bangla news

হুমায়ূন আহমেদ : জোছনা ও জননীর গল্প

শেখর দেব | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৭-০৭-১৯ ৬:৪০:২৭ এএম
হুমায়ূন আহমেদ : জোছনা ও জননীর গল্প

হুমায়ূন আহমেদ : জোছনা ও জননীর গল্প

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কবিতার ঘোরের মধ্যে কেটেছে সময়, তখন কবিতা ছাড়া তেমন কিছুই পড়া হয়নি। তখন স্কুল ও কলেজগামী ছাত্রদের হাতে হুমায়ূন আহমেদের বই দেখতাম। ভাবতাম ইনি এমন কী লেখেন সবার কাছে এতো জনপ্রিয়।

পাঠ্য বইয়ের বাইরে প্রথম উপন্যাস পড়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’। পরে নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেমসাহেব’ এবং আরও কিছু উপন্যাস, এখন মনে পড়ে না। কবিতার প্রতি আগ্রহ হতেই রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, বিনয় মজুমদার, হুমায়ুন আজাদসহ বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের কাছেই থিতু হয়েছিলাম। সবার হাতে হাতে হুমায়ূন আহমেদ দেখে ইচ্ছে হলো তাকে পড়ার। আরও একটা কারণ ছিলো। তা হলো, বাংলা সাহিত্যে জীবিত এতো বিখ্যাত উপন্যাসিক আমি আর দেখিনি। বই মেলায় দেদার বিক্রি হচ্ছে হুমায়ূন। সবাই কিনছে, পড়ছে। শুধু আমি পড়ি না। উপন্যাসিক হিসেবে তখন মাথায় ছিলো শরৎচন্দ্র, মানিক, জহির রায়হান, আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস আরও অনেকে। হয়তো তারা কেউ বেঁচে ছিলেন না। হুমায়ূন জীবিত উপন্যাসিক। তাই হয়তো আগ্রহের মাত্রাও ছিলো কম। তবে তার ভৌতিক গল্প পড়েছিলাম। অন্যরকম মজা পেয়েছিলাম। বিশেষত তার রসিকতা ও গল্প বলে যাবার ঢং মুগ্ধ করেছিল। ভাবলাম পড়তে হবে। এতোই সহজলভ্য ছিলো তার বই। কিনতে হতো না। ব্যাচেলারদের বইয়ের ভাঁজে ঘাঁটলেই এক দুই পিস হুমায়ূন পাওয়া যেত। একদিন বন্ধুর ব্যাচেলর বাসা থেকে নিয়ে এলাম একটি বই। ‘মেঘের উপর বাড়ি’ সম্ভবত নাম। পড়া শুরু করার পর আঁচ করতে পারলাম কেন বন্ধুরা হুমায়ূন হুমায়ূন করে। বই হাতে নিলে যেনো রাখতেই ইচ্ছে হয় না। অমোঘ এক আকষর্ণ যেনো। পেটে প্রচণ্ড ক্ষিধে, মা ডাকছে খেতে আয় কিন্তু উপন্যাসের অধ্যায়টা শেষ করে যেনো উঠতেই মন চাচ্ছে না। এমনই টান। তখন বুঝতে পারলাম কেন জনপ্রিয় হবেন না তিনি?

তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র যখন জোছনা ও জননীর গল্প (২০০৪) নামের উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক সমকালের সাহিত্য সাময়িকী কালের খেয়ায় একটা রিভিউ পড়েছিলাম উপন্যাসটি নিয়ে। বুঝতে পারলাম এটা মুক্তিযুদ্ধের বিষয় নিয়ে লেখা উপন্যাস। তখন রিভিউটি পড়েই খুব আকর্ষিত হয়েছিলাম। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের বিষয়গুলোর প্রতি আমার তীব্র ইচ্ছেও কাজ করেছিল। বইয়ের দোকানে গিয়ে দেখলাম মোটা একটা বই। অনেক দাম। সেসময় এতো টাকা দিয়ে কেনার সামর্থ্য ছিলো না। তাই রিভিউ পড়েই সন্তুষ্ট থেকেছি। যেখানেই বইটি নিয়ে আলোচনা দেখেছি পড়েছি। এর মধ্যে ধার করে তার আরও কিছু উপন্যাস পড়েছি। অন্যরকম মজা। তবে অনেক সাহিত্য বোদ্ধাদের বলতে শুনেছি, হুমায়ূন আহমেদ সস্তা উপন্যাসিক। এগুলোকে উপন্যাস বল্লে উপন্যাসকে কী বলবো?! বয়সের কারণেই কী ভালো লাগছে এসব উপন্যাস? চিন্তায় পড়ে গেলাম। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস বেশি পড়া হয়েছে বলে হয়তো আমারও মনে হতো এসব উপন্যাস সস্তা জনপ্রিয় উপন্যাস মাত্র। এসবের কোনো সামাজিক ও রাষ্ট্রিক দায়বদ্ধতা নেই। রসিয়ে রসিয়ে গল্প বলা। আর কাতুকুতু দিয়ে হাসানো। আবার ভাবতাম, সাহিত্যের কাজ তো আনন্দ দেওয়া। তাইলে তো হুমায়ূন সেটা ভালো করেই দিতে পেরেছেন। মানুষ কী সাহিত্য পড়ে কিছু শিখতে চায় না আনন্দ পেতে চায়? কিন্তু শরৎচন্দ্রের কাছে গিয়ে শিখলাম সাহিত্যের কাজ একমাত্র আনন্দ দেওয়া নয়। সমাজ পরিবর্তনের ভূমিকা রাখতে হয় সাহিত্যকে। সাহিত্যেরও আছে একটি দায়বদ্ধতার জায়গা। সাহিত্য সমাজের দর্পণ শুধু নয়। সাহিত্য সামাজ কিরকম হওয়া উচিত তাও বলে দেবে। কারণ, লেখকরা তো আর সাধারণ মানুষ নন। তারা সমাজ বদলেও ভূমিকা রাখে। চিন্তাশীল ও মননশীল মানুষ। ২০০৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের এ উপন্যাসটি। আর তারও অনেক বছর পর একদিন কিনে আনলাম উপন্যাসটি। পড়ে ফেল্লাম এক নিমেষে। কয়েকদিন লেগে গেছে যদিও ৫০৫ পৃষ্টার উপন্যাসটি পড়তে। উপন্যাসটি শুরুর আগে ‘পূর্বকথা’ নামে এ উপন্যাস নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ নিজের অনুভূতি লিখেছেন সহজ সরলভাবে। হুমায়ূন আহমেদের যে বিষয়টি আমাকে টানে তা হলো সহজ বয়ান। বয়ানের সরলতা। একাত্তরের সময়টা যে আসলেই কী ভয়াবহ ছিলো তা খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায়। ১৯৭১ সালে তিনি মাত্র ২৩ বছর। অনার্স ফাইনাল দিচ্ছেন।

তিনি লিখেছেন, ‘জীবন বাঁচানোর জন্য মাদ্রাসার ছাত্র হিসেবে ভর্তি হতে গেছি শর্ষিনার পীর সাহেবের মাদ্রাসায়। পাকিস্তান মিলিটারি মাথায় গুলির বাক্স তুলে দিয়েছে। অকল্পনীয় ওজনের গুলির বাক্স মাথায় নিয়ে সৈন্যদের সঙ্গে বারহাট্টা থেকে হেঁটে হেঁটে এসেছি নেত্রকোনা পর্যন্ত।’

এই লাইনগুলো পড়েই আমার নির্মলেন্দু গুণ এর ‘হুলিয়া’ কবিতার কথা মনে পড়ে গেলো। ‘হুলিয়া’ কবিতাটাও ছিলো মুক্তিযুদ্ধের বিষয় নিয়ে। তার বিরুদ্ধে যখন হুলিয়া জারি করা হয়েছিল তখন তিনি বাড়ি যাওয়ার পথে বারহাট্টায় নেমে চা খেতে গিয়েছিলেন। অসাধারণ একটি কবিতা। বিষয়ে ফিরে আসি। হুমায়ূনেরও দেশের প্রতি ঋণ শোধের বিষয়টা মাথায় ছিলো। এ উপন্যাস যেনো সেই ঋণেরই শোধ।

তিনি লিখেছেন, ‘একসময় মনে হলো, মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় ধরে রাখার জন্যে একটি উপন্যাস লেখা উচিত। মানষকে যেমন পিতৃঋণ-মাতৃঋণ শোধ করতে হয়, দেশমাতার ঋণও শোধ করতে হয়। একজন লেখক সেই ঋণ শোধ করেন লেখার মাধ্যমে।’

এ উপন্যাস শুরু করে আর শেষ করতে পারছেন না। বিভিন্ন কাজ করছেন কিন্তু এটা অসমাপ্ত রয়ে গেলো। এর মধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটালে ওপেন হার্ট সার্জারি করতে গেছেন। অপারেশন টেবিলে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়ার পর হুমায়ূন অসমাপ্ত উপন্যাসের কথাই ভেবেছিলেন।

তিনি লিখেছেন, “যখন অচেতন হতে শুরু করেছি, তখন মনে হলো ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ তো লেখা হলো না। আমাকে যদি আর একবার পৃথিবীতে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হয়Ñ আমি এই লেখাটি শেষ করব।”

তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে এসেই লেখাটিতে হাত দিলেন এবং শেষ করে আমাদের হাতে তুলে দিলেন দেশমাতার কাছে শোধ দেওয়া ঋণ।
এই উপন্যাস হুমায়ূন আহমেদের অন্য আর পাঁচটি উপন্যাসের মতো। ভিন্ন শুধু এ উপন্যাসটি একটি জাতির একটি ইতিহাস ধরে রেখেছে। চরিত্র হিসেবে এসেছে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান ও কবি শামসুর রাহমান পর্যন্ত। এ উপন্যাস লিখতে গিয়ে তিনি সাহায্য নিয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের দলিলসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস বই।
উপন্যাসটি পড়া শুরু করলেই শিক্ষক মওলানা ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরী নামে একটি চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। সহজ সরল গ্রামের স্কুল শিক্ষক। ধর্মীয় বিশ্বাস প্রবল। হুমায়ূনের স্বাভাবিক রসালো গল্পের মতো করে শুরু করেছেন উপন্যাসটি। ইরতাজউদ্দিন কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে ছোটভাই শাহেদের বাসায় যাবে। হাতে রাজহাঁস। রাজহাঁস দেখে মানুষের ভিড় জমে গেছে। হাঁসটি তাকে ঠোকর দিলো দু’বার। তিনি লাফ দিয়ে উঠলেন। এমন ঠুনকো বয়ান দিয়ে শুরু। মওলানার লাফ দেখে সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন। এসব বয়ানের মাঝে হঠাৎ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে পাঠকে ভাবনার উদ্রেক করে আর চরিত্রগুলোকে সিরিয়াস রসিক করে তোলেন। মওলানা ভাবে, ‘মানুষ তার নিজ প্রজাতির দুঃখ-কষ্টে এতো আনন্দিত হবে কেন? তিনি ব্যথা পেয়েছেন। এতে অন্যরা আনন্দিত হবে কেন? এর মধ্যে রহস্যাটা কী? ঠাণ্ডা মাথায় ব্যাপারটা নিয়ে একসময় ভাবতে হবে।’ ‘সিরিয়াস রসিক’ বলেছি এজন্যে যে রসিকতার মধ্যে একটা সিরিয়াসনেস নিয়ে আসেন তিনি। অনেক সময় ভাবনার দ্বৈত সত্তাকেও উন্মোচন করেন রসিকতার ছলে। যেমন, ‘এতক্ষণ ধরে মাফলার পরে থাকায় গলা চুলকাচ্ছে। দুটা হাতই বন্ধ, গলা চুলকানো সম্ভব নয়। মানুষের তিনটা করে হাত থাকলে ভালো হতো। তিন নম্বর হাতটা সময়ে অসময়ে কাজে লাগত।’ ঠিক একটু পরেই বলছেন, ‘এই ধরনের অদ্ভুত চিন্তা মাথায় আসায় ইরতাজউদ্দিন মনে খুবই দুঃখ পেলেন। আল্লাহপাক অনেক চিন্ত-ভাবনা করে মানুষ বানিয়েছেন।’ রসিকতার মধ্যে এসব বয়ান হুমায়ূনের দ্বারাই সম্ভব।  ইরতাজউদ্দিন নীলগঞ্জ জুমা মসজিদে শুক্রবারের জুম্মার নামাজে ইমামতি করেন। ধর্মপ্রাণ সৎ লোক। আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস তার। ইরতাজউদ্দিনের মুখ দিয়ে হুমায়ূন বলিয়েছেন, ‘স্ত্রীর সঙ্গে রাগারাগি, এ কেমন কথা? মেয়েরা হচ্ছে জন্মদাত্রী জননী। হাজার ভুল করলেও এদের উপর রাগ করতে নেই। এদের উপর রাগ করাটাই কাপুরুষতা। অক্ষম এবং দুর্বল পুরুষরাই শুধু স্ত্রীর সঙ্গে রাগারাগি করে।’ গভীর বোধের চেতনাগুলোও উঠে এসেছে তার মুখ দিয়ে, ‘মিথ্যা এমন জিনিস যে কয়েকবার বললেই অভ্যাস হয়ে যায়। তখন কারণ ছাড়াই মিথ্যা বলতে ইচ্ছে করে।’ ইরতাজউদ্দিন স্কুলের জন্য পতাকা কিনবে। ছোটভাই শাহেদ বিস্মিত হয়ে বলল, কী পতাকা কিনবেন? ইরতাজউদ্দিন বিশ্বাস করতে পারেনি বাংলাদেশ নামের একটি দেশ হবে। পাকিস্তানের পতাকা কিনে তা আর স্কুলে ওড়ানো যাবে না। ইরতাজউদ্দিনের মুখেই বলি, “ ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বাংলা’ বলে চেঁচালেই দেশ স্বাধীন হয় না। পাকিস্তানি মিলিটারি যখন একটা ধাক্কা দিবে, তখন কোথায় যাবে ‘জয় বাংলা’! অথচ সেই ইরতাজউদ্দিনকে মুক্তিযুদ্ধে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। তার ধর্ম বিশ্বাস ছিলো মানবতার। সেটা বুঝা যায় যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। হিন্দুদের জোর করে মুসলমান করা হচ্ছে। রীতিমতো খৎনা করে মুসলমান। এসব দেখে ইরতাজউদ্দিনের নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে একজন মুসলমান হিসেবে। ইরতাজউদ্দিন ঘোষণা দিলেন তিনি আর জুম্মার নামাজের ইমামতি করবেন না। পরাধীন দেশে জুম্মার নামাজ হয় না। নবি-এ-করিম যতোদিন মক্কায় ছিলেন জুম্মার নামাজ পড়েননি। জুম্মার নামাজ না পড়ানোর শাস্তি হিসেবে নীলগঞ্জের শ্রদ্ধেয় ইরতাজউদ্দিনকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় সারা গ্রাম প্রদক্ষিণ করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হলো।
হুমায়ূন আহমেদ মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলোকে ধরতে পারেন খুব সুন্দরভাবে। পাঠকের মনে জাগিয়ে দেন চিন্তার খোরাক। তার আত্মোপলব্ধিগুলো সচেতনতার সঙ্গে ঢুকিয়েছেন উপন্যাসের পরতে পরতে। জাতীয় পরিষদের নির্বাচন পরবর্তী জনগনের মশাল মিছিল দেখে তিনি বলেন, ‘হাতে মশাল থাকলেই আগুন জ্বালাতে ইচ্ছে করে। হাতে তলোয়ার থাকলে কোপ বসাতে ইচ্ছে করে। বন্দুক থাকলে ইচ্ছা করে গুলি করতে। মানবচরিত্র বড়ই অদ্ভুত! আচ্ছা কারোর হাতভর্তি ফুল দিলে সে কী করবে? ফুল বিলাতে শুরু করবে?’ সত্য মিথ্যা নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সত্য কথার প্রধান সমস্যা হলো, সত্য কথা শুনতে ভালো লাগে না। যে বলে তাকেও ভালো লাগে না। মিথ্যা কথা শুনতে ভালো লাগে। যে বলে তাকেও বড় আপন মনে হয়।’ ঠিক এমনি কিছু জীবনের নিগুঢ় সত্যচেতনাকে তিনি ধারণ করেছেন এবং উপন্যাসের বিভিন্ন পাত্রপাত্রির মুখে বলিয়েছেন।
একাত্তরের বিভিন্ন সময়কে ঘটনাক্রমে তিনি ধরে রেখেছেন উপন্যাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায়। ০১ মার্চ, ১৯৭১ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার রেডিও ভাষণ, ০৭ মার্চ এর রেসকোর্স ময়দানের চিত্র ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, পল্টনের মাঠে মওলানা ভাসানীর ভাষণ, বর্ণিত হয়েছে ২৫ মার্চ কালো রাত্রির চিত্র। ২৫ মার্চ রাতের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘আকাশে ট্রেসার উড়ছে। আকাশ আলো হয়ে উঠছে। তৈরি হচ্ছে আলোর নকশা। যেন বারবার কালো আকাশ ঝলমলিয়ে উঠছে উৎসবের হাউই বাতি। তারাবাতির মতো আগুনের ফুলকি বেরুচ্ছে মেশিনগানের মুখ থেকে। বাজির শব্দের মতো গুলি। উৎসব। অন্য ধরনের উৎসব। হত্যা ও ধ্বংসের উৎসব। এই উৎসবের জন্য কেউ কি তৈরি ছিল? ঢাকার ঘুমন্ত মানুষ ভয়াবহ আতঙ্ক নিয়ে জেগে উঠল। কী হচ্ছে? কী হচ্ছে?’ এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র : অষ্টম খণ্ড থেকে উল্লেখ করেছেন সেই কালো রাত্রির প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার। পরদেশী, চুন্নু ডোম নামের দুইজন সুইপারের সাক্ষাৎকার হতে উক্ত রাতের ভয়াল ও নৃশংস ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। কীভাবে লাশের পর লাশ তারা ভাগাড়ে টেনেছে! এছাড়াও উক্ত স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল থেকে তিনি কিছু মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকার উল্লেখ করেন। মুক্তিযুদ্ধে হানাদার, রাজাকার, আল বদর, আল শামস এর নির্মম নির্যাতনের চিত্র ফুটে ওঠে। আমাদের মা-বোনদের সম্ভ্রম কীভাবে নষ্ট করেছে তার অবর্ণনীয় চিত্র উঠে এসেছে এসব সাক্ষাৎকারে।
সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন ও ধর্মান্তরকরণের মানবেতর চিত্রও ফুটে উঠেছে। কোনো চরিত্রের বক্তব্য হয়তো এমন, ‘আজ কুড়াল দিয়ে এক কোপ দিয়ে হিন্দু কম্পাউন্ডারের কল্লা আলাদা করে ফেলেছে’। ‘হিন্দু জানলেই দ্বিতীয় কোনো কথা বলার সুযোগ নেই- গুলি’ ‘তুমি যে হিন্দু না এটা প্রমাণ করো। প্যান্ট খুলে দেখাও।’ জোছনা ও জননীর গল্প উপন্যাস সত্যিকার অর্থেই একটি নতুন দলিল।
গল্প বলার ফাঁকে তিনি সে সময়ের বাস্তব চিত্র তুলে এনেছেন সুচারুরূপে। তিনি একান্ত নিজের কথাও বলেছেন নিজ পিতার কথা বলতে গিয়ে। তিনি লিখেছেন, ‘পিরোজপুর মহকুমার সাব ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার এই ঘোষণা শুনে আনন্দে ছেলেমানুষের মতো চিৎকার শুরু করতে থাকেন, ‘যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমরা যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছি। আর ভয় নাই।’ তিনি পিরোজপুরের পুলিশদের অস্ত্রভাণ্ডার থেকে দুইশ রাইফেল স্থানীয় জনগণকে দিয়ে দেন। যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে। পাকিস্তান মিলিটারি তাকে হত্যা করে ০৫ মে। এই ঘটনার বত্রিশ বছর পর তার বড়োছেলে ‘জোছনা ও জননী’ নামে একটা উপন্যাস লেখায় হাত দেন।

বাংলাদেশ সময়: ১৬২৭ ঘণ্টা, জুলাই ১৯, ২০১৭
এসএনএস

 

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2017-07-19 06:40:27