bangla news

জন্মশতবর্ষে উইলিয়াম গোল্ডিং

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১১-০৯-১৯ ৭:২৪:৩৯ এএম

পাণ্ডুলিপি হাতে একুশবার বিভিন্ন প্রকাশকের কাছ থেকে প্রত্যাখাত হওয়ার পর হয়ত হতাশ হয়ে একজন লেখক তার লেখালেখি ছেড়েই দেবেন। কিন্তু এটা কি সম্ভব, একুশবার প্রত্যাখাত হওয়ার পরও ওই একই পাণ্ডুলিপি দিয়ে পরে বিশ্বখ্যাত লেখক হয়ে ওঠা।

পাণ্ডুলিপি হাতে একুশবার বিভিন্ন প্রকাশকের কাছ থেকে প্রত্যাখাত হওয়ার পর হয়ত হতাশ হয়ে একজন লেখক তার লেখালেখি ছেড়েই দেবেন। কিন্তু এটা কি সম্ভব, একুশবার প্রত্যাখাত হওয়ার পরও ওই একই পাণ্ডুলিপি দিয়ে পরে বিশ্বখ্যাত লেখক হয়ে ওঠা।এমনটাই ঘটেছিল সাহিত্যে ১৯৮৩ সালের নোবেলপ্রাপ্ত ‘লর্ড অব দ্যা ফ্লাইজ’-এর লেখক উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের জীবনে।

উইলিয়াম গোল্ডিং ১৯১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কর্নওয়াল-এ জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশোনা করেছেন মার্লবোরো গ্রামার স্কুলে। বাবা ছিলেন স্কুলের শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই বাবা চাইতেন ছেলে বড় হয়ে বিজ্ঞানী হবে। উইলিয়ামও মনে মনে এমনটাই স্বপ্ন দেখতেন।

তবে এক পর্যায়ে তিনি এ স্বপ্ন থেকে বের হয়ে আসেন। বাবার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হঠাৎ প্রতিবাদ জানান। বলেন, তিনি লেখক হতে চান। ভর্তি হন ইংরেজি সাহিত্যে। একাডেমিক পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।

তবে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও বহুবার জীবনের বাঁক পরিবর্তন হয় উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের। ১৯৪০ সালে তিনি রয়েল ব্রিটেনের নেভিতে যোগ দেন। সেখানে থাকা অবস্থাতেই যুদ্ধের ভয়াবহতা খুব কাছ থেকে দেখেন। কিভাবে রকেট হামলা চালানো হয়, কিভাবে সাবমেরিন দিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়; এ সব বিষয় নিজ চোখে দেখেন। প্রশিক্ষণও নেন এসকল বিষয়ের উপর। শাসক-শোষক শ্রেণীটির দ্বন্দ তিনি ওই সময়গুলোতে খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করেন। এরপর যুদ্ধের ভয়াবহতা শেষে ছয় বছর পর তিনি আবার শিক্ষকতা জীবনে ফিরে যান।

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011September/lord of the flies220110919171519.jpgনিজের এই অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে লেখেন তার প্রথম উপন্যাস ‘লর্ড অব দ্যা ফ্লাইজ’। প্রকাশকদের কাছ থেকে ২১ বার প্রত্যাখাত হওয়া এ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর থেকে উইলিয়াম আর থেমে থাকেননি; একের পর এক কালজয়ী সব উপন্যাস লিখে গেছেন । তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে-- The Inheritors (novel) ১৯৫৫,  Pincher Martin (novel) ১৯৫৬, The Brass Butterfly (play) ১৯৫৮, Darkness Visible (novel) ১৯৭৯, Rites of Passage (novel) ১৯৮০, A Moving Target (essays and autobiographical pieces) ১৯৮২।

১৯৮০ সালে তিনি সাহিত্যকর্মের জন্য অর্জন করেন বুকার পুরস্কার এবং ১৯৮৩ সালে নোবেল পুরস্কার। ১৯৮৮ সালে ইংল্যান্ডের রাণি তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন।

১৯৮৩ সালে যেদিন নোবেল ফাউন্ডেশন থেকে উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের নাম প্রকাশ করা হয় তখন তারা বলেন, ‘তার উপন্যাসে বাস্তবসম্মত, বৈচিত্র্যময় আখ্যান এবং বিশ্বজনীনতা ও সুস্পষ্টতা রয়েছে তা বর্তমান বিশ্বের মানুষের অবস্থাই প্রকাশ করে।’  

নোবেল প্রাপ্তির দিনের কথা তিনি তার ডায়েরিতে লিখেছেন এভাবে :

৬ অক্টোবর, ১৯৮৩

‘আজকে সকাল দশটায় ইঙ্গমার হোয়াটসিট স্টোকহোম থেকে ফোন দেয়। সে খুব রহস্য করে বলে, নোবেল পাওয়ার জন্য আমার হাতে নাকি আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আছে। তারপর বলে, নোবেল প্রাইজ পেতে আমার নাকি ফিফটি ফিফটি সুযোগ আছে। এটা খুবই স্বার্থপরতার উদারহরণ ছিল। কারণ, ঘণ্টাখানেক পরেই আমার দরজায় যাতে করে সে সবার আগে হানা দিতে পারে। কারণ, সব জায়গাতেই তাদের সাংবাদিক আছে। তারপরও আমি বললাম, ‘না আমি পাবো না।’ তার ধারণাটিকে আমি ভুল বলে উল্লেখ করলাম।’

শুরুতে উইলিয়াম নোবেলের কথা ভাবতে না পারলেও পরে তিনি লেখেন,

টিভি ও রেডিওতে আমি সবশেষ পাঁচটি সংবাদ দেখলাম। সর্বত্রই বলা হচ্ছে, আমি নোবেল জিতে গেছি। তারপর তো সারাদিন ফোন রিসিভ করছি। আমি ক্লান্ত হয়ে, এ্যানের হাতে ফোন ধরার কাজটি দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু ঠিক তখনই টেলিভিশনের লোকজন এসে ঘরে ঢুকলো। এরপর টেলিভিশনের সাংবাদিক, ফটোগ্রাফাররা একে একে ভিড় জমাতে থাকলো।’ 

এ অনুভূতিগুলো উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের জন্য অন্যরকম ছিল। তবে সে খুবই খুশী হয় যখন নোবেল প্রাপ্তির কথা শুনে তার সবচেয়ে পুরানো বন্ধুরা বাসায় এসে তাকে শুভেচ্ছা জানায়। এ বন্ধুদের সাথে তার পরিচয় ১৯৪০ সালের দিকে। তবে উইলিয়াম বিকেলের দিকে হাতে ব্যথা অনুভব করেন। কারণ, সবার সাথে হাত মেলাতে মেলাতে তার হাতে ব্যথা শুরু হয়।


সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার পর পরিবারের সকলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন। তবে নোবেল কমিটির একজন বিচারক এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বলেন, ‘এ পুরস্কার গোল্ডিংয়ের হাতে যাওয়া উচিত নয়।’ যাইহোক, এগুলো শুনলেও উইলিয়াম গোল্ডিং খুব একটা হতাশ হননি। তিনি বরং বলেছেন, ‘আমার আগে যারা নোবেল পেয়েছেন তাদের পাশে যে আমার নামটি আসতে পারে। কিংবা আমাকে যে মনোনিত করতে পারে; আমার লেখাগুলো যে মানসম্মত বলে বিবেচিত হতে পারে; এটাই আমার কাছে বড়।

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011September/william_golding_with_his_famil20110919171302.jpg১৯৮৩ সালের নভেম্বরের দিকে উইলিয়াম ও তার স্ত্রী স্টোকহোম যান নোবেল পুরস্কার গ্রহণের জন্য। সেখানে গিয়ে পৌঁছায় তার অত্যন্ত কাছের বন্ধু চার্লস মনটেইথ । চার্লসের প্রতি উইলিয়াম গোল্ডিং বরাবরই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কারণ, তার প্রথম উপন্যাস ‘লর্ড অব দ্য ফ্লাইজ’ কোন প্রকাশক প্রকাশ করতে রাজি হচ্ছিলেন না। বারবার তিনি ব্যর্থ হয়েছেন এ উপন্যাস প্রকাশ করতে গিয়ে। পরবর্তীকালে ১৯৫৩ সালে  সম্পাদক চার্লস মনটেইথ ‘লর্ড অব দ্য ফ্লাইজ’ প্রকাশ করে দেন। তাই চার্লসের প্রতি তিনি বলেন, ‘আমার বন্ধু চার্লসের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। সেই সাথে আমার সবগুলো সৃষ্টির প্রথম পাঠক আমার স্ত্রীর প্রতি সমুদ্র সমান কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও কম হবে।’

সুইডেনের রাজার কাছ থেকে উইলিয়াম গোল্ডিং মেডেল গ্রহণ করেন। রাজা আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলেন, ‘জনাব গোল্ডিং আপনার সাথে দেখা হওয়াটা আমার জন্য পরম সৌভাগ্যের; কারণ আপনার ‘লর্ড অব দ্য ফ্লাইজ’ আমি পড়েছি যখন আমি স্কুলে ছিলাম।’

সাহিত্যে নোবেল পেয়ে উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের জীবনচিত্র পুরোই পাল্টে যায়। তার সাহিত্যকর্ম বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হতে থাকে।  

১৯৮৩ সালের ২২ ডিসেম্বর উইলিয়াম ডায়েরিতে লেখেন, ‘আজ সকালে আমার ছেলে ডেভিডকে নিয়ে কিছু উপহার নিয়ে ঘরে আসলাম। একটা ডেভিডের জন্য, একটা আমার তিন নাতির জন্য। আমার স্ত্রীর এ্যানের জন্য তো আমি আছি। আমার মনে হয়, নিজের জন্য নোবেল প্রাইজটাই অনেক বড় উপহার।’   

ছোটবেলা থেকেই গোল্ডিং লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে প্রথম তার লেখা প্রকাশিত হয়। গোল্ডিং তার জীবনে উপন্যাস ছাড়াও নাটক, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা, ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন। তাঁর ইজিপ্ট নিয়ে অসাধারণ একটি ভ্রমণ কাহিণী আছে।  
অসামান্য এ লেখক ১৯৯৩ সালের ১৯ জুনের সুন্দর সকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তবে মৃত্যুর পরও গোল্ডিংয়ের অসংখ্য অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে। যা আজও সংরক্ষিত আছে। বিশেষ করে তার জীবনের মুহূর্তগুলো ধরে রাখতে তিনি নিয়মিত যে ডায়েরি লিখতেন তা।

১৯৭১-১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি তার ভাবনা ও কল্পনা নিয়ে ডায়েরি লিখেছেন। তবে গোল্ডিং সাহিত্য আলোচনা-সমালোচনামূলক লেখা লিখতে পছন্দ করতেন। তার প্রথম কবিতা সংকলন প্রকাশ হয় ১৯৩৫ সালে। উইলিয়াম লেখালিখি ছাড়াও ছিলেন স্কুলের শিক্ষক। পাশাপাশি তিনি মঞ্চে অভিনয় করতেন, এবং মিউজিকও করতেন।

১৯ সেপ্টেম্বর এ অসাধারণ সাহিত্যিক উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের জন্মশতবার্ষিকী। বিশ্বে নানান ভাষায় প্রকাশিত তাঁর সাহিত্যকর্ম উইলিয়াম গোল্ডিংকে চিরজীবন বাঁচিয়ে রাখবে।  

বাংলাদেশ সময় ১৬১৫, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
db 2011-09-19 07:24:39