ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ০৭ জুলাই ২০২২, ০৭ জিলহজ ১৪৪৩

ফিচার

বুড়িগঙ্গার বিষজলে ধোপাঘাট ও তিনজন ধোপা! (ভিডিও)

মফিজুল সাদিক ও শফিক শামীম | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৭৪৫ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৪
বুড়িগঙ্গার বিষজলে ধোপাঘাট ও তিনজন ধোপা! (ভিডিও) ছবি: জনি/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ঢাকা: কেরানীগঞ্জে আগানগরে বুড়িগঙ্গার পাড়ের ভেতরেই  বড় বড় বাঁশের খুঁটিতে টানা দড়িতে হাসপাতালের ভেজা সাদা বেডশিট শুকাতে দেওয়া হয়েছে। এর আগে বুড়িগঙ্গার ময়লা ও বিষাক্ত পানি দিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে এই সব কাপড়।

ঠিক দশ/পনের গজ দূরেই পাশের মার্কেট থেকে একটি নালা দিয়ে মলমূত্র নামছে নদীতে। মানে এই মলমূত্রমেশা পানিতেই দিব্যি কাপড় ধোওয়া হচ্ছে প্রকাশ্যে।

এভাবেই বুড়িগঙ্গার বুকে গড়ে উঠেছে অনুমোদনহীন এই ধোপাঘাট।

হাসপাতালের অসংখ্যা বেডশিট পরিষ্কারের কাজে ব্যস্ত চার জন ধোপা। তারা সবাই লুঙ্গিতে মালকোছা মেরে নেমেছেন প্রায় ঊরুসমান আবিল জলে। তাদের নাম দুলাল, রতন, দীনেশ ও বিশু।

বেডশিটগুলো নদীর ওপারের ---ঢাকা শহরের বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসেছেন ধোপারা। বুড়িগঙ্গার ধোপারা কম খরচে হাসপাতালের বেডশিট পরিষ্কার করেন। সেইজন্য নগরীর কয়েকটা  হাসপাতালের কাছে বুড়িগঙ্গার ধোপাদের কদরও বেশ।

ধোপা রতন বাংলানিউজকে বলেন, আমরা ৮ থেকে ১০ টাকা খরচে কাপড় (হাসপাতালের বেডশিট) পরিষ্কার করি। অন্যরা এত কম দামে পরিষ্কার করতে পারবে না। ’


কাপড় পরিষ্কার করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ব্লিচিং পাউডার। কাপড় পরিষ্কার দেখালেও কাপড়ে এক ধরনের নোংরা ছাপ থেকেই যাচ্ছে। অথচ ধোপাদের দাবি, এই পানিতে কাপড় পরিষ্কার করলে কোনো সমস্যা নাই।
 
পরিষ্কার পানি দিয়ে কাপড় পরিষ্কার করলে খরচা একটু বেশি পড়ে। একারণে ঢাকার কিছু সরকারী ও বেসরকারী হাসাপাতালের বেডশিট পরিষ্কারের একমাত্র মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্জ্যমেশানোর বুড়িগঙ্গার বিষাক্ত পানি। এছাড়া নগরীর অনেক লন্ড্রিও এই ধোপাদের মাধ্যমে কাপড় পরিষ্কার করিয়ে থাকে।

সাধারণ মানুষ শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, পায়জামা, গেঞ্জিসহ বিভিন্ন কাপড় লন্ড্রিতে পরিষ্কার করতে দেন। এসব কাপড় যে লন্ড্রি-মালিকেরা এসব  ধোপাকে দিয়ে পরিষ্কার করান সেটা তাদের ক’জনই বা জানেন!

ধোপা বিশু বলেন,  আমরা ডিপার্টমেন্টের (লন্ড্রি) কাপড় পরিষ্কার করি। এই পানিতে কোনো সমস্যা হইবো না। আমরা সারাদিন পানির ভিত্রে থাহি। আমাগোর শরীরে কোনো চুলকানি ভি অয় না। পানির রং হলুদিয়া-কালা রংয়ের হইবারই পারে; মাগার পানি কইলাম খারাপ না।   জন্মের পর থিকাই এই পানিতে ভি কাম(কাজ) করতাছি। অহনতুরি কুনু সমস্যা হয় নাইক্কা । সমস্যা হইলে কাম ভি করতে পারতাম না । কারণ সকাল ৭টায় ঘাটে আহি, কাম শ্যাষ কইরা বাইত (বাড়িতে)  যাই সইন্ধ্যায়। ’

বুড়িগঙ্গার বিষাক্ত পানিতেও যে তার কোনো ক্ষতি হয়নি সেটা প্রমাণ কর‍ার জন্য ধোপা দীনেশ নিজের হাত-পা-পেট-পিঠ দেখান।
 
দীনেশ বলেন, দ্যাখেন আমার শরিরডায় কোনো খাউজানি(চুলকানি) নাইক্কা।   তাইলে হাসাপাতালের বিছানা পরিষ্কার করলে সমস্যা অইব কেডায় কইছে!’

