অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রদূত আহমাদ সাদেকিকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ ঘোষণা করে সাত দিনের মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ক্যানবেরা সরকার।
গত ২৬ আগস্ট সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হয়ে ইরানের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ।
‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বলতে এমন ভুয়া বিচারকে বোঝায় যেখানে রায় আগেই নির্ধারিত থাকে, অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয় না।
আলবানিজ তার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এএসআইও) নাকি উপসংহারে পৌঁছেছে যে, ইরান গত বছর দুটি ‘ইহুদিবিদ্বেষী হামলার’ জন্য দায়ী। একটি সিডনির এক রেস্তোরাঁয়, অন্যটি মেলবোর্নের একটি সিনাগগে। তার দাবি, এগুলো ছিল ‘একটি বিদেশি রাষ্ট্র কর্তৃক পরিকল্পিত, ভয়াবহ ও বিপজ্জনক আগ্রাসন’, যার লক্ষ্য অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করা।
প্রমাণহীন ইরানবিরোধী অভিযোগ
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী একটি গুরুতর অভিযোগ করার পরও ইরানের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ হাজির করেননি। বরং, চলতি বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশ জানায়, দেশে রিপোর্ট হওয়া ১৫টি তথাকথিত ইহুদিবিদ্বেষী ঘটনার নেপথ্যে ছিল সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র, তথাকথিত ইহুদিবিদ্বেষীরা নয়। এই ঘটনাগুলোকে ব্যবহার করেই সরকার তড়িঘড়ি করে নতুন আইন পাস করে, যা ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ দমনকে সহজ করে দেয়।
আলবানিজ আরও অভিযোগ করেন, ইরান নাকি ‘আরও হামলার পরিচালনা করেছে’ এবং তিনি ঘোষণা দেন যে, ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শাখা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা তার সরকারের রয়েছে। এটি এমন একটি পদক্ষেপ যা তেহরান-ক্যানবেরা সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি
ইরানের প্রতিক্রিয়া: অভিযোগের খণ্ডন
ইহুদি বিদ্বেষের কথিত অভিযোগে রাষ্ট্রদূত বহিষ্কারের ঘটনায় ইরানের প্রথম সরকারি প্রতিক্রিয়া আসে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি’র কাছ থেকে। সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন এবং ইহুদিবিদ্বেষকে ‘পশ্চিমা কাজ’ বলে অভিহিত করেন।
ইরানের দীর্ঘ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে কোনো ইহুদিবিদ্বেষ নেই উল্লেখ করে বাকায়ি বলেন, “এটি বরং একটি পাশ্চাত্য ও ইউরোপীয়দের কাজ। যদি ইতিহাসের দিকে তাকান, ধর্মের কারণে ইহুদিদের নিপীড়ন ইউরোপেই ঘটেছে; সেই ইতিহাসের দায় তাদেরই নিতে হবে, যা আজও অব্যাহত রয়েছে। ”
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি বলেন, ইরান এই অভিযোগকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করছে এবং ‘অযথা ও অযৌক্তিক কূটনৈতিক’ পদক্ষেপের মুখে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।
বাকায়ি আরও বলেন, ক্যানবেরার এই সিদ্ধান্ত আসলে তাদের ইরানবিরোধী নীতিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অস্ট্রেলীয় রাজনীতিক, এমনকি অ্যালবানিজ নিজেও যে নজিরবিহীনভাবে ইসরায়েলবিরোধী মন্তব্য করেছেন, তা পুষিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা।
ইরানে ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হোমায়ুন সামেহ ইয়াহ নাজাফাবাদি
ইরানি ইহুদি সম্প্রদায়ের ভূমিকা
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি’র বক্তব্য সমর্থন করে ইরানি পার্লামেন্টে ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হোমায়ুন সামেহ ইয়াহ নাজাফাবাদি বলেন, “ইহুদিরা অন্তত ২,৫০০ বছর ধরে ইরানে বসবাস করছে। ইউরোপের মতো জায়গায় যখন ইহুদিদের হত্যা ও দেশান্তর করা হয়েছে, আমরা তখনও নির্ভয়ে অন্য ইরানিদের সঙ্গে পাশাপাশি থেকেছি। ”
ইরানের সংবিধান ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সংসদে আসন সংরক্ষণের বিধান রেখেছে, যার একটি আসন ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য। হোমায়ুন সামেহ ইয়াহ প্রায় ১০,০০০ ইহুদির প্রতিনিধিত্ব করেন।
তিনি অস্ট্রেলিয়ার অভিযোগকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে উড়িয়ে দেন: “আমি প্রতিদিন দেখি কীভাবে ইরানের কর্তৃপক্ষ ইহুদিদের সম্মান করে এবং আমাদের ধর্ম পালনের সুযোগ নিশ্চিত করে। তাই এই অভিযোগগুলো একেবারেই হাস্যকর। ”
সামেহ ইয়াহ ইহুদিদের জন্য ইরান সরকারের বিশেষ সুবিধার কথাও তুলে ধরেন। যেমন নিজস্ব স্কুল পরিচালনা, যেখানে শিক্ষার্থী খুব কম হলেও সরকার বাজেট দেয়; বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ইহুদি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে খাবার ও সিনাগগে প্রার্থনা করার সুযোগ দেওয়া হয়। তার মতে, এর ফলে ইরানি ইহুদিরা নির্বিঘ্নে ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিল্পী হয়ে উঠতে পারছে।
