ঢাকা, সোমবার, ৮ আশ্বিন ১৪২৬, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
bangla news

তেনজিন সুন্দু এর কবিতা

|
আপডেট: ২০১১-০৪-১৭ ৬:৪৪:০৫ এএম

কবি তেনজিন সুন্দু একজন তিব্বতি। জন্ম উত্তর ভারতের কোন এক উদ্বাস্তু শিবিরে। তার জন্ম তারিখ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই। তবে ভারতের বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে তার তিনটি জন্ম তারিখ লিপিবদ্ধ আছে।

কবি তেনজিন সুন্দু একজন তিব্বতি। জন্ম উত্তর ভারতের কোন এক উদ্বাস্তু শিবিরে। তার জন্ম তারিখ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই। তবে ভারতের বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে তার তিনটি জন্ম তারিখ লিপিবদ্ধ আছে। ১৯৫৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হবার পর আরো হাজারো তিব্বতির মত সুন্দুর বাবা-মা পালিয়ে চলে আসেন ভারতে। মাসুমারি, বীর এবং মানালিতে পার্বত্য সড়ক নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে তারা কাজ করেন দীর্ঘ দিন। কিন্তু ভারতের বৈরী উষ্ণ আবহাওয়ায় শত শত তিব্বতির মৃত্যু হলে তার বাবা-মা শিশু সুন্দুকে নিয়ে চলে আসেন ধর্মশালায়।

এখানেই শুরু হয় সুন্দুর স্কুল জীবন। পরে তিনি অধ্যয়ন করেন চেন্নাই ও মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন সহপাঠীদের কাছ থেকে অর্থ ধার করে তিনি প্রকাশ করেন তার প্রথম কাব্য ‘ক্রসিং দ্য বর্ডার’। এই গ্রন্থটির কারণেই আন্তর্জাতিক সমাজ ও নির্বাসিত তিব্বতিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন তিনি। তিব্বতের স্বাধীনতা প্রত্যাশী এই কবির দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘কোরা’ প্রকাশিত হবার পর তিনি হয়ে ওঠেন স্বাধীনতাকামী তিব্বতিদের অন্যতম মুখপাত্র। তিব্বতের স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ নিয়ে সুন্দু তার তৃতীয় গ্রন্থ ‘শেমশুক’ প্রকাশ করেন ২০০৭ সালে।
 
তেনজিন সুন্দুর প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা তিনটি হলেও তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় ইন্টারন্যাশনাল পেন, ইন্ডিয়ান পেন, দি ইন্ডিয়ান লিটারারি প্যানারমা, আউটলুক, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য লিটল ম্যাগাজিন ও দি ইকোনোমিক টাইমস-এ।

তেনজিন সুন্দু তার চমৎকার সাহিত্য দক্ষতার জন্য নন-ফিকশন ক্যাটাগরিতে ‘আউটলুক-পিকাডোর পুরস্কার’ লাভ করেন ২০০১ সালে। তাছাড়া ২০০৫ সালে নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘দ্বিতীয় দক্ষিণ এশিয় সাহিত্য সম্মেলন’ এ তিনি তিব্বতের প্রতিনিধিত্ব করেন।

কবি তেনজিন সুন্দু  ‘ফ্রেইন্ডস অব তিব্বত’ এর ভারত শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ১৯৯৯ সাল থেকে।
tenzin tsundue

দিগন্ত

ঘর থেকে
তুমি পৌঁছে গেছ এই দিগন্ত পর্যন্ত।
এখান থেকেও তুমি চলে যাবে
অন্য দিগন্তে।
সেখান থেকে  আরেক দিগন্তে,  
দিগন্ত থেকে দিগন্তে।
তোমার প্রতিটি পদক্ষেপই দিগন্ত।
প্রতিটি পদক্ষেপ গুনে গুনে
মনে রেখো চূড়ান্ত সংখ্যাটি।
তুলে নিও সাদা নুড়ি পাথর আর
অদ্ভুত পাতাগুলো।
পথের প্রতিটি বাঁক চিহ্নিত করো,
সাথে পাহাড়ের চূড়াগুলোও।
ঘরে ফিরতে
হয়তো প্রয়োজন হবে এগুলো।


বেপরোয়া বয়স

আমার দালাই লামাকে হত্যা করো
যাতে আমি আর তাকে বিশ্বাস না করি।
আমার মুণ্ডুটা পুতে ফেল
আঘাত করো।
আমাকে নগ্ন করো
শৃঙ্খলিত করো।
তবে আমাকে মুক্ত হতে দিও না।
জেলখানার সীমানায়
এই দেহটা তোমাদের।
কিন্তু এই দেহের সীমানায়
আমার বিশ্বাস শুধুই আমার।
চাও এসব?
আমাকে এখানেই হত্যা করো নিঃশব্দে।
নিশ্চিত হও, আমার দেহে
নিঃশ্বাসের ছিটেফোঁটাও  অবশিষ্ট নেই।
তবুও আমাকে মুক্ত হতে দিও না।
যদি চাও
তবে একই কাজ বার বার করো।
একদম প্রথম থেকে শুরু করো :
আমাকে নিয়মানুবর্তী করো
নতুন করে শিক্ষিত করো
তোমাদের আদর্শে দীক্ষিত করো,
হাজির করো সাম্যবাদের ছলাকলা।  
কিন্তু তবুও আমাকে মুক্ত হতে দিও না।
আমার দালাই লামাকে হত্যা করো,
আমি আর তাকে বিশ্বাস করবো না।


তিব্বতি সত্তা

ঊনচল্লিশটি বছর আমি নির্বাসনে।
আজতক কোন রাষ্ট্রই সমর্থন করেনি আমাদের।
একটি রাষ্ট্রও নয়।
আমরা উদ্বাস্তু।
এক নিখোঁজ দেশের জনতা।
আমরা নাগরিক নই কোন দেশের।
তিব্বতিরা এখন বিশ্বের দরদের ভাণ্ডার।
শান্তিপ্রিয় ভিক্ষু আর স্থূল ঐতিহ্যবাদী;
সংখ্যায় যারা এক লাখ কিংবা কয়েক হাজার বেশি,
চমৎকার মিশে গেছে
নানান সুপাচ্য সাংস্কৃতিক আধিপত্যে।  
প্রতিটি চেকপোস্ট ও দপ্তরে
আমার পরিচয় ‘ভারতীয়-তিব্বতি’।
আমার নিবন্ধন সনদ প্রতিবছর
আমি নবীকৃত করি সালামের বিনিময়ে।  
যেন ভারতে জন্ম নেয়া এক বিদেশী আমি।
আমার এই নাদুশনুদুশ তিব্বতি চেহারার কথা বাদ দিলে
ভারতীয় হিসেবে কোন অংশেই কম নই আমি।
নেপালি? থাই? জাপানি?
চীনা? নাগা? মনিপুরি?
কিন্তু কখনোই কেউ প্রশ্ন করে না-- ‘আপনি কি তিব্বতি?’
আমি তিব্বতি।
যদিও তিব্বত থেকে আমি আসিনি।
সেখানে ছিলামও না কখনও।
আমি এখনও স্বপ্ন দেখি
তিব্বতেই মৃত্যু হবে আমার।

প্রতারণা

আমার বাবার মৃত্যু হয়েছিল
আমাদের ঘর, গ্রাম আর
দেশকে রক্ষা করতে গিয়ে।
আমিও চেয়েছিলাম লড়াই করতে।
কিন্তু আমরা যে বৌদ্ধ।
লোকে বলে, শান্তিকামী
আর অহিংস হওয়াই আমাদের জন্য শ্রেয়।
তাই শত্রুকে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি।
তবুও কখনো কখনো আমার মনে হয়
বাবার সাথে আমি প্রতারণা করেছি।

আমি ক্লান্ত

আমি ক্লান্ত;
১০ মার্চের আনুষ্ঠানিকতা পালন আর
ধর্মশালার পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করতে করতে আমি ক্লান্ত।
আমি ক্লান্ত;
রাস্তার পাশে সোয়েটার বিক্রি আর ৪০টি বছর
ধূলা ও থুথুর মধ্যে অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে আমি ক্লান্ত।
আমি ক্লান্ত;
ডাল-ভাত খেতে খেতে আর    
কর্ণাটকের জঙ্গলে গরু চরাতে চরাতে আমি ক্লান্ত।
আমি ক্লান্ত;
মানজু টিলার ধূলিভরা পথে
পরনের ধুতি টানতে টানতে আমি ক্লান্ত।
আমি ক্লান্ত;
যে দেশকে কখনো দেখিনি
তার জন্য লড়াই করতে করতে আমি ক্লান্ত।

নির্বাসিত ঘর

আমাদের টালিকরা ছাদ দিনকে দিন
জলের ফোটার মত খসে পড়ছিল।
ঘরের চার দেয়ালও  হুমকি দিয়েছিল
পুরনো বন্ধন ছিন্ন করে হঠাৎ ধ্বসে পড়ার।
তারপরও তাড়াহুরো করেই ঘরে ফিরতে হতো আমাদের।

ঘরের সামনে আমরা পেঁপে গাছ লাগিয়েছিলাম
আর বাগানে কাঁচা লঙ্কা।
চাঙমার বেড়ায় ঘিরে দিয়েছিলাম পুরো বাড়ি।
গোয়াল ঘরের চাল বেয়ে ঝুলে পড়েছিল কুমড়ো লতা,
দুরন্ত বাছুরগুলো লাফিয়ে বেড়াতো চাড়ির আশেপাশে।

ঘরের ছাদে অবাধে বেড়ে উঠেছিল ঘাস,
মাচা ছাড়িয়ে শিমগাছগুলো ঝুলে পড়েছিল নিচে।
আর ওদিকে জানালা আকড়ে ধরেছিল লতানো মানিপ্ল্যান্ট।
 
এসব দেখে মনে হবে, আমাদের ঘরের শিকড় গজিয়ে গেছে।

চাঙমার বেড়া এখন এক জঙ্গল।
আমি কিভাবে আমার সন্তানদের বলব,
আমারা কোথা থেকে এসেছিলাম?

** চাঙমা : এক ধরনের দ্রুত বর্ধনশীল গাছ। সাধারণত বাড়ির চারদিকে বেড়া হিসেবে লাগানো হয়।


পেড্রোর বাঁশি

পেড্রো! পেড্রো!
তোমার ঐ বাঁশিতে কী আছে?
সেই মা হারা ছোট্ট ছেলেটি,
সারা শহরেই এখন যার ভবঘুরে উপস্থিতি,
যার নগ্ন পা আঘাত করে শহুরে পথের স্যাঁতসেঁতে খোয়াগুলোকে,
তোমার বাঁশিতে সে আছে কী?

পেড্রো! পেড্রো!
আমাকে বল, তোমার ঐ বাঁশিতে কী আছে?
১৬ বছরের গর্ভবতী বালিকার চাপা আর্তনাদ,
যাকে ঘর থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে,
উদ্যানের টয়লেটের পেছনে যে এখন নিঃসঙ্গ সংসার করে,
তোমার বাঁশিতে সে আছে কী?

সামান্য একটি প্লাস্টিকের নলে
কি বিস্ময়কর তোমার ফুঁ দেবার শিল্প!
কি বিস্ময়কর, বাঁশিতে তার জীবন্ত সঞ্চারণ!
একটি বাঁশি : চোখ নেই, কান নেই, মুখ নেই
অথচ ধ্বনি করে,
কান্না করে, গেয়ে চলে গান।
তার সুর হয়ে ওঠে ছোট ছোট সুচাগ্র তীর,
যে তীর বিদ্ধ হয়,
এমনকি বিদ্ধ হয় পেঁচাদের হৃৎপিণ্ডে।
যে পেঁচাদের কান লোমে আবৃত।

পেড্রো! পেড্রো!
আমাকে বল, তোমার ঐ বাঁশিতে কী আছে?
তবে কি জানালার কব্জার ঐ শিস ধ্বনি
সেই গর্ভবতী বালিকার কান্না?
নাকি সেই ছোট্ট ছেলেটির শ্বাস-প্রশ্বাস
যে এখন ক্লান্ত; হাজতখানায় ঘুমন্ত?

পেড্রো! পেড্রো!
আমাকে বল, তোমার ঐ বাঁশিতে কী আছে?

বাংলাদেশ সময় ১৬০২, এপ্রিল ১৭, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2011-04-17 06:44:05