ঢাকা, রবিবার, ২২ মাঘ ১৪২৯, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৩ রজব ১৪৪৪

শিল্প-সাহিত্য

বঙ্কিমচন্দ্র ও ‘বাঙ্গালা ভাষা’ | ফজলুল হক সৈকত

বিশেষ রচনা ~ শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩১৯ ঘণ্টা, জানুয়ারি ৭, ২০১৬
বঙ্কিমচন্দ্র ও ‘বাঙ্গালা ভাষা’ | ফজলুল হক সৈকত

বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতা প্রবর্তনের প্রাণপুরুষ এবং বাঙালির চিন্তার-মুক্তিধারার অন্যতম প্রধান রূপকার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (জন্ম: কাঁঠালপাড়া, চব্বিশ পরগনা, ১৮৩৮; মৃত্যু: ১৮৯৪)। সমগ্র বাংলাসাহিত্য-পরিসরে তার মতো পরিপূর্ণ সাহিত্যশিল্পী খুব বেশি আবির্ভূত হয়নি।

তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, কবি, গল্পকার, দার্শনিক, সমালোচক, সমাজ-নেতা, দেশপ্রেমিক, রাষ্ট্রচিন্তক এবং আধুনিক হিন্দুধর্মের একজন মুখ্য ব্যাখ্যা-প্রদানকারী ব্যক্তিত্ব। এই বিশেষ যুগ-প্রবর্তনকারী শিল্প-স্রষ্টার গদ্যনির্মাণের বিশেষত্ব আমাদের অভিনিবেশ আকর্ষণ করে। তার উপন্যাসের গদ্য ধ্বনিসমৃদ্ধ সংস্কৃত ভাষাসুলভ, উপমা-প্রয়োগে কবিত্বপূর্ণ এবং অনেক বেশি ডেসক্রিপটিভ বা বর্ণনাধর্মী। আখ্যানসমূহে নারীর সৌন্দর্য-বর্ণনা, প্রেম-দাম্পত্য অঙ্কনে তার সাফল্য অবশ্য-আলোচ্য। রোমান্টিকতা-রূপায়নেও তার সাফল্য অনেক। আর তিনি প্রবন্ধের গদ্যে ভাষার গাম্ভীর্য কিংবা প্রতিবেশের রহস্যময়তা সৃষ্টির চেয়ে যুক্তির প্রতি অধিক নিষ্ঠাবান। সরল-বোধগম্য ভাষায় রচিত কিছুটা ভাষণসুলভ তার প্রবন্ধ-নিবন্ধ-সমালোচনা। সহজ কথায় বঙ্কিমের নিবন্ধভাষা দৃঢ়ভিত্তির ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত। লেখা-লেখক-পাঠক—এই ত্রয়ী ভাবনায় সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্যনির্মাতা আনত ও নিমগ্ন ছিলেন। প্রসঙ্গত, নবীন লেখকদের প্রতি দেওয়া তার একটি উপদেশ এখানে তুলে ধরছি: “যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন। ”



‘হে ভ্রাতঃ’ বলার চেয়ে ‘ভাই রে’ বললে যে সেই ডাকে মন উথলে ওঠে, তা কে না বোঝে? বঙ্কিমও তা বোঝেন। তবে, ‘ভ্রাতৃভাব’ না বলে ‘ভাইভাব’ এবং ‘ভ্রাতৃত্ব’ স্থলে ‘ভাইগিরি’ বললে অবশ্যই ভালো শোনায় না! অর্থাৎ, বাংলা শব্দ ‘ভাই’ বলতে আমরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও বিশেষ প্রয়োজনে—ভাষার গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্য রক্ষায় সংস্কৃত শব্দ ‘ভ্রাতৃ’ও প্রয়োগযোগ্য। মোটকথা, বঙ্কিমের বক্তব্য হলো—অপ্রয়োজনে বাংলাভাষার শব্দের স্থলে যেমন ভিন্ন ভাষার শব্দ প্রয়োগ করা ঠিক হবে না, তেমনই প্রয়োজনে—ভাষার সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য অপর ভাষা থেকে শব্দ ধার নেওয়া যেতে পারে



