bangla news

‘পিতৃগণ’ উপন্যাসের সন্ধানে

|
আপডেট: ২০১০-১১-১৩ ৩:১১:১৯ এএম

পাঁচবিবির বিনয় সরকার কিছুতেই নিজেদের আদিবাসী কোনো কৌম বা ট্রাইব বলে মানতে রাজি নন। তাঁর পরিষ্কার কথা। তাঁরা আদি বাঙালি এবং হিন্দু। ব্রক্ষ্মার পা থেকে সৃষ্ট অর্থাৎ শূদ্র হলেও হিন্দু। একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল রানীনগরের সুজিত-মানিক-বিশ্বেশ্বর, এবং গুরুদাসপুরের বিরাম, জগুদাসের সাথে কথা বলেও।

পাঁচবিবির বিনয় সরকার কিছুতেই নিজেদের আদিবাসী কোনো কৌম বা ট্রাইব বলে মানতে রাজি নন। তাঁর পরিষ্কার কথা। তাঁরা আদি বাঙালি এবং হিন্দু। ব্রক্ষ্মার পা থেকে সৃষ্ট অর্থাৎ শূদ্র হলেও হিন্দু। একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল রানীনগরের সুজিত-মানিক-বিশ্বেশ্বর, এবং গুরুদাসপুরের বিরাম, জগুদাসের সাথে কথা বলেও। বিনয় সরকারের কথা-- আমরা কৈবর্ত। তবে সাঁওতাল-ওঁরাও-মুশহর-মালপাহাড়িদের মতো আদিবাসী নই; বাঙালি। বিএ পাস বিনয় সরকার এখন মাস্টারি করেন। বেশির ভাগ স্কুল-কলেজের মাস্টাররা পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বড়জোর খবরের কাগজ পড়েন। বিনয় সরকারের পাঠ তাদের চাইতে একটু বেশি। হয়তো এই প্রশ্নের মুখোমুখি আগেও তাঁদের হতে হয়েছে বলে, কিংবা সত্যিসত্যিই বিনয় সরকারের একটু গভীর পাঠের অভ্যেস আছে বলে তিনি নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙালীর ইতিহাস- আদিপর্ব’কে সাক্ষী মানলেন। তাঁর মতে কৈবর্তরা হচ্ছেন হিন্দু ধর্মের অন্তর্গত বাঙালি অংশই। যদিও নমঃশূদ্র। বল্লাল সেনের বর্ণবিন্যাসে তাঁদের ‘মাহিষ্য কৈবর্ত’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং তাঁদের ‘জলচল শূদ্র’ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জলচল শূদ্ররা আবার শূদ্রদের মধ্যে কিছুটা উচ্চশ্রেণীর বলে গণ্য হয়ে থাকেন। অতএব সেই মর্যাদা ছেড়ে নিজেদের কিছুতেই ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর উত্তরাধিকারী হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন বিনয় সরকার এবং কৈবর্তদের আরো অনেকেই।

যেহেতু সাক্ষী মানা হয়েছে নীহাররঞ্জন রায়কে, তাই বহুবার পড়া থাকলেও আবার খুলে বসতে হয় ‘বাঙালীর ইতিহাস- আদিপর্ব’। দেখা যাচ্ছে বিনয় সরকারের বক্তব্য ঠিক, আবার ঠিক নয়ও। তাঁদের জলচল শূদ্রে উন্নীত হওয়ার ঘটনাটিই আগে বলা যাক। ‘বল্লাল-চরিত’ নামে দুইখানা গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। একটির লেখক আনন্দভট্ট। নবদ্বীপের রাজা বুদ্ধিমন্ত খাঁ-র পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি বইটি লিখেছিলেন। রচনাকাল ১৫১০ খ্রিস্টাব্দ। এর অনেক আগে, গোপালভট্ট নামে বল্লাল সেনের একজন শিক ১৩০০ শকাব্দে ‘বল্লাল-চরিত’ লিখেছিলেন। তবে তিনি নাকি গ্রন্থের শুধু প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড লিখেছিলেন। বল্লাল সেনের ক্রোধের উদ্রেক হতে পারে এমন ভয়ে তিনি তৃতীয় খণ্ড প্রকাশ করেননি। গোপালভট্টের বইতে বল্লাল সেন কর্তৃক বণিকদের উপর অত্যাচার, সুবর্ণবণিকদের সমাজে ‘পতিত’ করা, কৈবর্ত ও আরো কয়েকটি শূদ্র শ্রেণীকে উপরের দিকে জায়গা দেওয়ার কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। সেই কাহিনীগুলিকে খুব সংক্ষেপে বললে এমন দাঁড়ায়--

বল্লাল সেনের রাজ্যে বল্লভানন্দ নামে একজন খুব ধনী ব্যবসায়ী বা বণিক ছিলেন। উদন্তপুরী রাজার বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে বল্লাল সেনের রাজকোষ প্রায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। রাষ্ট্রের ব্যয় নির্বাহের জন্য রাজা বল্লাল সেনকে তখন বাধ্য হয়ে বণিক বল্লভানন্দের কাছ থেকে এক কোটি নিষ্ক (সুবর্ণমুদ্রা) ঋণ করতে হয়েছিল। বার বার যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছিলেন, আর বল্লাল সেনের জেদ বেড়ে চলছিল। ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে তিনি শেষবারের মতো যুদ্ধযাত্রায় বের হতে চাইছিলেন। সেই জন্য বল্লভানন্দের কাছ থেকে রাজা আরো দেড় কোটি সুবর্ণমুদ্রা ধার চাইলেন। বল্লভানন্দ ধার দিতে রাজি, কিন্তু বিনিময়ে তিনি দাবি করলেন ‘হরিকেলি’ প্রদেশের রাজস্ব আদায়ের অধিকার। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে বল্লাল সেন বল্লভানন্দসহ আরো অনেক বণিকের কাছ থেকে জোর করে অনেক মুদ্রা কেড়ে তো নিলেনই, সেই সঙ্গে তাদের ওপর শুরু হলো রাজকীয় নানা অত্যাচার। এর মধ্যে আবার রাজবাড়িতে এক অনুষ্ঠানে বণিকরা সৎশূদ্রদের সঙ্গে এক পঙক্তিতে বসে খেতে অস্বীকার করেন। এই সময়েই বল্লাল সেনের গুপ্তচররা খবর নিয়ে এল যে বল্লভানন্দ পার্শ্ববর্তী মগধের পালরাজার সঙ্গে মিলে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। ঘটনাক্রমে মগধের রাজা আবার বল্লভানন্দের জামাতা। এসব ঘটনা-রটনায় অতিমাত্রায় ক্রুদ্ধ হয়ে বল্লাল সেন সুবর্ণবণিকদের নামিয়ে দিলেন শূদ্রের স্তরে। সেই সঙ্গে ব্রাক্ষ্মণদেরও হুঁশিয়ার করলেন এই বলে যে সুবর্ণবণিকদের পূজা অনুষ্ঠানে পৌরহিত্য করলে, তাদের কাছ থেকে দান-দক্ষিণা গ্রহণ করলে, কিংবা তাদের শিক্ষাদান করলে সেই ব্রাক্ষ্মণকেও ‘পতিত’ করা হবে। বণিকরা তখন প্রতিশোধ নেবার জন্য দ্বিগুণ-ত্রিগুণ বেতন দিয়ে নগরের সমস্ত ভৃত্যদের নিজেরা নিয়োগ করে রাখলেন। অন্যত্র কাজের লোক হিসেবে সৎশূদ্রদের পাওয়া আর সম্ভব হচ্ছিল না। উচ্চবর্ণের লোকেরা বিপদে পড়ে গেলেন। বল্লাল সেন তখন বাধ্য হয়ে কৈবর্ত, মালাকার, কুম্ভকার এবং কর্মকারদের সৎশূদ্রত্বে উন্নীত করে দিলেন। কৈবর্তদের নেতা মহেশকে দিলেন মহামাণ্ডলিক পদ। সুবর্ণবণিকদের পৈতা পরা একেবারে নিষিদ্ধ হলো।

কৈবর্তদের সৎশূদ্রে বা জলচল শূদ্রে উন্নীত হওয়ার এই কাহিনীকে ইতিহাসবিদরা বিশ্বাসযোগ্য বলেই মনে করেন।
তবে এর ফলে কিন্তু কৈবর্তদের আলাদা ট্রাইবাল বা কৌম-পরিচয় মিথ্যা হয়ে যায় না। বরং নীহাররঞ্জন রায় কৈবর্তদের উত্তরবঙ্গের একটি আদিবাসী ট্রাইব বলেই প্রমাণ পেয়েছেন এবং বারবার তাদের কৌম বলেই উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে বাঙালির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কৈবর্তদের উল্লেখ পাওয়া গেছে পাল আমলে। বরেন্দ্র বা বরেন্দ্রী ছিল কৈবর্তদের আবাসস্থল। পালসম্রাট দ্বিতীয় মহীপালকে পরাজিত ও হত্যা করে কৈবর্ত-নেতা দিব্যোক বরেন্দ্রীকে স্বাধীন করেছিলেন। দিব্যোকের মৃত্যুর পর তার ভাই রুদোক, এবং রুদোকের পরে তার ছেলে ভীম একাদিক্রমে সাঁইত্রিশ বছর বরেন্দ্রীকে পালসাম্রাজ্যের হাত থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই সত্য ইতিহাস থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে বরেন্দ্রভূমি তথা উত্তরাঞ্চলে কৈবর্তদের সামাজিক প্রভাব, আধিপত্য, জনবল এবং পরাক্রম ছিল যথেষ্ট। তবে বৈদিক সূত্রগুলিতে কৈবর্তদের বরাবরই আদিম অসভ্য ট্রাইব হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে। বিষ্ণুপুরাণে কৈবর্তদের বলা হয়েছে অব্রক্ষ্মণ্য, অর্থাৎ ব্রাক্ষ্মণ সমাজ ও সংস্কৃতি বহির্ভূত। মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে, নিষাদ পিতা ও আয়োগব মাতা থেকে জাত সন্তান হচ্ছে মার্গব বা দাস।  এদেরই অন্য নাম কৈবর্ত। এদের উপজীবিকা নৌকার মাঝিগিরি। এই দুটি প্রাচীন সাক্ষ্য পরিষ্কারভাবেই বলছে যে, কৈবর্তরা কোনো আর্যপূর্ব কোম বা গোষ্ঠী ছিলেন। বৌদ্ধ জাতকের গল্পেও একই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি। ‘অমরকোষে’ও দাস ও জেলেদের বলা হচ্ছে কৈবর্ত। বাংলার আদি বাসিন্দা, যাদের এককথায় নিষাদজাতি বলা হয়, সেই কোল, ভিল, শবর, পুলিন্দা, কোচ, পোদদের পাশাপাশি কৈবর্তরাও একটি কৌম, যারা নিজেরা ছিলেন এ দেশের ভূমিপুত্র, এবং তারাই পৃথিবীর ইতিহাসে একটিমাত্র রাষ্ট্রশক্তির উদ্বোধন ঘটিয়েছিলেন, যে রাষ্ট্রের অধিনায়কত্ব ছিল কৃষকের হাতে, শ্রমজীবীদের হাতে।