ধোপারা প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্দি বিরামহীন ব্যস্ত সময় পার করেন কাপড় পরিষ্কারের কাজে। সারাদিন দূষিত পানিতে দাঁড়িয়েই থাকতে হয় তাদের। ময়লা পানিতে নিজেরা গোসলও করেন, ব্যবহারও করছেন নিজেদের সকল প্রয়োজনীয় কাজে। দুষিত পানিকে তারা এখন দুষিত বলতেও নারাজ।


এ সময় কথা হয় ধোপা দুলালের সঙ্গে তিনি বাংলানিউজকে জানান, ‘জম্মের পর থিকা এই একটা কামই শিখছি গো দাদা। কলম তো ধোরতে পারি না। ’
 
এর পরে দুলালের কাছ থেকে জানা গেছে,  বাবা উদিত রায়ও ধোপার কাজ করতেন। বাবার কাছ থেকেই এই পেশায় হাতেখড়ি দুলালের।

সেখানে উপস্থিত অন্য ধোপাদের কাছ থেকে জানা গেল, হাসপাতালের বেডশিটের পাশাপাশি বিভিন্ন বাড়ি থেকে ফেরি করে কাপড় এনে এখানে পরিষ্কার করা হয়। প্রতি পিস কাপড় পরিষ্কার করতে তিন থেকে চার টাকা মজুরি রাখেন ধোপারা।
 
কাপড় পরিষ্কার করায় ব্যবহার করা হয় কাপড়কাচা পাউডার, সোডা, সাবান ও ব্লিচিং পাউডার। কাপড় পরিষ্কার করতে গিয়ে কোনো কাপড় ছিঁড়ে গেলে জরিমানাও গুনতে হয়। সব খরচা বাদ দিয়ে গড়ে তিন থেকে চারশ টাকা আয় করেন প্রত্যেক ধোপা।
 
বুড়িগঙ্গার পানিতে হাসপাতালের বেডশিট পরিষ্কার করায় ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। আগানগরের বাসিন্দা আব্দুর রহমান মুন্সি(৫৫) বাংলানিউজকে বলেন, ঢাকা শহরের অধিকাংশ হাসপাতালের বিছানার চাদর  এই বুড়িগঙ্গার নোংরা ও মলমূত্র মেশানো পানি দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। এতে করে রোগীদের রোগ আরো বেড়ে যাবে। দেখতে পরিষ্কার হলেও বুড়িগঙ্গার জীবাণু থেকেই যাবে। ’ 



বুড়িগঙ্গার নোংরা পানিতে হাসপাতাল ও লন্ড্রির কাপড় পরিষ্কার করার বিষয়ে কথা বলেছিলাম নগরীর কিছু লন্ড্রিদোকানের লোকদের সঙ্গে। তারা দাবি করেন, লন্ড্রির কাপড় নয়, বুড়িগঙ্গায় হাসপাতালের কাপড় পরিষ্কার করে ধোপারা।

আমিজপুর বটতলার লন্ড্রিমালিক মিজানুর রহমান বুড়িগঙ্গার ধোপাদের প্রসঙ্গে বলেন, এরা (বুড়িগঙ্গার ধোপা) আমাদের কাপড় পরিষ্কার করে না।
খোঁজ নিয়া দ্যাখেন গিয়া আমি কথা ঠিক কইছি কিনা।   এরা ঢাকা মেডিকেল, সলিমুল্লাহ মেডিকেলসহ কিছু বেসরকারী মেডিকেলের কাপড় পরিষ্কার করে। কারণ বুড়িগঙ্গার ময়লা পানিতে কাপড় পরিষ্কার করলে খরচা কম। এইসব দেখার লোক কই দ্যাশে?’

 
বাংলাদেশ সময়: ০৭৪৩ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa