ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ৩০ মে ২০২৪, ২১ জিলকদ ১৪৪৫

শিল্প-সাহিত্য

প্রতিদিনের ধারাবাহিক

টানেল | এর্নেস্তো সাবাতো (৩২) || অনুবাদ: আলীম আজিজ

অনুবাদ উপন্যাস / শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৫১৫ ঘণ্টা, নভেম্বর ৩, ২০১৪
টানেল | এর্নেস্তো সাবাতো (৩২) || অনুবাদ: আলীম আজিজ অলঙ্করণ: মাহবুবুল আলম

___________________________________

এর্নেস্তো সাবাতো (২৪ জুন ১৯১১-৩০ এপ্রিল ২০১১) আর্জেন্টাইন লেখক এবং চিত্রকর। লেখালেখির জন্য পেয়েছেন লিজিওন অফ অনার, মিগুয়েল দে সেরভেন্তেস পুরস্কার।

এছাড়াও তিনি ছিলেন লাতিন আমেরিকান সাহিত্য জগতের বেশ প্রভাবশালী লেখক। তাঁর মৃত্যুর পর স্পেনের এল পায়েস—তাঁকে উল্লেখ করেন ‘আর্জেন্টিনাইন সাহিত্যের শেষ ধ্রুপদী লেখক’ বলে।
‘এল তুনেল’ (১৯৪৮), ‘সবরে হেরোস ইয়া টুম্বাস’ (১৯৬১), ‘অ্যাবানদন এল এক্সতারমিনাদোর’ (১৯৭৪) তাঁর জগদ্বিখ্যাত তিন উপন্যাস।
___________________________________

৩১তম কিস্তির লিংক

ওই রাতে, অন্য অনেক রাতের মতো, আমার ব্যর্থতা আর আমার দুষ্কর্ম আমাকে পুরো একেবারে নিঃসঙ্গ করে দিল। এবং এসব সময়ে দুনিয়াদারি খুবই তুচ্ছ হয়ে যায়, যদিও আমি জানি আমি অবশ্যাম্ভাবীভাবেই এই দুনিয়ারই অংশ, তারপরও সব কিছু নিশ্চিহ্ন করে ফেলার তীব্র এক উন্মাদনা আমাকে পুরো গ্রাস করে ফেলল; আত্মহত্যার মতো প্ররোচনাকেও সাদরে আস্কারা দিলাম; আকণ্ঠ মদ খেয়ে পুরো মাতাল হলাম; বেশ্যার খোঁজ করতে শুরু করলাম এরপর। এবং, নিজেকে নৈতিকতাবর্জিত অতি নীচদের একজন, এবং আমার আশপাশের ইতর লোকগুলোর চেয়ে আমিও কোনো অংশে কম কিছু না এটা প্রমাণ করতে পেরে দারুণ এক সন্তুষ্টি অনুভব করলাম।

সস্তার বারে মদ্যপানের একেবারে উত্তুঙ্গ পর্যায়ে এসে আচমকা, আমার  সঙ্গের মেয়েটির আর আমার চারপাশের নাবিকদের ব্যাপারে তীব্র প্রতিক্রিয়া হল, আমি হুড়মুড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বিয়ামন্তে দিয়ে হেঁটে পৌঁছুলাম জাহাজঘাটায়। ওখানেই, বসে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম আমি। সাক্ষী তখন কেবল নিচের ময়লা জল। কেন কষ্ট পাচ্ছো? আত্মহত্যার প্রবল প্রলোভন তো এই অচেতন বিস্মৃতির মধ্যেই ঘাপটি মেরে আছে: একই সঙ্গে মনে হচ্ছে উদ্ভট এই পৃথিবীর গোটাটাই যেন মুহূর্তের মধ্যে ধূলিস্মাৎ হয়ে যাবে, বিশালাকৃতির মুদ্রিত কোনো ছবির মতো এই পৃথিবী, এর বলিষ্ঠ গগনচুম্বি সব অট্টালিকা, এর যুদ্ধজাহাজ, এর ট্যাঙ্ক, এর যত কারাগার, সব মরীচিকা ছাড়া যেন আর কিছুই না, অলীক মায়া ওই গগনচুম্বি অট্টালিকা, যুদ্ধজাহাজ, ট্যাঙ্ক, আর দুঃস্বপ্নের সব কারাকক্ষ।

