বাংলার প্রকৃতি একসময় নানান উপকারী বৃক্ষশোভায় ছিল সমৃদ্ধ। কালের বিবর্তনে চারপাশ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সুসজ্জিত হলেও কিন্তু সে তুলনায় উপেক্ষিত রয়ে গেছে প্রকৃতি।
অনাদর, অবহেলা আর গুরুত্বহীনতায় হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের প্রকৃতির নানা ধরনের উপকারী গাছগাছালি। এগুলোর মধ্যে অন্যতম টকরই। এটি বর্ষা মৌসুমের ফল। সম্পূর্ণভাবে বাংলার ফল। বাংলার প্রকৃতি আর মাটির সাথেই এর উৎপত্তির ইতিহাস জড়িত।
সম্প্রতি চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলে হঠাৎ করেই এই বিলুপ্তপ্রায় ফলটির দেখা পাওয়া গেছে। এক ফল-ব্যবসায়ী তার দেশি পরশা হিসেবে এই ফলটি মেলে ধরেছেন বিক্রির উদ্দেশ্যে। উৎসুক এক ক্রেতা এই ফলটি দেখেই তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসন। দরদামের পর প্রয়োজনীয় পরিমাণ ক্রয় করে নেন।
ফল ব্যবসায় অসীম বলেন, এই ফলটি এখন আগের মতো পাওয়া যায় না। হঠাৎ করে পেয়েছি এক গৃহস্তের কাছে। পাঁচ/ছয় কেজি কিনে এনেছি। কেজি প্রতি সাড়ে ৩শ থেকে ৪শ টাকায় বিক্রি করছি।
ফল ক্রেতা তনু জানান, বহু বছর পর এই ফলটি আজ দেখলাম। ছোটবেলায় এই ফলটি খেয়েছিলাম। এর সাথে আমার শৈশবস্মৃতি জড়িত। যতদূর মনে পড়ে, গাছে উঠে ফলগুলো পেরে খেতে কী যে ভালো লাগলো। এখন তো এই টকরই ফল দেখাই যায় না।
ফলটি খাবার পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ফলটিকে হাতে নিয়ে জোরে জোরে একটু ধলতে হবে। তাতে ফলটি বেশ নরম হয়ে যায়। তারপর ছোট ছোট বিচিগুলো ফেলে পুরোটা খেতে হয়। টিপিয়ে খাওয়ার জন্য কেউ কেউ একে টেপা ফল বলে। এটি টকমিষ্টি স্বাদের ফল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৌলভীবাজার এর উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন এই ফল সম্পর্কে বাংলানিউজকে বলেন, টকরই ছাড়াও এই ফলের আরেকটি বাংলা নাম লুকলুকি। এর ইংরেজি নাম Indian Plum বা Coffee Plum। এটি একটি অপ্রচলিত ফল। এটি একটি স্থানীয় ফল যা বাংলাদেশ, ভারত এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে পাওয় যায়।
ফলটির উপকারিতা সম্পর্কে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, কফি প্লাম ওষুধিগুণসম্পন্ন এবং বিভিন্ন রোগের নিরাময়ে ব্যবহৃত একটি বিশেষ ফল। এটি ফল হজমশক্তি ও লিভারের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে। ডায়রিয়া সারাতে এবং মুখের রুচি বৃদ্ধিতে দারুণ সহায়ক। এ ফলটিতে ভিটামিন-সি, ভিটামিন-এ, পটাশিয়াম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে – যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
এই ফলটি ধমনীর স্বাস্থ্য উন্নত করার মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এর পাতা ব্রঙ্কাইটিস রোগের জন্য এবং গাছের শিকড় দাঁতের ব্যথা নিরাময়ে উপকারী বলে জানা যায়। এ ছাড়া ফলটি তাজা খাওয়া ছাড়াও জ্যাম, চাটনি বা শরবত তৈরি করে খাওয়া যায়।
ফলটির গবেষণা এবং চাষাবাদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ‘বারি লুকলুকি-১’ নামে একটি জাত উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। এটির চাষ অত্যন্ত সহজ এবং অল্প পরিসরেও যেমন ছাদ বাগান বা টবে করা সম্ভব। কারণ গাছ খুব বেশি যত্নের প্রয়োজন ছাড়াই বাড়ে।
টকরই বা লুকলুকি ফলের গাছ পাহাড় ও টিলায় ভালো জন্মায়। তবে এটি বসতবাড়িতে এবং ছাদ বাগানেও চাষ করা যায়। লুকলুকি গাছের জন্য খুব বেশি যত্নের প্রয়োজন হয় না। এটি বছরে একবার ফলন দেয়।
টকরই বা লুকলুকি বাংলাদেশের সিলেট, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবান অঞ্চলে দেখা যায়। তবে আগের মতো প্রাকৃতিক পরিবেশে এই ফলের গাছগুলো নেই বলে জানান উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন।
বিবিবি/এএটি