সামেহ ইয়াহ আরও বলেন, “ইরানি ইহুদিরা মূলত ইরানের অংশ। মুসলিম, খ্রিস্টান, জরথুস্ত্রীদের সঙ্গে আমরা একসঙ্গে আছি। ধর্মের কারণে আমাদের আলাদা করে দেখা হয় না। ”
অস্ট্রেলিয়া ও মোসাদের সম্পর্ক
অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা মূল্যায়ন মোটেই স্বাধীন নয়; এগুলো প্রধানত আসে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা-সিআইএ এবং ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা- মোসাদ থেকে। অথচ সবসময় এমনটা ছিল না।
১৯৭২-৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড গফ হুইটলামের সময়ে ক্যানবেরা মধ্যপ্রাচ্যে নিরপেক্ষ নীতি নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তার সরকার ১৯৬৭-পরবর্তী ইসরায়েলি দখলদার নীতির সমালোচনা করেছিল এবং আরব দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছিল। কিন্তু এই স্বাধীন পথচলা বেশিদূর এগোয়নি।
১৯৭৫ সালে মোসাদ অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সংস্থা এএসআইও-কে জানায়, ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা নাকি অস্ট্রেলিয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যার পরিকল্পনা করছে। সম্ভাব্য লক্ষ্যদের একজন ছিলেন বব হক—তৎকালীন শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা ও হুইটলামের ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের কড়া সমালোচক, যিনি পরে ১৯৮৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হন।
২০০৭ সালে ডিক্লাসিফায়েড হওয়া মন্ত্রিসভার নথি থেকে এ তথ্য জানা যায়। তবে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত আলি কাজাক এসবকে ‘মোসাদের প্রচারণা’ বলে খারিজ করেছিলেন। তার মতে, ফিলিস্তিনিদের বদনাম করা এবং এএসআইও‘র বাজেট বাড়ানোই ছিল এ ধরনের ভুয়া গল্পের উদ্দেশ্য। কোনো প্রমাণ কখনো হাজির করা হয়নি।
তবুও, এই ঘটনার সুযোগ নিয়ে মোসাদ অস্ট্রেলিয়াকে ফিলিস্তিনিদের থেকে দূরে সরিয়ে নেয় এবং নিজেকে অস্ট্রেলিয়ার অপরিহার্য নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এই প্রবণতা এখনো চলমান। সম্প্রতি জাতিসংঘে অস্ট্রেলিয়ার সম্ভাব্য ফিলিস্তিন স্বীকৃতির পরিকল্পনা ঠেকাতে গণমাধ্যমে আবারও মোসাদ-সম্পর্কিত ‘সতর্কবার্তা’ ছড়ানো হয়। ‘দ্য অস্ট্রেলিয়ান’ লিখেছে: “মোসাদ আমাদের জন্য কী করেছে? অসংখ্য অজি নাগরিককে নিরাপদ রেখেছে। ”
এদিকে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভগুলোর একটি অস্ট্রেলিয়ায় হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অস্ট্রেলিয় প্রধানমন্ত্রী আলবানিজকে একজন দুর্বল রাজনীতিবিদ হিসেবে অভিযোগ করেছেন।
আলবানিজ ‘ইসরায়েলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এবং অস্ট্রেলিয়ার ইহুদিদের পরিত্যাগ করেছেন’ বলেও মন্তব্য করেন নেতানিয়াহু।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচিও আলবানিজকে ‘দুর্বল’ শাসক হিসেবে অভিহিত করেন, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। এক্স-এ তিনি লেখেন: “আমি সাধারণত যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে একমত হই না। তবে এক বিষয়ে নেতানিয়াহু ঠিক বলেছেন: অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী আসলেই দুর্বল। ফিলিস্তিনের পক্ষে অস্ট্রেলীয়দের সমর্থনের কারণে ইরানকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। ক্যানবেরার বোঝা উচিত, যুদ্ধাপরাধীদের তুষ্ট করার চেষ্টা করলে শুধু তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলবে। ”
সম্প্রতি সিডনিতে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি ও বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনির ছবি বহন করেন
ইসরায়েলকে খুশি করার কৌশল
অস্ট্রেলিয়ার সিদ্ধান্ত যে শুধু কূটনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ—এটি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইহুদিবিদ্বেষের অজুহাতে ইরানকে দোষারোপ করা মূলত দেশটির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রশমিত করার প্রচেষ্টা এবং ইসরায়েলকে খুশি রাখার কূটনৈতিক কৌশল। তবে এতে ক্যানবেরার ‘স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি’র ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, পশ্চিমা শক্তির ছায়ানীতিতে অস্ট্রেলিয়া যত বেশি নির্ভরশীল হয়েছে, ততবারই তার মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ফলে প্রশ্ন জাগে—অস্ট্রেলিয়া কি সত্যিই জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে নাকি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার ছকেই চলছে? সময়ই তার জবাব দেবে।
এমজেএফ