আধুনিক বাংলা সাহিত্যের যে সূচনা হয়েছিল ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের (১৮১২-১৮৫৯) হাতে, সেই প্রারম্ভের সৃজন-নায়কত্ব সময়ের প্রবাহে ও সমাজের প্রয়োজনে একদিন চলে এসেছিল বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তা-প্রকাশের দরোজায়। চিন্তানায়ক বঙ্কিম মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বপ্রথম স্নাতক পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। আইনশাস্ত্রও অধ্যয়ন করেছিলেন কিছুকাল। শিক্ষার্থীজীবন সম্বন্ধে শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের (১৮৬০-১৯০৮) জবানিতে বঙ্কিমচন্দ্রের একটি উক্তি স্মরণীয়:
“আমি আপন চেষ্টায় যা-কিছু শিখেছি। ছেলেবেলা হতে কোনো শিক্ষকের কাছে কিছু শিখিনি। হুগলি কলেজে এক আধটু শিখেছিলাম ঈশানবাবুর কাছে। ক্লাসে কখনো থাকিতাম না। ক্লাসের পড়াশোনা কখনো ভালো লাগিত না—বড় অসহ্য বোধ হইত। কুসংসর্গটা ছেলেবেলায় বড় বেশি হয়েছিল। বাপ থাকতেন বিদেশে, মা সেকেলের উপর আর-একটু বেশি, কাজেই তার কাছে শিক্ষা কিছু হয়নি, নীতিশিক্ষা কখনো হয়নি। ”

১৮৫৮ সালে বঙ্কিম ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ১৮৫২ সালে বঙ্কিমের প্রথম রচনা—‘পদ্য’ নামক কবিতা ছাপা হয় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত ‘সংবাদ-প্রভাকর’ পত্রিকায়। প্রথম উপন্যাস (বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল উপন্যাসও বটে) ‘দুর্গেশনন্দিনী’ ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত হয়; আর ১৮৭৪ সালে বোরোয় প্রথম গদ্যরচনা ‘লোকরহস্য’। আজকের নিবন্ধে বিদগ্ধ-সাহিত্যশিল্পী সৃষ্টিশীল ও মননজীবী বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বাঙ্গালা ভাষা: (লিখিবার ভাষা)’ প্রবন্ধের প্রতি আমাদের পর্যবেক্ষণ প্রসারিত থাকবে।

“প্রায় সকল দেশেই লিখিত ভাষা এবং কথিত ভাষায় অনেক প্রভেদ। যে-সকল বাঙ্গালি ইংরেজি সাহিত্যে পারদর্শী, তাঁহারা একজন লন্ডনী কক্নী বা একজন কৃষকের কথা সহজে বুঝিতে পারে না, এবং এতদ্দেশে অনেকদিন বাস করিয়া বাঙ্গালির সহিত কথাবার্তা কহিতে কহিতে যে-ইংরেজরা বাঙ্গালা শিখিয়াছেন, তাহারা প্রায় একখানিও বাঙ্গালাগ্রন্থ বুঝিতে পারেন না। প্রাচীন ভারতেও সংস্কৃতে ও প্রাকৃতে, আদৌ বোধহয়, এইরূপ প্রভেদ ছিল, এবং সেই প্রভেদ হইতে আধুনিক ভারতবর্ষীয় ভাষাসকলের উৎপত্তি। ”