০২.
২০০৩ সালের নভেম্বরে শেষ হলো উপন্যাস ‘হাঁটতে থাকা মানুষের গান’ লেখার কাজ। এবার শুরু হলো আমার হাঁটা। এক হাজার বছর আগের প্রাচীন বরেন্দ্রভূমির মানচিত্র ধরে ধরে আমি হাঁটতে থাকি। মাসের পর মাস। কিছুদিন পর পর বিরতি দিয়ে এটি হয়ে গেল বছরের পর বছর ধরে হাঁটার ঘটনা। মানচিত্র খুঁজতে হয় ১৬৬০ সালে ফন ডেন ব্রোক-এর করা বাংলার ভূমি ও নদ-নদীর নকশায়, ১৭৬৪ থেকে ১৭৭৬ সাল পর্যন্ত একটানা পরিশ্রম করে রেনেল সাহেব যে ম্যাপ এঁকেছিলেন সেটিতে, নীহাররঞ্জন রায়ের প্রাচীন বাংলার জনপদ-বিভাগ নামের নকশায়। হাঁটতে হয় কখনো কাউকে সঙ্গে নিয়ে, কখনো একা একা। হাঁটার কারণ ভেতরের এক অদম্য উত্তেজনা। পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র একটাই উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে যেখানে আদি ভূমিপুত্র কৃষক-জেলেরা একটি রাষ্ট্র স্থাপন করেছিলেন, এবং ৩৭ বৎসর ধরে সেই রাষ্ট্র নিজেরা পরিচালনা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। সময়টি ১০৬৭ থেকে ১১১৪ খ্রিস্টাব্দ। এবং সেই রাষ্ট্র ছিল আমাদের বাংলাদেশে, আমার জন্মএলাকা উত্তরবঙ্গে, আমার নাড়িপোঁতা বরেন্দ্রীতে। আর সেই রাষ্ট্র যাঁরা স্থাপন করেছিলেন, মহান আত্মত্যাগ ও অপরিমেয় বীরত্বের দ্বারা ৩৭ বৎসর ধরে একের পর এক অসম যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে সেই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন, আজকের বাঙালি জাতির তাঁরাই প্রথম প্রজন্ম না হলেও বাঙালিত্বের সূত্রপাতকারী অবশ্যই। আমাদের প্রচলিত ইতিহাসে ধারণা রয়েছে যে পাল-সম্রাটরা বাঙালি ছিলেন। সেই হিসাব করে বলা হয় যে পালযুগ শেষ হওয়ার পর থেকে এক হাজার বছর পর্যন্ত বাঙালির কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। হাজার বছর পরে বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত আমাদের বাংলাদেশ। সন্দেহ নেই যে পালযুগে বাংলা ভাষার চর্চা বাড়ছিল। বিভিন্ন সমন্বয়-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা নিজস্ব একটি অবয়ব অর্জনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এই ধারণা আরো শক্তিশালী হয়েছে চর্যাপদের কারণে। লিখিত বাংলাভাষার আদিতম নিদর্শন চর্যাপদ যে পালযুগেই লিখিত হয়েছে, এ ব্যাপারে এখন আর পণ্ডিতমহলে কোনো সংশয় নেই। কিন্তু পালরাজারা বৌদ্ধ হলেও তাঁরা যে বাঙালি ছিলেন, বা বাঙালি জাতির উন্মেষলগ্নের অংশ ছিলেন, এমন দাবি সত্য নয়। সুকুমার সেন দাবি করেছেন পালযুগেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল এবং বাঙালি জাতি তার বিশিষ্টতা নিয়ে স্পষ্টভাবে দেখা দিয়েছিল। হয়তো একথা সঠিক। কিন্তু তাতে পালদের বাঙালি বলা যেমন যায় না, তেমনই যে সব জাতি-কৌম-রক্তধারা মিলে বাঙালি জাতির উৎপত্তি হয়েছিল, তাদের তালিকা থেকে কৈবর্তদের বাদ দেওয়া যায় না। বরং আধুনিক নৃতত্ত্ব তো শেষোক্তদের পক্ষেই দাঁড়ায়। তবে আমি বাঙালিত্ব নিয়ে নয়, উদ্বেলিত ছিলাম বহিরাগত আর্যদের পরাজয় ও আমাদের ভূমিপুত্রদের রাষ্ট্রস্থাপন নিয়ে। সেই কারণেই এই অবিরাম অনুসন্ধানী পথচলা।

মানচিত্র ধরে ধরে খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল বরেন্দ্রভূমির আরেক নাম খিয়ার অঞ্চল। আরেকটি অপ্রচলিত নাম মধুপুর কাদা। বরেন্দ্র তাহলে এখনকার কোন কোন অঞ্চলকে বলব? দেখা গেল রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি, তানোর, নাচোল; নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর, পোরশা, সাপাহার, পত্নীতলা, ধামুইরহাট, মহাদেবপুর, মান্দা; চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, নাটোরের সিংড়া, বাগাতিপাড়া থেকে শুরু করে দিনাজপুরের সদর, ঘোড়াঘাট, হাকিমপুর, নবাবগঞ্জ, বিরামপুর, ফুলবাড়ি, পার্বতীপুর, চিরির বন্দর, বিরল, কাহারোল; খানসামা, পীরগঞ্জ, বোচাগঞ্জ, রানীসংকৈল, ঠাকুরগাঁও, আটোয়ারি, হরিপুর, বালিয়াডাঙ্গি; রংপুরের গোবিন্দগঞ্জ, মিঠাপুকুর, বদরগঞ্জ, পলাশবাড়ি, তারাগঞ্জ; সৈয়দপুর, নীলফামারী; বগুড়ার গাবতলী, ধুনট, সারিয়াকান্দির সঙ্গে পাবনার তাড়াশ থানার কিছু অঞ্চল, এবং সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ থানার কিছু অঞ্চল নিয়ে আমাদের বরেন্দ্রভূমি। এখনকার হিসাবে সব মিলিয়ে ৩৪,৬৫৪ বর্গ কিলোমিটার। হিউয়েন সাং ৬৪০ খ্রিস্টাব্দের দিকে বঙ্গ অঞ্চল ঘুরে তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে পুণ্ড্র দেশের আয়তন যা দিয়েছেন, বর্তমানের হিসাব তার কাছাকাছি। বরেন্দ্রভূমির মাটি লাল, পুরোটাই প্রায় সমতলভূমি, কিন্তু বাংলাদেশের অন্য সমভূমি অঞ্চল থেকে কিছুটা উঁচু। ভারতের ছোটনাগপুরের মালভূমি এই বরেন্দ্রভূমিরই বর্ধিতাংশ। বাংলাদেশের বর্তমান ম্যাপের দিকে খেয়াল করলে একটি বিশেষ জিনিস দেখা যাচ্ছে। চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল, ময়নামতি-লালমাই অঞ্চল, মধুপুর গড় এবং বরেন্দ্রভূমি একই কৌণিক রেখা দিয়ে সংযুক্ত। বাংলাদেশের অন্য সমভূমি অঞ্চল যে পলিমাটি দিয়ে গঠিত, এই অঞ্চল তা নয়। এটি লাল এঁটেল মাটি দিয়ে তৈরি। বাংলাদেশের অন্য অঞ্চল নদীবাহিত পলিমাটি দিয়ে তৈরি হলেও মরগানের মতে এই লালমাটি অঞ্চলটি অতীতে সংঘটিত ভয়াবহ কোনো ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট। এখন এই বিস্তীর্ণ এলাকা হাঁটতে হবে শুধু এই কারণে নয় যে, এলাকার দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক জায়গাগুলি দেখলে উপন্যাসের ভূগোল-নির্মাণে কাজে লাগবে। এই হাঁটা এই কারণেও যে বরেন্দ্রভূমির যে প্রান্তেই হোক না, যে কোনো লোকের সাথে গল্প-গাছার মাধ্যমে কৈবর্ত-রাজত্ব সম্পর্কে কোনো কিংবদন্তি পাওয়া যায় কি না। মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ না করে উপায় নেই। কারণ লিখিতভাবে আমাদের হাতে যেটুকু উপাদান এসে পৌঁছেছে, তাতে দিব্যোক তথা কৈবর্তদের উল্লেখ প্রায় নেই বললেই চলে; আর যতটুকু লেখা আছে সেটুকুতে বড় নিচু করে আঁকা হয়েছে তাদের চরিত্র ও কৃতিত্ব। নীহাররঞ্জন রায়, সুকুমার সেন, যদুনাথ সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ বাঘা বাঘা ইতিহাসবিদরা কৈবর্ত সম্পর্কে যতটুকু লিখেছেন, তার প্রায় সবটুকুই সন্ধ্যাকর নন্দীর লেখা ‘রামচরিতম’ কাব্য থেকে নেওয়া। আমি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অনুবাদ ও টীকাসহ দুষ্প্রাপ্য ‘রামচরিতম’ হাতে পেলাম রাজশাহীতে ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনে তখন গলদঘর্ম বন্ধু গল্পকার নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে। নিজের থিসিসের কাজ ফেলে রেখে জাহাঙ্গীর ভাই বহু ঘুরে ঘুরে ‘রামচরিতম’-এর একটি ফটোকপি জোগাড় করে দিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন শিক্ষকের কাছ থেকে। যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখা এই গ্রন্থটির ফটোকপি করে নেবার অনুমতি দান করার জন্য আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। সন্ধ্যাকর নন্দীর ওপর এখান-ওখান থেকে আরো কিছু তথ্য সংগ্রহ করে দিলেন অপ্রচলিত ধারার ইতিহাসবিদ সমর পাল। একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর মানুষ সন্ধ্যাকর নন্দী কবি হিসেবে উচ্চাঙ্গের ছিলেন বলেই পণ্ডিতরা মনে করেন। তিনি বাস করতেন পৌণ্ড্রবর্ধনের পার্শ্ববর্তী বৃহদ্বটু গ্রামে। তাঁর পিতার নাম প্রজাপতি নন্দী, পিতামহ পিনাক নন্দী। পিতামহের সময় থেকেই পাল রাজাদের প্রাসাদে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন নন্দীরা। প্রজাপতি নন্দী ছিলেন পালরাজের সান্ধিবিগ্রহিক। আর সন্ধ্যাকর নন্দী নিজে ছিলেন পালরাজা রামপালের সভাকবি। রামপাল ছিলেন তাঁর পোষ্টা বা প্রতিপালক। সেই কবি যখন রামপালের শত্রু কৈবর্তদের প্রসঙ্গ তাঁর কাব্যে আনেন, তখন তা পক্ষপাতদুষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক, এবং সেটাই ঘটেছে দিব্যোক, রুদোক, ভীম ও সাধারণভাবে কৈবর্তদের ক্ষেত্রে। ‘রামচরিতম’ একটি দ্ব্যর্থবোধক কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থে রামায়ণের রঘুপতি রামচন্দ্র ও পালরাজা রামপালের কীর্তি-মাহাত্ম একই সাথে তুলে ধরেছেন সন্ধ্যাকর নন্দী। সেখানে রামপাল মহান, অজেয় ও সর্বগুণে গুণান্বিত একজন নৃপতি। অন্যদিকে কৈবর্তনেতা দিব্যোক হচ্ছেন একজন ‘কুৎসিত নৃপ’। দিব্যোককে গালি দেওয়া হচ্ছে ‘উপধিব্রতিনা’ বলে; যার অর্থ খল ও ছলনাময়। কারণ হিসেবে কবি দাবি করছেন দিব্যোক রাজা মহীপালকে আপসের কথা বলে ছলনা করে হত্যা করেছিল। নন্দীর বচন- ‘মারীচ যেমন রামচন্দ্রকে ভুলিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তেমনই ছলনাময় দিব্যোকের দ্বারা মহীপাল অপহৃত ও নিহত হয়েছিলেন।’ সন্ধ্যাকর নন্দী এতেই ক্ষান্ত নন। তিনি দিব্যোককে দস্যু বলছেন, কৈবর্ত-বিদ্রোহকে বলছেন ‘অলীক ধর্ম-বিপ্লব’, বলছেন ‘ভবস্য আপদম’। কৈবর্তদের সবই যদি এত খারাপ, তবে পালসহ চতুঃসীমায় সকল নৃপতি ও সামন্তদের অবিরল আক্রমণ প্রতিহত করে পর পর তিনজন নেতার নেতৃত্বে কৈবর্ত-কৃষক-জেলে-ভূমিপুত্ররা ৩৭ বছর ধরে নিজেদের বরেন্দ্রভূমির স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখলেন কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর ভদ্রজনের লেখা ইতিহাসগ্রন্থে থাকার কথা নয়, নেই-ও। থাকলে থাকতে পারে লোকশ্রুতিতে, কিংবদন্তিতে, আঞ্চলিক কথা-কাহিনীতে। সেই কারণেই বরেন্দ্রভূমির বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের কাছে কাছে যাওয়া। যেমন বাঙালিদের কাছে, তেমনই আদিবাসীদের কাছেও। টুকরো-টাকরা যেসব তথ্য মিলছে, সেগুলিকে একটার সাথে অপরটি জোড়া দিয়ে দিন-রাত চলছে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা। ইতিহাসের অকথিত অধ্যায় নিয়ে কাজ করার অসুবিধা, সে-ও আবার উপন্যাস, হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। কলম চলছে যতটা, থেমে থাকছে তার চেয়ে বেশি। মাঝে মাঝে হতাশা গ্রাস করছে। মনে হচ্ছে কৈবর্ত-বিদ্রোহ নিয়ে উপন্যাস লেখার স্বপ্ন আমার স্বপ্নই থেকে যাবে। শ্রদ্ধেয় সত্যেন সেন ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’ নামে বাংলা ১৩৭৬ সালে যে উপন্যাসটি প্রকাশ করেছিলেন, সেটি, তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, উপন্যাস হিসেবে গ্রন্থটি যেমন দুর্বল, তেমনই তাতে প্রতিফলিত হয়েছে উচ্চবর্গীয় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিগুলিই। এই উপন্যাসে তিনি কৈবর্তদের স্বাধীনতা অর্জনের গৌরবকে পাশ কাটিয়ে মহীপালের রাজ্য হারানোকে বলেছেন নিছক প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রের ফলাফল। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আমাদের হাজার বছর আগে পূর্বপুরুষরা আমাদের জন্য যে গৌরবের সমাচার রেখে গেছেন, তাকে সঠিকভাবে ও শৈল্পিক একটি উপন্যাসের মাধ্যমে আমাদের জাতির সামনে উপস্থিত করার প্রচেষ্টা বোধহয় সফল হবে না। তার জন্য অন্য প্রতিকূলতার চাইতে আমার নিজের শক্তির অভাবই বেশি বলে মনে হচ্ছিল আমার। মনে হচ্ছিল আমি আমার নিজের শক্তির তুলনায় বড় বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি সাহিত্যিক প্রকল্পে হাত দিয়েছি, এমন একটি উপন্যাস লেখার কাজ হাতে নিয়েছি যে উপন্যাস কোনোদিনই আমার সীমিত মেধার পক্ষে লিখে ওঠা সম্ভব হবে না। তাই মাঝে মাঝে অন্য লেখাতে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করি। কিন্তু কী এক অমোঘ টানে বার বার ফিরে আসতে হয় বরেন্দ্রীর কাছে, কৈবর্তদের কাছে। যাদের সঙ্গে এই লেখা নিয়ে আলাপ করেছি, যেমন সমর পাল, উৎপল বিশ্বাস, হাসান আজিজুল হক, প্রশান্ত মৃধা, প্রতিনিয়ত উৎসাহ জোগান, দেখা হলেই জিজ্ঞেস করেন উপন্যাসের কাজ কতদূর এগুল। আমি আমতা আমতা করি। সমর পাল নিজে থেকেই আরো তথ্য সংগ্রহ করে দেন। উৎপল বিশ্বাস পশ্চিমবঙ্গে দলিত লেখক আন্দোলনের প্রাণপুরুষ কপিলকৃষ্ণ ঠাকুরের কাছ থেকে যতদূর সম্ভব তথ্য-সাহায্য এনে দিতে চেষ্টা করেন। সেলিনা হোসেন চর্যাপদের সময়কাল নিয়ে একটি উপন্যাস লিখেছেন। ‌‌‌‌‌‌নীল ময়ুরের যৌবন। দ্বারস্থ হই তাঁর। তিনি তথ্য তো দেনই, সেই সাথে পরম স্নেহে হাতে ধরিয়ে দেন তাঁর উপন্যাসের একটি কপিও। ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা থেকে পিতৃপ্রতিম যতীন সরকারের ফোন আসে-- কী হে তালুকদার, তোমার উপন্যাস কদ্দুর? কবি মাহবুব-উল-করিম লেখায় কোনো তাড়াহুড়ায় বিশ্বাস করেন না। তবে তিনি জানতে চান কাজের অগ্রগতি আশানুরূপ কি না? শ্রদ্ধেয় সৈয়দ আকরম হোসেন বরাভয় দেন- উপন্যাসের বিস্তার নিয়ে চিন্তা করো না। তোমার লেখা তুমি লিখে যাও। উপন্যাস যত বড়ই হোক, প্রকাশক খুঁজে দেবার দায়িত্ব আমার। পশ্চিমবঙ্গ থেকে শ্রদ্ধেয় কথাসাহিত্যিক সাধন চট্টোপাধ্যায়, এক সময়ের বাম রাজনীতি-কর্মী হুমায়ুন বার বার জিজ্ঞেস করেন উপন্যাসের কাজ কবে শেষ হবে? মামুন হুসাইন খুব মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করেন কাজের অগ্রগতি কেমন? সুচন্দন প্রতিনিয়ত তাগাদা পাঠায় কোলকাতা থেকে। বন্ধু প্রবালকুমার দাস এবং মকলেসুর রহমান অরুণের নীরব তাড়া উপন্যাসের ব্যাপারে। রফিকুল কাদির রোজই জানতে চান উপন্যাস কতদূর এগিয়েছে। তখন আর কাজটি আমার একার নেই। ফলে এই কাজ থেকে একা একা পিছিয়ে আসার অধিকারও আমার থাকে না। তখন আবার শুরু হয় লাইব্রেরিগুলিতে ধূলি সরিয়ে সরিয়ে পুরনো বই-পুঁথি ঘাঁটতে থাকা। যেখানে যা পাওয়া যায়, বাংলা ও ইংরেজিতে, সেগুলি কখনো কিনে নেওয়া, কখনো ধার নেওয়া, কখনো ফটোকপি করে নেওয়া। আবার শুরু হয় আমার বরেন্দ্রীর পথে-প্রান্তরে হাঁটা।

০৩.
আর্যরা ভারতবর্ষে এলেও বাংলা অঞ্চলকে করায়ত্ত করতে পারেনি সহজে। কয়েক শত বৎসর ধরে বারংবার আগ্রাসন চালিয়েও বাংলাকে দখলে নিতে পারেনি তারা। তখন ভারতবর্ষের যে অংশে তাদের দখল পোক্ত হয়েছিল, সেই অংশকে আর্যাবর্ত নাম দিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চায় মগ্ন হয়ে থাকতে বাধ্য হলো তারা। আর সেই সঙ্গে এই প্রচারণাও চালিয়ে গেল যে ভারতবর্ষের যে যে অঞ্চল এখনো আর্যদের দখলে আসেনি, সেগুলি পাপভূমি। আর্যাবর্তের যে চৌহদ্দির কথা লিখে গেছেন পতঞ্জলি, সেখানে বঙ্গ বা বাংলার কোনো অংশের নাম নেই। তাঁর ভাষ্যমতে- ‘প্রাগ্ আদর্শাৎ প্রত্যক্ কালকবনাদ্ দেক্ষিণন হিমবন্তম্ উত্তরেণ পরিযাত্রম।’ অর্থাৎ আদর্শের পূর্ব, কালকবনের পশ্চিম, হিমালয়ের দক্ষিণ, ও পরিযাত্রের উত্তর-- এই চতুঃসীমার মধ্যবর্তী ভূমি আর্যাবর্ত। এর মধ্যে হিমালয় তো সবারই চেনা। পারিযাত্র হচ্ছে পশ্চিমের বিন্ধ্যপর্বত, আদর্শ হচ্ছে আরাবল্লী পর্বত, এবং কজঙ্গল ছিল তৎকালনীন কালকবন। বোঝাই যাচ্ছে এই সীমা ভারতের কোন কোন অঞ্চলকে নিয়ে। এখানে বঙ্গ বা বাংলার অন্য কোনো অংশের নাম নেই। অর্থাৎ বঙ্গভূমির ভূমিপুত্ররা আর্যদের আগ্রাসন প্রতিহত করে তখন পর্যন্ত নিজেদের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে সমর্থ হয়েছিল। আর আর্যরা, তাদের দখলকৃত উত্তর ভারতকেন্দ্রিক এই আর্যাবর্তের বাইরের জনপদ ও মানুষগুলিকে অসুর, যবন, বয়াংসি, অনাস জাতীয় নীচ সম্বোধনে ভূষিত করে নিজেদের মনের ক্ষোভ মেটাতে চেষ্টা করত। বর্তমানের বাংলাদেশ তাদের হস্তগত হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা এই ভূখণ্ডকে পাপভূমি বলে আখ্যায়িত করে গেছে। আর্যদের কেউ কোনো কারণে বাংলা-অঞ্চলে পদার্পণ করলে  আর্যাবর্তে ফিরে তাকে প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ ‘পুনষ্টোম যজ্ঞ’ করতে হতো। সেই বাংলাদেশ তারা দখল করতে সমর্থ হলো কয়েক শত বৎসর পরে। তাদের দখলের উদ্দেশ্য নাকি ছিল এই অসুরদেশে বেদের বাণী প্রচার করা! অষ্টাদশ শতকে ইংরেজদের ভারত, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা দখলের পেছনের দার্শনিক যুক্তি ছিল অসভ্যদের কাছে সভ্যতা ও খ্রিস্টের বাণী বহন করে নিয়ে যাওয়া। বর্তমান শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান, ইরাক দখলের পেছনের দার্শনিক যুক্তি হচ্ছে সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। কয়েক হাজার বছর আগেকার লুটেরা সাম্রাজ্যবাদী আর্যদের সাথে অষ্টাদশ শতকের ইউরোপীয় আর বিংশ-একবিংশ শতকের মার্কিনিদের মধ্যে কী অসাধারণ মিল! আর বাংলা দখলের সঙ্গে সঙ্গে করতোয়া হয়ে গেল পুণ্যনদী, পুণ্ড্রবর্ধন হয়ে গেল পুণ্যস্থান। যে বরেন্দ্রীর পূর্ব নাম ছিল কট্টলি, তাকে আর্যরা নাম দিল বরেন্দ্র। ইন্দ্রের বরে প্রাপ্ত বলে তার নাম বরেন্দ্র। আর্যদের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ইন্দ্র দেবতা তাদের দিয়েছেন এই লালমাটির সমতল মালভূমি। আর এই ভূমির আদি মানুষ, সত্যিকারের ভূমিপুত্র, যারা এই মাটিকে বাসযোগ্য করেছেন, চাষযোগ্য করেছেন, এখানে নিজেদের মতো করে সভ্যতা নির্মাণ করেছেন, আদিম কৌম সাম্যবাদী ভাবধারায় জীবনযাপন করেছেন, জাতিগোত্রবর্ণভেদহীন সমাজ নির্মাণ করেছেন, নিজেদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নির্মাণ করেছেন, তারা হয়ে গেলেন নিজভূমে পরবাসী। নিজেদের ভিটে-মাটি-ভুঁই-মাচার ওপর অধিকার তো তারা হারালেনই, সেই সাথে হারালেন নিজেদের দেহ ও আত্মার ওপর নিজেদের অধিকারও।

কিন্তু পরাজয় মেনে নেওয়া তো ভূমিপুত্রের রক্তে নিষিদ্ধ। সম্মুখযুদ্ধ কিছুদিনের জন্য পরিত্যক্ত হলেও গেরিলা যুদ্ধ কখনোই বন্ধ থাকে না। রাতের আঁধারে আক্রান্ত হতে থাকে তথাকথিত দখলদার আর্যদের শক্তিকেন্দ্রগুলি। ব্রাক্ষণদের ছেলেঘুমানো রূপকথার গল্পগুলিতে যে রাক্ষসের ভয় দেখানো হয় শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জন্য, সেই রাক্ষসরা সর্বদা রাতের অন্ধকারেই আসে। আর তাদের মুলোর মতো দাঁত, কুলোর মতো কান, মাথায় কখনো একটি কখনো দুটি খাড়া চোখা শিং। এই রাত্রিচর রাক্ষসদের জায়গায় মুখোশধারী গেরিলা যোদ্ধাদের স্থাপন করলে হুবহু মিলে যায়। রূপকথা আর শুধু রূপকথা থাকে না, তা হয়ে যায় ইতিহাসের লুপ্ত দরজায় প্রবেশের একটি চাবিকাঠি।



০৪.
চীনের প্রাচীরের মতো ঐতিহাসিক না হলেও কিংবা জগদ্বিখ্যাত না হলেও বাংলাদেশে প্রায় চল্লিশ মাইল লম্বা একটি মাটির প্রাচীর রয়েছে। তার বয়সও হাজার বছরের কম নয়। বগুড়ার শেরপুর থেকে শুরু হয়ে এই প্রাচীর শেষ হয়েছে বর্তমান গাইবান্ধা জেলার একবারে শেষ সীমায় পৌঁছে। দুই পাড়ের যে কোনো মানুষকে জিজ্ঞস করলে তারা উত্তর দেয় এর নাম ভীমের জাঙ্গাল। রাজা ভীম এই পাঁচিল তুলেছিল। কেন? এ নিয়ে কোনো কিংবদন্তি আছে কি না জানার জন্য জাঙ্গাল ধরে পুরো চল্লিশ মাইল হাঁটতে হয় তিন দিনে। রাতে বিশ্রাম মাটিডালিতে আর আরেক রাতে রাজাবিরাট গ্রামে। অনেক অভিজ্ঞতার মধ্যে রাজাবিরাটে বাঁশের তৈরি সিনেমা হলে নাইট শোতে সিনেমা দেখাও একটি দুর্লভ অভিজ্ঞতা। বগুড়া শহরের উত্তর দিক দিয়ে এগিয়ে যাওয়া জাঙ্গালের শুরুর বিন্দু ধরি ফুলবাড়ীকে। তারপর একের পর এক গ্রাম। কোনো কোনোটি বাঁধের ওপর ছিন্নমূল মানুষের অস্থায়ী বসতি। সেটাই একসময়ে স্থায়ী হয়ে একটা গ্রামের নাম নিয়ে নেবে নিশ্চিত। ফুলবাড়ির পরে বৃন্দাবন পাড়া, মাটিডালি, বাঘোপাড়া, গড়ের পশ্চিম সীমা হয়ে ঘাগর দুয়ার, চাঁদমুয়া, হরিপুর, ধালমণ, শচীয়ানী, শ্যামপুর, শব্দল দীঘি, বসুবিহার, বগলাবাড়ী। নাগর নদী পার হয়ে আলের হাট, ফেনীগ্রাম, শালদহ। গোবিন্দগঞ্জ থানার দামুকদহ বিলের মধ্য দিয়ে রাজাবিরাট এবং ঘোড়াঘাট। মাঝখানে মহাস্থানের কাছে দৌলতপুর থেকে হাজরা দিঘি পর্যন্ত তিন মাইল এলাকায় বাঁধ নেই। এখন ভেঙে গেছে, নাকি তখনই তৈরি করার প্রয়োজন বোধ করেননি সে সময়ের মানুষরা, এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে! কল্পনা করতে কোনো বাধা তো নেই। কিন্তু পাড়ের কোনো মানুষকে জিজ্ঞেস করলে তিনি কল্পনা নয়, নিশ্চিত সত্য বলেই দাবি করে কথা বলেন। ইয়াকুব আলি জানালেন এখানে তো রাজধানী। এখনকার মহাস্থান মানে সেই সময়ের পুণ্ড্রনগর। সেই রাজধানীতে তো সৈন্য-সামন্ত মজুদই আছে। রাজধানীর মানুষের তাই প্রাচীরের প্রতিরক্ষার প্রয়োজন পড়েনি। তাই এই তিন মাইল পাঁচিল ওঠেনি। তাহলে এই ভীমের জাঙ্গাল কি প্রতিরক্ষার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল? উইলিয়াম হান্টার এই প্রাচীর দেখে এটিকে তুলনা করেছিলেন ইতালির রিং ফোর্টগুলির সাথে। এই ধরনের রিং ফোর্টে বা দুর্গে পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষরা বিপদের সময় আশ্রয় নিতে পারত। কোন সমরবিদের পরামর্শে কৈবর্তরাজ ভীম এই জাঙ্গাল নির্মাণ করেছিলেন, তার নাম হয়তো কোনোদিনই ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করার প্রবণতা ভূমিপুত্রদের ছিল না। সবসময়ই তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৌমের জন্য কাজ করা। তাই দেখা গেছে কোনো ভাস্কর্যস্রষ্টার  নাম নেই, কোনো চিত্রকরের নাম নেই, অনেক সুভাষিত বচন-রচয়িতার নাম নেই। কৌমের জন্য নিবেদিত যে কর্মকাণ্ড তাতে ব্যক্তির নাম স্বাক্ষরিত করে রাখাকে শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, কখনো কখনো অমার্জনীয় ধৃষ্টতা বলেও গণ্য করতেন কেউ কেউ। সেই কারণেই বাঙালির ইতিহাস কোনো রাজা-মহারাজা কিংবা কোনো আলোকসামান্য প্রতিভাবানের ইতিহাস না হয়ে হয়ে উঠেছে পুরো জাতির ইতিহাস। কোনো ব্যক্তি এককভাবে সেখানে নিজের চিহ্ন রেখে যেতে চাইতেন না, বরং তাঁরা মনে করতেন যে সৃষ্টি তাঁরা রেখে যাচ্ছেন তা যেন নিজের বা পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত না হয়ে সর্বজনীন কৌমের সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়। এই চিন্তার ধারা এই তো কিছুদিন আগে পর্যন্ত বহমান ছিল আমাদের সমাজে। নিজের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলিকে কোনো পেটেন্ট করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন বিজ্ঞানপ্রতিভা জগদীশচন্দ্র বসু। তাঁর পরিষ্কার বক্তব্য ছিল, বিজ্ঞানের যে আবিষ্কার তিনি করেছেন, তাকে কুক্ষিগত করে রাখার কোনো নৈতিক অধিকার তাঁর নিজের যেমন নেই, কোনো গোষ্ঠীরও তেমনই নেই। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সারা পৃথিবীর সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে তাঁর আবিষ্কারগুলি। সমসাময়িক বেনিয়া মানসিকতার মার্কিন বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের সাথে তুলনা করলেই বাঙালিমানস ও বেনিয়ামানসের পার্থক্য ধরা পড়ে। সেই কারণেই কেউ জানে না, পুণ্ড্রবর্ধন নগরীর নকশাবিদ কে, জানে না ঐতিহাসিক জগদ্দল বিহার বা বসুবিহার কোন স্থপতির তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছিল। সেই রকম ভাবেই কেউ জানে না, ভীমের জাঙ্গাল নামক প্রতিরক্ষা-সম্ভাবনা প্রথম কোন সেনাপতি বা চিন্তাবিদের মনন থেকে উদ্ভূত হয়েছিল।

লেখাপড়া যারা জানতেন সেই ক্ষমতাবান আর্যরা, বৌদ্ধ পালসম্রাট ও ব্রাক্ষ্মণ অমাত্যবৃন্দ নিজেদের নাম যেখানে পেরেছেন খোদাই করে রেখে গেছেন। যেন সমাজ মানে তারাই। এখনকার রাষ্ট্রনৈতিক নেতারা যেমন রাষ্ট্রের গরিব মানুষের করের টাকায় কিংবা দেশের মানুষের রক্তকে বন্ধক রেখে বিশ্বব্যাংক থেকে ধার করে আনা টাকায় প্রতিষ্ঠান বানিয়ে পাথরের ফলকে নিজের নাম গেঁথে রাখেন, সেই রকম মানসিক ভিখিরিপনা তৎকালীন আর্য রাজা-অমাত্যদেরও পুরোমাত্রায় ছিল। তার উদাহরণ রয়েছে এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। তার মধ্য থেকে দুই-একটা দেখে নিতে তো হয়ই।

তখন আমাকে যেতে হয় ধামইরহাটে। ধামইরহাট ভৌগোলিকভাবে নওগাঁ জেলার মধ্যে পড়লেও আমার বাড়ি থেকে সেখানে যেতে গেলে কাছে হয় জয়পুরহাটের রাস্তা ধরলে। আমার শহর থেকে জয়পুরহাট ট্রেনে। ট্রেনভেদে সময় বাড়ে-কমে। কোনো ট্রেনে গেলে দুই ঘণ্টা, কোনো কোনো ট্রেনে সাড়ে তিন ঘণ্টা, কোনোটিতে আবার সময়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইন্টারসিটি বেছে নিয়ে শেষ পর্যন্ত দুই ঘণ্টাতেই পৌঁছানোর সাব্যস্ত। জয়পুরহাট থেকে নয় কিলোমিটার পশ্চিমে ধামইরহাট উপজেলার মঙ্গলবাড়ি হাট। হাটের দক্ষিণে জাহানপুর মৌজা। এখানে আছে নারায়ণ পালের মন্ত্রী গুরব মিশ্রের তৈরি একটি গরুড়স্তম্ভ। সম্রাটের নয়, মন্ত্রী বা অমাত্যের তৈরি। বোঝা যায় স্তম্ভটি তৈরি করা হয়েছিল কোনো বড় জলাশয়ের পাড়ে। হয়তো এর পাশ দিয়ে সেই সময় জলপথ ছিল। নদী এখন হাজার বছর পরে তার পথ বাঁকিয়ে নিয়েছে। তাই এখন এটি এক নিচু জলাভূমির মতো জায়গায়। লম্বায় প্রায় ১২ ফুট ধূসর পাথরের স্তম্ভ। এতে যা লেখা আছে শুনলাম, তাতে বোঝা গেল ওপরঅলাকে তৈলমর্দন শুধু এখনকার রাজ-কর্মচারীদের নয়, সেকালের রাজকর্মচারীদেরও অবশ্য-পালনীয় কর্ম ছিল। গুরব মিশ্র তার প্রভু মহারাজ নারায়ণ পালের প্রশস্তি উৎকীর্ণ করে রেখেছেন এটিতে, অথচ বানিয়েছেন গরুড়স্তম্ভ। তো গুরব মিশ্র না হয় তার প্রভুকে সন্তুষ্ট করার জন্য, এবং একই সাথে নিজের নামটিও খোদাই করে রাখার জন্য বারো ফুটি পাথরস্তম্ভ বানালেন, কিন্তু সেই শিলালিপির গায়ে যখন ইংরেজিতে জর্জ উডনি এবং ক্রেটনের নাম দেখা যায়, যা পরবর্তীকালে লেখানো, তখন ইংরেজ আমলাদের আদেখলেপনারও চিহ্ন বেশরমভাবে প্রকট হয়ে থাকে। পণ্ডিতরা বলেন গরুড়স্তম্ভ, কিন্তু স্থানীয় মানুষরা বলে এর নাম ভীমের পান্টি। আঞ্চলিক ভাষায় পান্টি হচ্ছে এক ধরনের লাঠি। যেমন গরু খেদানোর জন্য হাইল্যা পান্টি। তবে প্রকৃতপক্ষে কৈবর্তরাজ ভীমের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। ভীমের পান্টি মানে মহাভারতের বীর ভীমের হাতের গদার কথা বোধহয় বোঝানো হয়ে থাকে। বর্তমানে সমর পাল এই স্তম্ভের গায়ে লেখা ২৮ টি শ্লোকের পাঠোদ্ধার করেছেন। তা থেকে জানা যাচ্ছে, পালসম্রাটের প্রশস্তির নামে মন্ত্রী গুরব মিশ্র মূলত নিজের বাপ-দাদার মহান সব কীর্তির কথা বর্ণনা করে গেছেন এই স্তম্ভে। এই শ্লোকগুলি পড়লে মনে হবে, পালসম্রাটরা শুধু সিংহাসনেই বসে থাকতেন, আর তাদের হয়ে যাবতীয় কাজ, বিয়ের জন্য পাত্রী  খুঁজে বের করা থেকে রাজ্যজয় পর্যন্ত সবই করে দিতেন গুরব মিশ্র ও তার পিতা-পিতামহরা। এমনকি সে কাজে রাজাকে পর্যন্ত সাক্ষী মানা হয়েছে একটি শ্লোকে। কুড়ি নং শ্লোকে বলা হচ্ছে-- ‘তার (গুরব মিশ্রের) বাগ্মিতার কথা, শাস্ত্রসমূহে জ্ঞানের কথা, নীতিশাস্ত্রে পরম নিষ্ঠার কথা, বেদার্থ মীমাংসায় তার বংশের অসীম সামর্থের কথা, মহতের গুণকীর্তনে অনুরাগের কথা এবং জ্যোতিষশাস্ত্রে তার অপরিমেয় খ্যাতির কথা ধর্মাবতার (পালসম্রাট) বলে গেছেন।’
তাহলে কৈবর্তরা কি নিজেদের বিজয়ের বা স্বাধীনতা অর্জনের বা দীর্ঘ সংগ্রামের কোনো চিহ্নই রেখে যাননি। খোঁজ নিয়ে জানা গেল সে-ও একটা আছে। আছে একটি দিব্যোক স্তম্ভ। সেটি এখান থেকে আরো প্রায় দুইশো কিলোমিটার দূরে। এখানে আরেকটি যা আছে, তার কথা আগে বলে নেওয়াই ভালো। তা হলো জগদ্দল বিহার। বিহার নাম হলেও আসলে মহাবিহারই। জয়পুরহাট শহর থেকে ধরলে দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। গ্রামের নাম এখনও জগদল। এখান থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, যা তখন ছিল সোমপুর বিহার। সবগুলিই খাস বরেন্দ্রভূমিতে। জগদ্দল বিহারের বয়স নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেন যে, রামপাল ভীমকে পরাজিত ও হত্যা করার পরে এই বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু আসলে এই বিহার তার চাইতে বেশ আগের। রামপাল হয়তো এর কিছুটা শোভাবৃদ্ধি করেছিলেন। বৌদ্ধবিহার বা মহাবিহার আমাদের ইতিহাসের অন্যতম গর্বের উপাদান। এক-একটি বিহার আমাদের প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রমাণ ধারণ করে রয়েছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তথ্য পেয়েছিলেন, এই জগদ্দল বিহার থেকেই প্রায় দশ হাজার বই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে প্রেরিত হয়েছিল। ওদন্তপুরী এবং বিক্রমশীল বিহার ধ্বংস হবার পরেও অনেক বছর যাবত জগদ্দল বিহারের অস্তিত্ব ছিল। এই বিহারের বিভিন্ন কক্ষে বসেই বিভূতিচন্দ্র, দানশীল, মোক্ষাকর, ধর্মাকর প্রভৃতি হীনযান ও মহাযানপন্থি বৌদ্ধ পণ্ডিত অসংখ্য সংস্কৃত গ্রন্থ তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। সারা পৃথিবী থেকে বৌদ্ধধর্মতত্ত্ব ও সাধনতত্ত্বের পাঠ নিতে শিক্ষার্থীরা এখানে আসতেন। কাশ্মীরের ভিক্ষু শাক্য শ্রীভদ্র এখানে এসেছিলেন ১২০২ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর জবানিতে জানা যাচ্ছে, তিনি তিন বৎসর এখানে অধ্যয়ন করেছিলেন। সেই সময় প্রচুর ছাত্র ও শিক্ষক এই মহাবিহারচত্বরকে মুখর করে রেখেছিলেন। এখানে তন্ত্র, জ্যোতিষ, ন্যায়শাস্ত্রসহ হিন্দু, জৈন ও লোকায়ত বিশ্বাস সম্পর্কে ব্যাপক পড়াশোনা, আলোচনা ও গবেষণার কাজ অব্যাহত ছিল। মনে রাখা দরকার সেই সময় বাংলাদেশে জ্ঞানচর্চায় বৌদ্ধ মতের পণ্ডিতরাই অগ্রণী ছিলেন। ব্রাক্ষ্মণ পণ্ডিতদের মতো তাঁরা ঘরে বসে বা কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তির আশ্রয়ে বসে বিদ্যাচর্চা করতেন না। তাঁরা থাকতেন বিহারে একত্রে। সংঘারাম-বিহারে একত্র থাকার একটি প্রাতিষ্ঠানিক আবহ থাকে। সেখানে পরস্পরের সাথে প্রতিনিয়ত জ্ঞানের ও অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান হয়। ফলে প্রত্যেকের জ্ঞানভাণ্ডারই বেড়ে যেতে থাকে অনেকটা জ্যামিতিক হারে। বৌদ্ধ পণ্ডিতরা এই সুবিধাটি পেয়েছিলেন। তাঁরা সংঘারাম-বিহারে বসে একত্রে বিদ্যাবর্ধন ও বিদ্যাবিতরণ করতেন। আগেই বলা হয়েছে যে তাঁরা শুধু বৌদ্ধধর্মমত ও দর্শন নিয়েই আলোচনা করতেন না, বরং তাঁদের চর্চার মধ্যে ছিল ব্রাক্ষ্মণদের বিদ্যাও। সেই সঙ্গে সমকালীন সকল প্রসঙ্গও।

এই বিহারের আরেক আচার্য ছিলেন শুভাকরগুপ্ত। তিনি বৌদ্ধধর্মের বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি বিরাট ধর্মীয় সংস্কারের জন্য বিখ্যাত। তা হচ্ছে, তিনিই প্রথম বৌদ্ধের শরণ নেওয়া বা বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হওয়ার সহজ পথ ও প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন। বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেওয়া বা সংঘে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা ছিল অনেক। অনেক সময়ই সেগুলি সাধারণ মানুষের জন্য পালন করা ছিল কষ্টকর। শুভাকরই প্রথম এইসব আনুষ্ঠানিকতার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করলেন মানুষের দীক্ষাগ্রহণের পথকে। তিনি বিধান দিলেন কোনো বৌদ্ধ পুরোহিতের সামনে কেউ ত্রিশরণ গমন করলেই সে বৌদ্ধধর্মে অন্তর্ভুক্ত হবে। ত্রিশরণ মানে শুধু তিনবার ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধম্মং শরণং গচ্ছামি, সংঘং শরণং গচ্ছামি’ বলা। এই নিয়ে বিতর্ক অবশ্য দীর্ঘকাল অব্যাহত ছিল। এত সহজে কাউকে সংঘের অন্তর্ভুক্ত করে নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন অনেক বৌদ্ধধর্মনেতা। বিশেষ করে হীনযানপন্থিরা।

এগুলি সবই আমাদের গৌরবের কথা। আমাদের ঐতিহ্যের ঐশ্বর্যময়তার চিহ্ন। কিন্তু দেশের যে কোনো প্রান্তের যে কোনো বড় কাজে যেমন সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে, এইসব বিহার, মহাবিহার, সংঘারাম, ধর্মমন্দির, মঠ, দেবকুল-- সবকিছুর জন্য মূল্য চুকাতে হয়েছিল সাধারণ মানুষদের। বরেন্দ্রভূমির প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য নিজেদের মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে কৈবর্তদেরই। অথচ ঐসব মন্দির-বিহার কোনোটির সাথেই তাদের কোনো সংস্রব ছিল না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেমন করে এইসব মহান প্রতিষ্ঠানগুলি হয়ে উঠেছিল কৈবর্তদের গলার ফাঁস?
কারণ ঐসব বিহার-মঠ-মন্দিরের সকল ব্যয়ভার পরোভাবে পড়ত কৈবর্তদের কাঁধেই।

জগদ্দল বিহারের কথাই ধরা যাক। সুকুমার সেন এই বিহারের বিভিন্ন শিক্ষক-ছাত্র-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ ও ভাতার একটি তালিকা তুলে দিয়েছিলেন তাঁর ‘বঙ্গ ভূমিকা’ গ্রন্থে। সেই সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে বিহারের সাংবৎসরিক ব্যয়ের একটি হিসাবও। সেখানে দেখা যাচ্ছে মঠে বা বিহারে অধ্যাপক ছাড়াও নির্দিষ্ট সংখ্যক ছাত্র থাকতেন। আর থাকতেন একজন গণক, একজন কায়স্থ (হিসাবরক), চারজন মালাকার, দুইজন তৈলিক, দুইজন কুম্ভকার, পাঁচজন কাহলিক (কাহল বা ঢোলবাদক), দুইজন শঙ্খবাদক, দুইজন ঢক্কাবাদক, চারজন দ্রাগড়িক (দ্রগড়- সময়জ্ঞাপক ঘণ্টা), কর্মকর ও চর্মকার মিলে বাইশজন, একজন নট, দুইজন সূত্রধর, দুইজন স্থপতি, দুইজন কর্মকার, আটজন বেট্টিক (মজুর বা বেগারদার), সেই সঙ্গে আরো কিছু কর্মচারী।

বিহারের অধ্যাপকরা প্রত্যেকে বৃত্তি হিসেবে পেতেন দশ দ্রোণ দশ পাটক জমির আয়। তখনকার জমি মাপের একক ছিল দ্রোণ বা দ্রোণবাপ, কুল্যবাপ, পাটক, নল ইত্যাদি। ১ কুল্যবাপ= ৮ দ্রোনবাপ; ৪০ দ্রোণবাপ= ১ পাটক। প্রত্যেক ছাত্রকে দেওয়া হতো ১ পাটক করে জমির আয়। এই অর্থ তারা ব্যয় করতেন ‘উদরভরণ’ অর্থাৎ খাদ্যের জন্য বা ‘পালিফুট্টাকার্থং’ (পালি অর্থ গুরুগৃহে বাসকালে ছাত্রের ভাতা ও ফুট্টা অর্থ ফোটানো বা রন্ধন) এর জন্য। অতিথিদের জন্য বরাদ্দ ছিল পাঁচ পাটক ভূমির আয়। ভাণ্ডারি ব্রাক্ষ্মণের জন্য এক পাটক, গণকের জন্য এক পাটক, কায়স্থের জন্য আড়াই পাটক, মালাকার তৈলিক কুম্ভকার কাহলিক শঙ্খবাদক ঢক্কাবাদক দ্রাগড়িক কর্মকর চর্মকার প্রত্যেকের জন্য অর্ধ পাটক, সূত্রধর স্থপতি কর্মকার প্রত্যেকের জন্য দুই পাটক, প্রত্যেক বেট্টিকের জন্য পৌণে এক পাটক ভূমির আয় বরাদ্দ ছিল। এছাড়া বিহারের বার্ষিক ‘নবকর্ম’ অর্থাৎ নতুন নির্মাণ কাজের জন্য বরাদ্দ ছিল সাতচল্লিশ পাটক জমির আয়, এবং চালার ভাঙা ফুটো সারানোর জন্য বরাদ্দ ছিল দশ পাটক ভূমির আয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে এই বিপুল পরিমাণ চাষের জমির আয় যদি কৃষকদের হাতে না পৌঁছে চলে যায় বিহারের হাতে, তার জন্য কৈবর্ত চাষীদের দৈনন্দিন জীবনে কত মূল্যই না দিতে হয়েছে। সচরাচর এভাবে অধ্যাপক-ছাত্র-কর্মচারীদের মধ্যে জমির আয় ভাগ করে দিতেন বিহারের পরিচালকমণ্ডলী। রাজা বা সম্রাটের পক্ষে এত খুঁটিনাটি জিনিস দেখা তো সম্ভব নয়। তারা থোক আকারে বিহারের নামে পাঁচটি বা দশটি গ্রাম দান করে দিতেন। মূল অসুবিধা ছিল এখানেই। কারণ কৃষক যখন রাজার অধীনে, তখন তাকে বার্ষিক খাজনা হিসেবে ফসলের ছয় ভাগের এক ভাগ রাজকোষে জমা দিলেই চলত। বাকি সবকিছু, যেমন, নদী-বন-প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার ছিল করমুক্ত, সাধারণের সম্পত্তি। কিন্তু গ্রামগুলি বিহারের আচার্য বা পুরোহিতের হাতে সমর্পণ করার সাথে সাথে সেইসব গ্রামের প্রজারাও হয়ে যেত দ্বৈত শাসনের অধীন। রাজার কর ছাড়াও তখন নানা উপলক্ষে তাদের ওপর বসানো হতো বিভিন্ন ধরনের কর। যেসব জিনিস ব্যবহারের জন্য কোনোদিন কর প্রদানের কথা ভাবেইনি গ্রামের মানুষ, সেসবের জন্যও বসে যেত কর। যেমন জঙ্গলে শিকারে ঢুকলে বন-কর, নদীতে মাছ ধরতে নামলে জল-কর ইত্যাদি। তাছাড়া বিভিন্ন উৎসব-আয়োজনে নানা নামে নানরকম করের বোঝা চাপানো হতো কৈবর্তদের কাঁধে। যেখানে বৌদ্ধ পুরোহিত সমাজে আরো বেশি হস্তক্ষেপ করতে ইচ্ছুক থাকতেন, সেখানে ‘জীবহত্যা মহাপাপ’ বলে কৈবর্তদের মাছধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত জারি করা হতো। এসব থেকেই বোঝা যায়, কৈবর্ত বিদ্রোহের পেছনে অর্থনৈতিক কারণ নেহায়েৎ কম ছিল না। জাতীয়তাবাদী চেতনা তো এই সেদিন ইউরোপ থেকে আমদানি হলো ভারতবর্ষে। নিজেদের কৌমপ্রীতি থাকলেও আধুনিক জাতীয়তাবাদী চেতনা নিশ্চয়ই ছিল না কৈবর্তদের মধ্যে। তারা বিদেশী আর্যদের বিরুদ্ধে প্রথমে লড়াই করেছে নিজেদের ভূমির জন্য, নিজেদের নিয়ম-কানুন বা কৌমরীতি বিনষ্টের হাত থেকে রক্ষার জন্য। যখন অধিকতর উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী আর্যদের কাছে পরাজিত হয়েছে, তখন অন্যান্য কৌমের মতো কৈবর্তরাও রাজাকে প্রদেয় করের দাবি মেনে নিয়ে নিজেদের মতো জীবনযাপন করতে চেয়েছে। কিন্তু বার বার যখন আঘাত এসেছে অর্থনৈতিকভাবে-সামাজিকভাবে-ধর্মীয়ভাবে, তখন আর বিদ্রোহে না নেমে উপায় থাকেনি তাদের। সেই সঙ্গে বিদ্রোহের জন্য যোগ্য নেতা পাওয়ার অপেক্ষা তো ছিলই। দিব্যোকের মধ্যেই কৈবর্তরা প্রথম খুঁজে পেয়েছিল যোগ্য নেতার প্রতিকৃতি। তাই দিব্যোকই পৃথিবীর প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র স্বাধীন কৃষক-রাষ্ট্রের জনক।

০৫.
এক হাজার বছর আগের মানুষদের নিয়ে উপন্যাস লেখার পরবর্তী ধাপে যে চিন্তা আসে তা হলো কেমন ছিল সেই সময়ের জীবনযাপন? মানুষ যখন একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে বংশপরম্পরায় বছরের পর বছর বসবাস করে, তখন তারা নিজেদের মতো করে সভ্যতা ও সংস্কৃতি নির্মাণ করে নেয়, যে ভূগোলে বাস করে সেই ভূগোলের সাথে খাপ খাওয়ানোর মতো খাদ্যাভ্যাস-বস্ত্রাবরণাভ্যাস-বাসগৃহ নির্মাণ-শিক্ষালয় পত্তন-বিনোদনকেন্দ্র সবকিছুই গড়ে নেয়। নিশ্চয়ই হাজার বছর আগেও কৈবর্তদের নিজস্ব সামাজিক রীতি-নীতি, খাদ্যাভ্যাস, পরিচ্ছদ, বাসগৃহসহ জীবনযাপনের সব উপাদান ও বিন্যাস ছিল। কী ছিল সেই সব বিন্যাসের ভিত্তি, কেমনভাবে জীবনযাপন করত আমাদের সেই পূর্বপুরুষরা, কেমনভাবে গৃহনির্মাণ করত, কেমনভাবে নিজেদের লজ্জা নিবারণের পাশাপাশি নিজেদের সাজাত পরিচ্ছদে-প্রসাধনে-অলংকারে, কেমনভাবে বিনোদনের উপায় খুঁজে নিত, কেমনভাবে শিক্ষিত করে তুলত নিজেদের উত্তরপুরুষদের-- এই সব প্রশ্নের একটা গ্রহণযোগ্য উত্তর খুঁজে না পেলে উপন্যাসের একটি অক্ষরও তো লেখা সম্ভব নয়। তখন আবার খুঁজতে হয়, পড়তে হয়, হাঁটতে হয়। জানা গেল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একসময়ের শ্রদ্ধেয়া শিক্ষক শাহানারা হোসেন গবেষণা করেছিলেন পাল আমলের বরেন্দ্রভূমির মানুষের জীবনযাপন-পদ্ধতি নিয়ে। ইংরেজিতে লেখা সেই বিশাল গবেষণাপত্রটি পাওয়া গেল বিভিন্ন বন্ধুর সাহায্যে। অগ্রজ কথাসাহিত্যিক হরিপদ দত্ত কিছু বাংলা লেখাও জোগাড় করে দিলেন। সেই সঙ্গে রয়েছেন সর্ববিপদের সমাধান নীহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস- আদিপর্ব’ নিয়ে। আছেন দীনেশচন্দ্র সেন, সুকুমার সেন, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, কুমার শরৎকুমার রায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, শৌরীন্দ্রকুমার ঘোষ, রমাপ্রসাদ চন্দ, শ্রী হরগোপাল দাশকুণ্ডু,  নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, রমেশচন্দ্র মজুমদার, শম্ভুনাথ কুণ্ডু, সুকুমারী ভট্টাচার্য, আবদুল মমিন চৌধুরী তাঁদের অমূল্য রচনাবলি ও গবেষণাসম্ভার নিয়ে; আছে মেগাস্থিনিসের ভারত-বিবরণ, হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণকাহিনী, ই সিং-এর ভ্রমণবৃত্তান্ত, অন্যান্য বিদেশীদের প্রাচীন বাংলা ভ্রমণের বৃত্তান্ত, অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জীবনচরিত। আর সর্বোপরি রয়েছে সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিতম’ এবং কাহ্নপা-লুইপা-সরহপাদের ‘চর্যাপদ’। আর সেই সঙ্গে আছে কৈবর্ত-বিদ্রোহের সমসাময়িক আদিবাসী যেমন কোচ, রাজবংশী, শবরদের বিষয়ক লেখাজোখা। সেই সঙ্গে সমকালীন বরেন্দ্র-গৌড়-পুণ্ড্রবর্ধনের সকল প্রচলিত কিংবদন্তি ও কাহিনী।

সেসব থেকে জানা গেল, পাল আমলে বরেন্দ্রীর গ্রামবাসী ও শহরবাসীর জীবনাচারের মধ্যে ফারাক এখনকার মতো তখনো যথেষ্ট পরিমাণেই ছিল। আবার ফারাক ছিল ধনী-দরিদ্রের মধ্যেও।

মাছে-ভাতে এখনকার বাঙালিই শুধু নয়, বাঙালির পূর্বপুরুষরাও ছিল মৎসাহারী। এমনকি এখানে বসবাস করতে এসেছিল যে ব্রাক্ষ্মণরা, তারাও মাছ খাওয়া শিখে নিয়েছিল অচিরেই। সর্বানন্দের টীকাভাষ্য থেকে বারবার পাওয়া যাচ্ছে উৎকৃষ্ট মৎস্য হিসেবে ইলিশের নাম। আর সাধারণ ‘বঙ্গালবাসীরা’ যে সোরা মাছ ও শুঁটকি মাছ খুব আনন্দের সঙ্গে খেত, তারও উল্লেখ করা হচ্ছে। যেহেতু প্রধান খাদ্য ভাত, তাই প্রধান কৃষিপণ্য ছিল ধান। যবের চাষ হতো। যব খাওয়া হতো মণ্ড করে। সাত রকম ব্রীহির মধ্যে যব, দেধান, শামাধান, কঙ্গুর সঙ্গে গোধূমের উল্লেখ আছে। কর্ণসুবর্ণের রক্তমৃত্তিকা বিহারের মাটি খুঁড়ে গম পাওয়া গেছে, সুতরাং গম অপরিচিত ছিল না, তবে এখনকার মতোই ছিল অপ্রধান খাদ্য হিসেবেই বিবেচিত হতো। কলাইয়ের মধ্যে খাওয়া হতো মুগ, মাষকলাই ও মশুর। সর্ষে ঘানিতে পিষে তেল তৈরি করা হতো। তরকারির মধ্যে প্রচলিত ছিল অলাবু (লাউ), কুষ্মাণ্ড (চালকুমড়া), করবেল (করলা), ইচ্ছড় (এঁচড়), বাতিঙ্গন (বেগুন), পটল, কর্করী (কাঁকুড়), মূলক (মূলা), তিন্তিলি (তেঁতুল) ও কব্বক (কোঁড়)। সমুদ্রের লোনা পানি শুকিয়ে লবণ তৈরি হতো। সেই লবণের নাম ছিল কড়কচ্চ। ভুট্টা পুড়িয়ে খেত মানুষ। তার নাম ছিল ভাদুস। পেঁয়াজ, রসুন, সলুপ, ধনেপাতার বর্ণনা রয়েছে অনেক জায়গায়। শহর ও গ্রামে যে জিনিসপত্রের দামে এখনকার মতো তখনো যথেষ্ট তারতম্য ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন শ্লোকে। শহুরে মেয়েকে বিয়ে করে গ্রামে নিয়ে যাবার জন্য বউকে এই বলে গ্রামবাসের সুবিধার কথা বোঝাচ্ছে স্বামী-- ‘কচি সর্ষেশাক, নতুন চালের ভাত, প্রচুর হড়হড়ে দই। সুন্দরী, গাঁয়ের মানুষ অল্প খরচে ভালো খায়।’ আরেক শ্লোকে বলা হচ্ছে- ‘ওগরা ভাত (ফেনা ভাত), কলার পাত, গাওয়া ঘি, দুধের সংযোগে, ময়না মাছ, নালতা শাক পরিবেশন করে প্রেয়সী, আর খায় পুণ্যবান।’

অন্যদিকে বড়লোকদের খাদ্য তালিকায় এসবের পাশাপাশি যোগ হতো নানান মিষ্টান্ন। সেগুলি বড়লোকের খাদ্য বলেই বোধহয় সবগুলির নামই ছিল সংস্কৃত ভাষায়। রাবড়িকে বলা হতো ‘খিরিস’, চিনি-দই-ঘি মিশিয়ে তৈরি হতো ‘রসালা’, দুধের সঙ্গে দই মিশিয়ে তৈরি হতো ‘দধিকূর্চিকা’। ঘন ক্ষীরকে বলা হতো ‘কূর্চিকা’। সেই ক্ষীরকে ঘোলের সঙ্গে মেশালে তার নাম হয়ে যেত ‘তক্রকূর্চিকা’।

খাওয়ার পরে পরা। পোশাকের ব্যাপারে সাদাসিধে ধরন আমাদের সমাজে সর্বকালেই প্রচলিত ছিল। উচ্চবর্ণের মানুষ কিংবা ধনী মানুষরা পরতেন ধুতি। ঊর্ধ্বাঙ্গ সচরাচর থাকত অনাবৃত। তবে শীতে চাদর এবং বিশেষ উপলক্ষে উত্তরীয় পরার প্রচলন ছিল। আদিবাসী কৌমের মানুষজন খুব বেশি হলে পরত খাটো ধুতি। বেশিরভাগই ল্যাঙোট। মেয়েরা পরত দুই টুকরো কাপড়। একটা সায়ার মতো, আর বক্ষবন্ধনী হিসেবে আরেকটি কাপড়ের টুকরা। সাধারণ গৃহস্থ ও নাগরিক পরিবারের মেয়েরা সম্ভবত শাড়িই পরত। মেয়েদের ঘোমটার প্রচলন তখনো ছিল। সেকালের কবি লক্ষ্মীধরের লেখা একটি কবিতা পাওয়া গেছে। সেখানে ভদ্র নারীর বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে। কবিতাটির বাংলা অনুবাদ মোটামুটি এই রকম দাঁড়ায়-- ‘এই যে ঘোমটা দেওয়া মাথা স্বাভাবিক লজ্জায় আনত, চলন ধীর, চোখ পায়ের আঙুলে নিবদ্ধ, কথা অল্পস্বল্প ধীর মধুরভাষে- এতেই যেন মেয়েটি উচ্চরবে নিজের কুলমর্যাদা প্রকাশ করছে।’

এইভাবে ধাপে ধাপে খুঁজতে হয় মানুষের জীবনচর্যার প্রতিটি অনুষঙ্গকে। জানা যায় এক সময় বাংলায় গ্রাম ও নগর বলে আলাদা কিছু ছিল না। সবই জনপদ। যে জনপদের চারপাশে পরিখা বা প্রাচীর-প্রাকার, সেটি এক সময় হয়ে উঠল নগর। হাজার বছর আগের বরেন্দ্রী-গৌড়-পুণ্ড্রবর্ধনের নগরগুলির নাম খুঁজে বের করতে হয়।  একেক ইতিহাসবিদ আলাদা আলাদা নাম লিখেছেন। কারো সংগ্রহে বেশি নাম, কারো সংগ্রহে কম নাম। সবগুলিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জড়ো করতে হয়, মিলিয়ে নিতে হয় প্রাচীন বাংলার জনপদের মানচিত্রের সাথে। সেই ম্যাপও নীহাররঞ্জন রায়ের সৌজন্যেই পাওয়া।

মানুষ যেখানে বাস করে, সেখানেই চাষ করে, সেখানে ফুল ফোটায়, সমাজ-পরিচালনার নিয়ম-নীতি তৈরি করে নেয়- লিখিত বা অলিখিত। তাই মানুষকে তুলে আনতে হলে তার পরিপ্রেক্ষিতসমেত আনতে হবে। পরিপ্রেক্ষিত বাদ দিলে নিরবলম্ব মানুষের কোনো পরিচয় থাকে না। সে তখন হয়ে যায় কেবল প্রাণীকুলের একজন। তাই খোঁজ চলে নগর-গ্রাম-রাজধানীর, বের করতে হয় সেকালের শাসনপদ্ধতির খোঁজখবর, শ্রেণীভেদ-বর্ণভেদ, শিক্ষার পথ ও পদ্ধতি, প্রচলিত মুদ্রার নাম, জিনিসপত্রের দরদাম, জমি মাপার পদ্ধতি, চাষাবাদের পদ্ধতি, বিবাহ ও অন্যান্য পারিবারিক সম্পর্কের আচার-অনুষ্ঠান, বাণিজ্যযাত্রা, যাতায়াত ব্যবস্থা, বাসভবন ও গৃহস্থালি, নিজেকে সাজানোর অলংকার, সাজের পদ্ধতি, যানবাহন, বিনোদন, ধর্মভাবনা-ঈশ্বরভাবনা, কবিতা, গান, চিত্রকলা-- এককথায় মানুষের জীবনসংশ্লিষ্ট সবকিছু। অনুসন্ধানী পাঠের পরিমাণ শত শত পৃষ্ঠা ছেড়ে হাজার হাজার পৃষ্ঠায় পৌঁছেছে। সেই সঙ্গে চলছে নোট নেওয়া। মাসের পর মাস ধরে। এক দুই তিন করতে করতে চার বছরও পেরিয়ে যায়। পেশাগত সময়টি বাদ দিলে বাকি পুরোটা সময় মনের চোখে শুধু দেখার চেষ্টা করি হাজার বছর আগের বরেন্দ্রীকে। পারিবারিক সদস্যরা  প্রশ্নের চেহারায় ঠাট্টাও করে-- কোনো বিষয়ে পিএইচডি বা ডক্টরেট করছি কি না! ডক্টরেট আমি করিনি। জানি না তার জন্য কত পরিশ্রম করতে হয়। নিশ্চয়ই অনেক পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু আমার এই কাজের সঙ্গে পিএইচডির পরিশ্রমের একটা ব্যাপক ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। থিসিস জমা দিলে ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে একটি ডিগ্রি নিশ্চিত পাওয়া যায়। কিন্তু আমার সব পরিশ্রমের শেষ ফল যে উপন্যাস, সেটি একটি সার্থক উপন্যাস হবে কি না তার কোনো নিশ্চয়তা আমার নেই। হয়তো দেখা যাবে আমি একটি বাজে তৃতীয় শ্রেণীর উপন্যাস লিখেছি। মাল-মশলা প্রচুর জোগাড় করেছি হয়তো, কিন্তু রন্ধন আদৌ পাঠকের পাতে পরিবেশনযোগ্য নয়। এমন উদাহরণ তো রয়েছে ভুরি ভুরি। এই কথা মাঝে মাঝে মনে হয়, আর আমি নিজের ভেতরে রিখটার স্কেলে অপরিমাপযোগ্য ভূমিকম্পের আলোড়ন টের পাই। ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠি। কিন্তু কাজ থেকে পিছিয়ে আসার কথা ভাবতেও পারি না। নিজেকে সান্ত্বনা দেই এই বলে যে পৃথিবীতে কত লেখককেই তো কত ধরনের পণ্ডশ্রমের মধ্য দিয়েই পথ করে নিতে হয়েছে। আমিও নিশ্চয়ই এই একটি উপন্যাসে ব্যর্থ হলে লেখা ছেড়ে দেব না। কিছুদিন হয়তো মুষড়ে থাকব। তারপরে তো ফের আরেকটি লেখাতে ঠিকঠিকই হাত দেব। অযথা হিসাব করার দরকার কী? কিন্তু হিসাব পিছু ছাড়ে না। পারিবারিক একটি সংকটে অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন। টাকা নেই বলায় চোখা প্রশ্ন আসে, তাহলে এই যে এক উপন্যাসের পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করা হচ্ছে তার চাইতে কি পরিবারের গুরুত্ব কম? পাঁজা করা বইগুলির গায়ের দাম হিসাব করে ফেলেছে পরিবারের সদস্যরা। তিরিশ হাজার টাকার চাইতে বেশি। তার সঙ্গে এতগুলি বছরের শ্রমঘণ্টা, উত্তেজনা, আবেগ, দুশ্চিন্তা, দুশ্চিন্তার অনুষঙ্গ হিসেবে মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়া, ১৩০০০ বর্গ কিলোমিটার ছুটে বেড়ানোর ব্যয়-- সব মিলিয়ে কত হিসাব হয়েছে খরচের খাতায়! পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করি, উপন্যাস লেখা হলে সব পুষিয়ে যাবে। আসলে তো আশ্বস্ত করি নিজেকে। এ দেশে কোনো প্রকাশক তো আমাকে ঐ পরিমাণ টাকা দেবে না। কিন্তু উপন্যাসটি লিখে উঠতে পারলেই হলো। টাকার হিসাব কে করে!

০৬.
আবার লেখার দিকে ফেরা। নিজের মনের চোখে দেখতে পাই কৈবর্তনেতা ভীমকে। নিজের মাটির স্বাধীনতা রক্ষার জন্য একরোখা অশ্বের তেজ নিয়ে লড়ে যাচ্ছে এক কৌমযুবক। এই সেদিনের চে গুয়েভারা যে মন্ত্র বুকে নিয়ে সারা পৃথিবীতে আগুন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন-- ‘মাতৃভূমি, বিজয় অথবা মৃত্যু’-- সেই মন্ত্র কি তিনি ভীমের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন? কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রচর্চার অভিজ্ঞতা নেই, নেই কৌটিল্য-স্বভাবের কোনো মন্ত্রণাদাতা, নেই কোনো যুদ্ধ পরিচালনার কূটকৌশলসমৃদ্ধ সেনাধ্য তবু ভীম বার বার প্রতিহত করে চলেছেন রামপালের আক্রমণ। এই বরেন্দ্রীর আদিবাসী মানুষের স্বাধীনতা মেনে নিতে রাজি নয় কেউ। তাই রামপালের সঙ্গে যোগ দিয়েছে আঠারো রাজ্যের রাজা, সামন্ত ও মহাসামন্ত। অঙ্গদেশের অধিপতি মথন দেব, মহাপ্রতিহার শিবরাজদেব, কাহ্নুর দেব, সুবর্ণদেব, পীঠির রাজা দেবরতি, মগধ ও কান্যকুব্জের রাজা ভীমযশা, কোটাটবীর রাজচক্রবর্তী বীরগুণ, উৎকলের রাজা জয়সিংহ, বাগড়ী বা বালবল্লভীর বিক্রমরাজ, অপরমন্দারের লীশূর, কুজবটীর রাজা হস্তিযুদ্ধবিশারদ শূলপাল, মানভূমের বা তৈলকম্পের রাজা রুদ্রশিখর, উচ্ছালের ময়গলসীহ, কজঙ্গলমণ্ডলের রাজা নরসিংহার্জুন, উত্তর রাঢ়বঙ্গের ঢেক্করীর রাজা প্রতাপসীহ, সঙ্কটগ্রামের চণ্ডার্জুন, নিদ্রাবলীর বিজয়রাজ, কৌশাম্বির রাজা দ্বোরপবর্ধন। ভীমের সাথে তাদের কারো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নেই। তবু তারা ভীমের বিরুদ্ধে একজোট। কারণ ভীম হচ্ছেন এ দেশের আদি ভূমিপুত্রদের শৌর্যের প্রতীক। তাকে টিকে থাকতে দেওয়া মানে এই মাটির আসল দাবিদার ও আসল উত্তরাধিকারী ভূমিপুত্রদের অধিকার মেনে নেওয়া। তাহলে তো নিজেদের বহিরাগত বলতে হয়। নিজেদের আগ্রাসনের বৈধতাকে অবৈধ বলে মেনে নিতে হয়। তাই এই সর্বাত্মক আক্রমণ। এই সর্বব্যাপী আক্রমণের বিরুদ্ধে অবিচল ভীম। প্রতিরক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছে চল্লিশ মাইলব্যাপী প্রাচীর। বরেন্দ্রীর সকল কৈবর্তের পাশাপাশি অন্য ভূমিপুত্ররাও স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছে। যুদ্ধে ঘোড়া অপরিহার্য। অশ্বারোহী বাহিনী না থাকলে কোনোক্রমেই যুদ্ধজয়ের আশা করা যায় না। কিন্তু অশ্ব ক্রয়ের টাকা কোথায়? পীঠি থেকে এক পর্যায়ে কিছু অশ্ব পাওয়ার আশ্বাস মিলেছিল। কিন্তু পীঠির রাজা নিজেই এখন সসৈন্যে রামপালের সহযোগী। ভীমের ভুরু একবারও কাঁপেনি। জঙ্গল থেকে ধরা হলো শত শত বুনো মহিষ। তাদের নিয়ে মহিষারোহী বাহিনী। কিন্তু অসম যুদ্ধ কতদিন চালানো যায়। তদুপরি যুদ্ধেক্ষেত্রে অন্যায় আচরণ তো কৌটিল্যের অনুসারীদের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্যও বটে। যুদ্ধেক্ষেত্রে ভীমের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ছিল। ঘটলও সেটাই। ৩৭ বছরের স্বাধীন কৃষকরাষ্ট্র আবার ফিরে গেল বহিরাগত উচ্চবর্ণের শাসনে।

আর পপীপের কথা। কবি, প্রেমিক, যোদ্ধা পপীপ। ক্রীতদাস থেকে কবি। চারণ কবি নয়। সংস্কৃত জানা, সংস্কৃত ভাষায় কবিতা লিখে খ্যাতিমান হওয়া পপীপ। সদুক্তিকর্ণামৃত বা সুভাষিত রত্নকোষ নামের প্রাচীনতম কবিতা সংকলনে পঞ্চম শতকের কালিদাস, পরবর্তী যুগের ধারাবাহিক কবি অমরু, রাজশেখর, ভবভূতি, অপরাজিত রতি, কুমুদাকর মতি, জিতারী নন্দী, বুদ্ধাকর গুপ্ত, রত্নকীর্তি, শ্রীপাশ বর্মা, সংঘশ্রী, মধুশীল, বীর্য মিত্র, শ্রী ধর্মাকর, রতিপাল, বৈদ্যধন্য, লক্ষ্মীধর, সুবর্ণরেখ, জয়িক, শুভঙ্কর, মহিলা কবি নারায়ণলক্ষ্মী ও ভাবদেবীর পাশাপাশি একজন মাত্র কৈবর্ত কবির কবিতা ঠাঁই পেয়েছে পরম যোগ্যতাগুণে। সেই কবি হলেন পপীপ। সেই পপীপেরও আত্মাহুতি হয়েছিল যুদ্ধেক্ষেত্রে। অভিজাত কবি সন্ধ্যাকর নন্দী পপীপকে নিজ কৌমের চিন্তা বাদ দিয়ে কবিতা রচনায় মনোনিবেশ করার উপদেশ দিয়েছিলেন স্নেহের ছলে। বলেছিলেন, রামপাল যে রাজ্য উদ্ধারের জন্য যুদ্ধ করছে তা ন্যায়যুদ্ধ। কারণ বরেন্দ্রী হচ্ছে পালসম্রাটদের জনক-ভূ। তিনি পপীপকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, রামপালের রাজসভায় পপীপেরও যাতে ঠাঁই হয় সেই চেষ্টা তিনি করবেন। উত্তরে পপীপ বলেছিলেন--
মৎসহিত অম্বু কীদৃক পৃচ্ছতি
অবিসামভমিরেণ।
(মাছের পক্ষে সবচেয়ে ভালো জলাশয় কী?
অবি অর্থাৎ বকহীন।)
তেমনই বহিরাগতহীন বরেন্দ্রীই হচ্ছে একমাত্র বাসযোগ্য বরেন্দ্রী। বরেন্দ্রী ততদিনই শাপমুক্ত থাকবে যতদিন তা থাকবে ভূমিপুত্রদের নিজেদের দেশ।

উপন্যাসের সন্ধান প্রকৃতপক্ষে এইসব ভূমিপুত্রদেরই সন্ধান। তাঁদের গৌরবের সমাচার, তাঁদের ন্যায়নীতির প্রতি নিষ্ঠা, তাঁদের মাটিলগ্ন জীবন নিয়েই আমার স্বপ্নের উপন্যাস ‘পিতৃগণ’। উপন্যাসের সন্ধানের আখ্যান তাই নিজের শেকড়-সন্ধানেরই আখ্যান।

জাকির তালুকদার

বাংলাদেশ স্থানীয় সময় ১৩১৫, নভেম্বর ১৩, ৩০১০        

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2010-11-13 03:11:19