই খুব ফুরফুরে লাগছিল সবকিছু।  

সম্ভবত আশপাশের জায়গাগুলোর তুলনায় একটু বেশিই আর্দ্র থাকে বার্ড। প্রথমবার যখন এসেছিলাম, তখনও এমনই মনে হয়েছে। এবার তো বৃষ্টি মাথায় নিয়েই এলাম। বৃষ্টির পরিমাণ কম হওয়ায় ছাতা না নিয়েই হাঁটা শুরু করলাম সবাই। যত সামনে এগুচ্ছি, বৃষ্টিও তত বাড়ছে। কাকভেজা ভিজলেও পুরো বার্ড না ঘুরে ফিরতে ইচ্ছে করছিলো না। মাঝেমধ্যে দু-একজন মানুষকে দেখলেও বেশিরভাগ সময় রাস্তায় আমরা ছাড়া কেউই ছিলো না। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সুনসান নিরব এক জায়গা। গাছপালা বেষ্টিত বার্ড যেন পরিকল্পিত এক পল্লী।  

সেখানকার ফল গাছগুলোর উচ্চতা খুব বেশি না। কাঁঠালগুলো ঝুলে আছে একদম হাতের নাগালেই। এসব দেখতে দেখতে বৃষ্টিও বেড়ে চলছে। গাছের পাতায় জমে যাওয়া বৃষ্টির পানিগুলো বাতাসের সঙ্গে নিচে পড়ছিল। এমন পরিস্থিতিতে এক ছাতার নিচে দুই-তিনজন কোনমতে ঢুকলেও বাকিদের ঠাঁই হলো ট্যুরের জন্য বানানো ব্যানারটির নিচে। তবে কোনভাবেই যেন বৃষ্টির পানি থেকে নিস্তার পাওয়া যাচ্ছিল না।

শরীরের বেশিরভাগ অংশ ভিজে যাওয়ায় একপর্যায়ে হাল ছেড়ে দেই আমরা কয়েকজন। এরপর ব্যানার ছেড়ে অন্যদের মতো বৃষ্টিতে ভিজে হাঁটতে শুরু করি। বার্ডের মূল গেইটে এসে যখন সবাই জড়ো হলাম, ততক্ষণে পুরোটাই ভিজে গেলাম। ঘণ্টাখানেক ঘোরাঘুরির পর সেখান থেকে রওনা হই শালবন বিহারের উদ্দেশ্যে। সেখানেও বৃষ্টিতে ভিজেই চলে ফটোসেশন।  

শালবনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (কুবিসাস) দুইজন সদস্য এসে আমাদেরকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন। দুপুর ১টার মধ্যে শালবন ঘুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাই আমরা। সেখানে সাংবাদিক সমিতির অফিসে কিছুক্ষণ আড্ডার পর মধ্যহ্নভোজের পালা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ায় বৃষ্টির দিনের সবচেয়ে উপভোগ্য খাবারটাই আমাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে৷ গরম খিচুড়ি, মাংস, ডিম এবং সালাদ। খাবার শেষে আমরা রওনা হই ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের উদ্দেশ্যে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদম পাশেই নান্দনিক এই পার্ক। সবাই ভেজার প্রস্তুতি নিয়েই সেখানে যাই।  

ম্যাজিক প্যারাডাইসে গ্রুপ ছবি তোলার পর প্রথমেই আমরা চলে যাই স্লাইডে। বেশ ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছিল স্লাইড রাইডিংটা। তিনটি ভিন্ন ভিন্ন স্লাইডে ভিন্ন অভিজ্ঞতা হলো। অনেকে উঁচু থেকে পানির স্রোতের সঙ্গে এভাবে নিচে নামতে যে কয়েক সেকেন্ড লাগে, সে সময়টা আমার কাছে রীতিমতো কয়েক ঘণ্টার সমান মনে হয়েছিল। এভাবে ঘণ্টাখানেক রাইডিংয়ের পর আমরা চলে এলাম কৃত্রিম ঢেউয়ে নিজেদের ভাসাতে। মনে হচ্ছিল সমুদ্র সৈকতে এসেছি। এ যেন নিজেকে শৈশবে ফিরে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। নবীন-প্রবীণ একে অন্যের ঘাড়ে চড়ে কিছু সময়ের জন্য ভুলে যাওয়া বয়স আর নিয়মের সব বেড়াজাল।

ম্যাজিক প্যারাডাইসের সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য ছিল এ দুটো জিনিস। এছাড়া বাকি আয়োজন অন্যান্য পার্কের মতোই। যদিও অন্য পার্কের তুলনায় কিছুটা পরিপাটি মনে হলো ম্যাজিক প্যারাডাইস। পানিতে আনন্দ, হৈ হুল্লোড়, ফটোসেশন- এসব করতে করতে কখন যে বিকেল ৪টা বেজে গেলো, টেরই পেলাম না। এরপর আবার বাসের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম সবাই। জামাকাপড় বদলে সবাই চলে এলাম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির অফিসে। সেখানে দুই সংগঠনের মতবিনিময় শেষে মৌসুমি ফলের আয়োজন করে কুবিসাস। এরপর সবাই খেলাম কুমিল্লা ঐতিহ্যবাহী মাতৃভান্ডারের রসমালাই। এভাবেই সারাদিন আমাদেরকে সঙ্গ দিয়ে এবং আতিথেয়তায় কোনো কমতি রাখেননি তারা।

কুবিসাসের অফিসেই হলো আমাদের র‌্যাফেল ড্র। ১১ জন মনোনীত হলো পুরস্কারের জন্য। সন্ধ্যা ৭টায় রওনা দেওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইটে আসি সর্বশেষ ফটোসেশনের জন্য। যদিও লোডশেডিংয়ের কারণে রাতের আঁধারে ছবি তোলা যাচ্ছিলো না। শেষপর্যন্ত মোবাইলের ফ্লাশলাইটের ওপরেই করতে হলো ভরসা।  

বাস ছাড়ার পর র‌্যাফেল ড্র’তে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এরপর কমবেশি সবাই দিনব্যাপী ভ্রমণের অনুভূতি জানালেন। সারাদিনের ক্লান্ত শরীর যেন বিছানা পেলেই ঘুমের ঘোরে হারিয়ে যাবে। কিছুক্ষণ পর বাসের সব লাইট বন্ধ করে দেওয়া হলো। দু’একজন মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলেও বেশিরভাগই ঘুমিয়ে গেছে তখন। মাঝপথে ছোট্ট একটা বিরতির পর চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম আমরা। রাত ১১টায় ক্যাম্পাসে এসে বাস থেকে নেমে দেখি তখনো সেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, খুব ছোটো ছোটো ফোঁটা।  

বাংলাদেশ সময়: ১০০০ ঘণ্টা, জুন ১২, ২০২৩
এমএ/টিসি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

বছরজুড়ে দেশ ঘুরে এর সর্বশেষ