লেখার ভাষা কেমন হওয়া চাই—এমন ধারণা নিয়ে নিবন্ধ লিখতে গিয়ে বঙ্কিম এভাবেই শুরু করেছেন তার বক্তব্য। ‘বাঙ্গালা ভাষা’ নিবন্ধটিতে তিনি বাংলা ভাষার কথিত রীতি বা প্রচলিত রীতির সাহিত্যিক প্রাসঙ্গিকতা পরিবেশন করতে চেয়েছেন। আর যুক্তি প্রদান করতে গিয়ে নানান বিষয়ের অবতারণা করেছেন। ইংরেজি-জানা বাঙালি পণ্ডিতেরা যে বাংলাভাষাকে অবজ্ঞা করেছেন, অন্তত বাংলা-না-জানাকে গৌরবের মনে করতেন, সে-কথা বলতেও ছাড়েননি বঙ্কিম তার বর্তমান নিবন্ধে। আমরা জানি, বাংলাভাষার বিকাশপর্বে সংস্কৃতের বিরাট-ব্যাপক প্রভাব ছিল। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কথাবার্তায় এবং আলোচনায় সংস্কৃতমিশ্রিত বাংলা বলতে পছন্দ করতেন। তারা এই ধরনের মানসিকতার জন্য আভিজাত্যও বোধ করতেন। এবং সংস্কৃতনির্ভরতা ও অতিমাত্রায় ইংরেজিপ্রিয়তার কারণে বাংলাভাষা তখন নিরস ও দুর্বল ছিল। সত্যিকার অর্থে বাংলাভাষা তার নিজস্ব চেহারায় সে-সময়ে প্রকাশ ও বিকাশ লাভ করতে পারেনি। বঙ্কিম আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন ওই নিরসতা ও দুর্বলতা দূর হোক।

সমকালে বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তাশীলতা এবং সাধনা বাংলাভাষার উন্নতিকল্পে বিশেষ অবদান রেখেছিল। উত্তরকালেও তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। কঠিন-দুর্বোধ্য ভাষাপ্রিয়তাকে পরিহার করে, তিনি সহজ ও সর্বজনের কাছে পরিচিত তথা চলিত বাংলা প্রবর্তনের পক্ষে  দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। এবং তিনি লক্ষ্যও করেছিলেন যে, সমকালীন শিক্ষিত-ভদ্র সম্প্রদায় বাংলাভাষার প্রকৃত প্রয়োগে আগ্রহী। তাই তিনি বললেন: “যে-ভাষা বাঙ্গালা সমাজে প্রচলিত, যাহাতে বাঙ্গালার নিত্য কার্যসকল সম্পাদিত হয়, যাহা সকল বাঙ্গালিতে বুঝে, তাহাই বাঙ্গালা ভাষা—তাহাই গ্রন্থাদির ব্যবহারের যোগ্য। ” রঙ্গ-ব্যঙ্গময় ভাষা নাকি পণ্ডিতি ভাষা—কোনটি পাঠকের কাছে, লেখকের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত এবং সমালোচনা প্রভৃতির ভাষা কী হওয়া প্রয়োজন, সে-বিষয়েও তার অভিমত অত্যন্ত পরিষ্কার। তার মতে, “আমাদের স্থূলবুদ্ধিতে ইহাই উপলব্ধি হয় যে, যাহা বুঝিতে পারা যায় না, তাহা হইতে কিছু শিক্ষালাভ হয় না। আমাদের এইরূপ বোধ আছে যে, সরল ভাষাই শিক্ষাপ্রদ। ” আবার ভাষাকে কেবল সহজ করার চিন্তায় তাকে অযথা ‘ধনশূন্য’ করতেও তিনি রাজি নন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংস্কৃত বা ইংরেজি শব্দ, যা বাঙালির কাছে বোধগম্য, সে-সব লিখতে বা প্রকাশ করতে তিনি কোনো আপত্তি করেননি। যেমন বলছেন: “এ বাঙ্গালা দেশে কোন্ চাষা আছে যে, ধান্য, পুষ্করিণী, গৃহ বা মস্তক ইত্যাদি শব্দের অর্থ বুঝে না! যদি সকলে বুঝে, তবে কী দোষে এই শ্রেণীর শব্দগুলি বধার্হ?” তবে শব্দের প্রয়োগক্ষেত্র এবং বর্ণনার সরলতার প্রতি তিনি মনোযোগ স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। যেখানে সহজ বাংলা রয়েছে, সেখানে বিনা দরকারে কঠিন শব্দ প্রয়োগের পক্ষে নন বঙ্কিম। তিনি জানেন এবং মানেন, “অকারণে ঘর শব্দের পরিবর্তে গৃহ, অকারণে মাথার পরিবর্তে মস্তক, অকারণে পাতার পরিবর্তে পত্র এবং তামার পরিবর্তে তাম্র ব্যবহার উচিত নহে। ”