এসব যুক্তিতর্কের আলোকেই, জীবনকে মনে হল যেন দীর্ঘ এক দুঃস্বপ্নের মতো, কিন্তু তখুনি মনে হল একজন চাইলে তো মৃত্যুর আশ্রয়ে চিরমুক্তি পেয়ে যেতে পারে— আর সেটা তো একইসঙ্গে এক রকম উপলব্ধিও। কিন্তু কিসের এই উপলব্ধি? এরপর যতবারই আমি ওই পরিপূর্ণ আদি-অন্তহীন শূন্যতায় ঝাঁপ দিতে চাইলাম, আত্মহননের মায়াবী প্রলোভনের শিকার হতে চাইলাম, ততবারই আমার ভেতরের অস্থিরতা আমাকে নিরুৎসাহিত করে গেল। সব কিছুর পরও, মানুষ মরিয়া হয়ে তার অস্তিত্বকে আকড়ে ধরেই বেঁচে  থাকতে চায়, এবং শেষ পর্যন্ত, ইচ্ছাশক্তি বলে জীবনের সব মরীচিকা সাঙ্গ করার পথে না হেঁটে, জীবনের এই শোচনীয় দশা, নিদারুণ সব যন্ত্রণা আর  সব অপূর্ণতাকেই সে শ্রেয়তর গণ্য করে নেয়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতেও এরকম ঘটে যে, যখন আমরা হতাশার একেবারে চরম সীমায় পৌঁছে গিয়ে আত্মহননের দিকে এগিয়ে যাই, আকণ্ঠ পাপ যখন আমাদের একেবারে নিঃস্ব করে ফেলে এবং চরম এক অবস্থায় পৌঁছে যখন দেখি পাপই  সর্বেসর্বা, তখন কোনো রকম ভালোত্বের ছিটেফোঁটা দেখলেও,  সেটা যত ক্ষুদ্রই হোক, অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এমনভাবে আকড়ে ধরি আমরা, যেন গাছের ওই শিকড় খামচে ধরতে পারলেই প্রচণ্ড বেগে নরকের দিকে ধাবমান আমাদের রেহাই মিলে যাবে।

বাড়ির ফেরার সিদ্ধান্ত যখন নিলাম ততক্ষণে প্রায় সকাল হয়ে গেছে। কিন্তু কিভাবে কখন— আমার কোনো কিছুই মনে নেই, বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া সত্ত্বেও (এটার কথা আমার পরিষ্কার মনে আছে), আমি আচমকা নিজেকে আবিষ্কার করলাম আলেন্দের বাড়ির সামনে। কৌতূহলের ব্যাপার হল এর মাঝখানের ঘটনার কোনো কিছুই আমার মনে নেই। ডকে বসা আমাকে দেখতে পাচ্ছি, নিচের নোংরা জলের দিকে চেয়ে আছি আর ভাবছি, ‘আমাকে ঘুমুতে যেতে হবে,’ আর তখুনি দেখলাম আমি আলেন্দের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি, স্থির চোখে তাকিয়ে আছি পাঁচতলার দিকে। এখানে কী করছি আমি? এই বেলায় মারিয়ার দেখা পাওয়ার আশা করা তো খুবই হাস্যকর একটা চিন্তা। তারপরও মাথায় নতুন কোনো চিন্তা না আসা পর্যন্ত ওখানেই, সম্মোহিতের মতো দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি। তারপর হাঁটা শুরু করলাম, একটা কোনো বারের খোঁজে, তারপর টেলিফোন করলাম। কিন্তু এই সাতসকালে কী কারণে ফোন করেছি তার একটা কোনো উছিলা বের করার চিন্তা কিছুতেই মাথা থেকে তাড়াতে পারলাম না। কেউ একজন জবাব দিল—পাঁচ মিনিট ফোন বাজার পর—কিন্তু আমি পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো দাঁড়িয়ে আছি, ঠোঁট সরছে না কিছুতেই। আতঙ্কে, রিসিভার রেখে দিলাম। ক্যাফে ছেড়ে বেরিয়ে এসে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে শুরু করলাম, এবং বিস্ময়করভাবে আবিষ্কার করলাম আমি আবার ওই একই ক্যাফের সামনে ফিরে এসেছি। কারো মনোযোগ এড়াতে, আমি জিনের অর্ডার দিলাম, এবং, গেলাসে চুমুক দিতে দিতে, সিদ্ধান্ত নিলাম আমার নিজের বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে।

কিছু সময় পর ফিরলাম স্টুডিওতে। তারপর কাপড়চোপড় পরা অবস্থাতেই, সটান শুয়ে পড়লাম বিছানায়, এবং শোওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

(চলবে)

৩৩তম কিস্তির লিংক



বাংলাদেশ সময়: ১৫১৫ ঘণ্টা, নভেম্বর ০৩, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।