‘হে ভ্রাতঃ’ বলার চেয়ে ‘ভাই রে’ বললে যে সেই ডাকে মন উথলে ওঠে, তা কে না বোঝে? বঙ্কিমও তা বোঝেন। তবে, ‘ভ্রাতৃভাব’ না বলে ‘ভাইভাব’ এবং ‘ভ্রাতৃত্ব’ স্থলে ‘ভাইগিরি’ বললে অবশ্যই ভালো শোনায় না! অর্থাৎ, বাংলা শব্দ ‘ভাই’ বলতে আমরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও বিশেষ প্রয়োজনে—ভাষার গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্য রক্ষায় সংস্কৃত শব্দ ‘ভ্রাতৃ’ও প্রয়োগযোগ্য। মোটকথা, বঙ্কিমের বক্তব্য হলো—অপ্রয়োজনে বাংলাভাষার শব্দের স্থলে যেমন ভিন্ন ভাষার শব্দ প্রয়োগ করা ঠিক হবে না, তেমনই প্রয়োজনে—ভাষার সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য অপর ভাষা থেকে শব্দ ধার নেওয়া যেতে পারে। প্রসঙ্গত, মনে রাখা দরকার, পৃথিবীর সকল অগ্রগামী ও জীবিত ভাষাই অন্যান্য ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। প্রাতিস্বিক ঐতিহ্য-সম্ভার ও সামর্থ্য মূল কথা; আর বাইরে থেকে আমদানি করা শব্দে ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধি হলো পারদর্শিতার পরিচায়ক। সফলভাবে ভিন্নভাষার শব্দ প্রয়োগেও থাকতে হয় বিশেষ যোগ্যতা। তবে, মুখে বলার ভাষা আর লিখবার ভাষা অবশ্যই আলাদা হবে। এ প্রসঙ্গে বঙ্কিম বলছেন:

“যিনি যত চেষ্টা করুন, লিখনের ভাষা এবং কথনের ভাষা চিরকাল স্বতন্ত্র থাকিবে। কারণ, কথন এবং লিখনের উদ্দেশ্য ভিন্ন। কথনের উদ্দেশ্য কেবল সামান্য জ্ঞাপন, লিখনের উদ্দেশ্য শিক্ষাদান, চিত্তসঞ্চালন। ” এবং “বিষয় অনুসারেই রচনার ভাষার উচ্চতা বা সামান্যতা নির্ধারিত হওয়া উচিত। রচনার প্রধান গুণ এবং প্রথম প্রয়োজন—সরলতা এবং স্পষ্টতা। ... বলিবার কথাগুলি পরিস্ফুট করিয়া বলিতে হইবে—যতটুকু বলিবার আছে, সবটুকু বলিবে—তজ্জন্য ইংরেজি, ফারসি, আরবি, সংস্কৃত, গ্রাম্য, বন্য, যে-ভাষার শব্দ প্রয়োজন, তাহা গ্রহণ করিবে, অশীল ভিন্ন কাহাকেও ছাড়িবে না। তারপর সেই রচনাকে সৌন্দর্যবিশিষ্ট করিবে—কেননা যাহা অসুন্দর, মনুষ্যচিত্তের উপরে তাহার শক্তি অল্প। ”

বাংলাসাহিত্যের বিকাশপর্বে ভাষা-প্রয়োগ-বিষয়ক চিন্তার দ্বন্দ্ব চলাকালে সমাজ-বিশ্লেষক, সাহিত্যের অনন্য সাধক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এমন সময়োপযোগী নিবন্ধ আমাদের জাতীয়তা ও ভাষার নিজস্বতা রক্ষায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে হয়। কেবল লিখে নয়, কিভাবে লিখতে হবে, কার জন্য লিখতে হবে—লেখার শক্তি-সৌন্দর্য-সামর্থ্য কেমন হওয়া চাই—এসব বিষয়েও ভেবেছেন, ভাবনার প্রকাশ করেছেন ‘সাহিত্যসম্রাট’ বঙ্কিম!



বাংলাদেশ সময়: ১৩১৯ ঘণ্টা, জানুয়ারি ৭, ২০১৬

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa