ঢাকা, শনিবার, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৫ আগস্ট ২০২০, ২৪ জিলহজ ১৪৪১

বছরজুড়ে দেশ ঘুরে

ভাসমান স্কুলে হাতেখড়ি, দ্বীপস্কুলে পড়াশোনা

আসিফ আজিজ ও শুভ্রনীল সাগর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৮৫২ ঘণ্টা, জানুয়ারী ৩০, ২০১৬
ভাসমান স্কুলে হাতেখড়ি, দ্বীপস্কুলে পড়াশোনা ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

বিল হালতি, একডালা গ্রাম (নাটোর) থেকে ফিরে: শিক্ষা নিয়ে কথা বলতেই সবাই বললেন, ভাসমান স্কুলে যান, দেখে আসেন আমাদের দশা। দু’দিনের বিল পরিক্রমায় জানা গেলো বছরের ছ’সাত মাস তারা ভেসেই থাকেন।

যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি। এরমধ্যে স্কুলটি ফাঁকা বিলপাড়ে। দোতলা ভবন। তবে নিচতলার অস্তিত্ব বোঝা মুশকিল বর্ষায়। তখন নৌকাই ভরসা।

বিল হালতির চার দ্বীপগ্রামের মধ্যমণি খোলাবাড়িয়া থেকে পূর্বের যে ডুবো রাস্তাটি খাজুরা চলে গেছে সে রাস্তায় দেড় কিলোমিটার এগোলেই একডালা গ্রাম। সাত-আটশ’ মানুষের ছোট্ট গ্রাম। অবকাঠামো প্রায় খোলাবাড়িয়ার মতোই। তবে একটু পিছিয়ে। অবস্থান নলডাঙ্গা উপজেলায়।

খাজুরাগামী রাস্তা থেকে উত্তর-পূর্ব কোণে যে রাস্তাটি মোড় নিয়েছে সেটিই একডালা গ্রামের রাস্তা। গ্রামের উঁচু কয়েকটি দ্বীপ সদৃশ ভূখণ্ডের উপরই কেবল জনবসতি। ছোট্ট একটি খালের মতো সৃষ্টি হয়েছে বর্ষার পানি সরতে সরতে। পাড়ে একটি বটগাছ। গাছ পেরিয়ে ছোট্ট মাঠ। মাঠের কিনারে একডালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলা স্কুলভবন। পেছনে যতদূর চোখ যায় বিল। ইরি চাষে সেখানে ব্যস্ত কৃষক।

স্কুল শুরু সাড়ে ৯টা থেকে। হাজির হলাম তার আগেই। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা ক্যামেরা দেখে ছুটে এলো। ‘ভাইয়া একডা ছবি উঠায় দ্যান’। আবদার মিটিয়ে ভবনের দোতলার দিকে পা চলে। নিচতলা মূলত সাইক্লোন সেন্টার।

উপরের তিন কক্ষের কবি জসীম উদ্দীন কক্ষটি শিক্ষকদের। শীতের আড়মোড়া ভেঙে স্কুলে এসে সবে গরম চায়ে চুমুক দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সালাম। বাকি সহকর্মীরা কোথায় জানতে চাইলে বলেন, আজ একজন জয়েন করবেন। এছাড়া আরও দু’জন নারী শিক্ষক আছেন। বলতে বলতেই এসে গেলেন নতুন শিক্ষক মো. আশরাফ আলী। পড়াশোনা শেষ হয়নি। এমএ করছেন নাটোর কলেজে।

খুব ভালো নেই তারা। শিক্ষার্থী আছে ৯৯ জন। ক্লাস রুম দুটি। দুটিকে আবার মাঝে পার্টিশন দিয়ে চারটি বানানো হয়েছে। ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ স্কুলটি বছরের চার থেকে ছয় মাস থাকে পানি বেষ্টিত। বলছিলেন প্রধান শিক্ষক।

বর্ষায় যাতায়াতের প্রসঙ্গ উঠলে তিনি বলেন, বর্ষায় বিলে পানি এলে গ্রামবাসীরা টাকা তুলে স্কুল পর্যন্ত একটি বাঁশের মাচা মতো তৈরি করে দেয়। সেটাই তখন একমাত্র ভরসা। যখন নিচতলার কলাপসিবল গেট পুরোটা ডুবে যায় তখন স্কুল বন্ধ রাখতে হয়। আমরা এসে সই করে চলে যাই।

তবে এতো প্রতিকূলতা নিয়েও পিএসসিতে পাসের হার শতভাগ বলে জানালেন তিনি। ভাসমান স্কুল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এলাকার লোকজন একে ভাসমানই বলে। মূলত এটা সাইক্লোন সেন্টার ও স্কুল ভবন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। পুরনো ভবনটি এখন অচল। চারপাশে কোনো কিছু না থাকায় সত্যি মনে হয় স্কুলটা ভেসে আছে পানির উপর।

নতুন শিক্ষক আশরাফ বলেন, এখানে সুযোগ-সুবিধা কম। যাতায়াতে সমস্যা। এখন তবু আসা যাবে। কিন্তু বর্ষায় নৌকা ছাড়া উপায় থাকবে না।

স্কুল দাপিয়ে বেড়ানো শিক্ষার্থীদের কথা বলার সময় নেই। দুটো ছবি তুলে দিলেই তারা খুশি। এতো সুবিধাবঞ্চিত হয়েও এই গ্রাম থেকে পড়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অনেকেই দায়িত্ব পালন করছেন।

এতো গেলো প্রাইমারি স্কুলের কথা। হাইস্কুলে পড়তে গেলে তাদের যেতে হয় খোলাবাড়িয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। এটিও একটি দ্বীপস্কুল।

খোলাবাড়িয়া বাজার ঘেঁষে প্রায় ৮-১০ ফুট উঁচুতে স্কুলভবন। বর্ষায় ভাঙন ঠেকাতে চারপাশে ব্লক বসানো। তবু রক্ষা হয় না। সংস্কার করতে হয় প্রতি বছর। আর স্কুলে যাওয়া-আসার জন্য সেসময় স্কুল কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা করে কয়েকটি নৌকার। সেগুলোতে নিজ খরচে আনা-নেওয়া করে স্কুল।

কথাগুলো বলছিলেন খোলাবাড়িয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক গাজী সালাহউদ্দিন। সকালে স্কুলে গিয়ে দেখা গেলো, পিটি করানো হচ্ছে। তার আগে গাওয়া হয় জাতীয় সঙ্গীত। সামনে পেছনে শিক্ষকরা দাঁড়িয়ে। স্কুল কম্পাউন্ডের ভেতরের মাঠে চলছিলো শারীরিক কসরৎ। শিক্ষার্থী আছে আড়াইশ’র মতো। তবে চাষাবাদের সময় উপস্থিতি একটু কম থাকে। কারণ পেটে- ভাত যোগাতে হয় একফসলি জমি থেকেই। তাই শিক্ষকরা কিছু বলেন না। বেতনও নেওয়া হয় না কারও কারও কাছ থেকে, জানালেন তিনি।

কিছু জমি আর সরকারি সহযোগিতা যা পাওয়া যায় তা দিয়েই চলে স্কুল। পাশে নিচুভূমিতে রয়েছে একটি মাঠ। মাঠে বিকেল গড়ালেই চলে খেলা।

স্কুল থেকে দক্ষিণ দিকে বাঁকা সড়কটির মাথায় চোখে পড়বে পাকা ভবনের গাছঘেরা আরেকটি সবুজ দ্বীপ। এটি খোলাবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসা। মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থী কম নয়। আগ্রহ বরং বেশি দেখা গেলো।

গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে একটি প্রাইমারি স্কুলও রয়েছে। নাম খোলাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

এখানে রাত স্তব্ধ হয় ৮টার পরেই। তাই সকালে উঠে স্কুলে যাওয়া শিশু-কিশোররা থাকে বেশ ফুরফুরে মেজাজে। স্কুলে যাওয়া তাদের কাছে উৎসবের মতো। এই প্রত্যন্ত দ্বীপগ্রামে থেকেও তাই তারা অবস্থান করে নিচ্ছে বড় বড় জায়গায়। এগিয়ে নিচ্ছে গ্রামকে।

বাংলাদেশ সময়: ০৮৪০ ঘণ্টা, জানুয়ারি ৩০, ২০১৬
এসএস/এএ/এটি/জেডএম

** দত্তপাড়ার মিষ্টি পান ঠোঁট রাঙাচ্ছে সৌদিতে
** একফসলি জমিতেই ভাত-কাপড়
** লাল ইটের দ্বীপগ্রাম (ভিডিওসহ)
** চলনবিলের শুটকিতে নারীর হাতের জাদু
** ‘পাকিস্তানিরাও সালাম দিতে বাধ্য হতো’
** মহিষের পিঠে নাটোর!
** চাঁপাইয়ের কালাই রুটিতে বুঁদ নাটোর
** উষ্ণতম লালপুরে শীতে কাবু পশু-পাখিও!
** পানি নেই মিনি কক্সবাজারে!
** টিনের চালে বৃষ্টি নুপুর (অডিওসহ)
** চলনবিলের রোদচকচকে মাছ শিকার (ভিডিওসহ)
** ঘরে সিরিয়াল, বাজারে তুমুল আড্ডা
** বৃষ্টিতে কনকনে শীত, প্যান্ট-লুঙ্গি একসঙ্গে!
** ভরদুপুরে কাকভোর!
** ডুবো রাস্তায় চৌচির হালতি
** হঠাৎ বৃষ্টিতে শীতের দাপট
** ঝুড়ি পাতলেই টেংরা-পুঁটি (ভিডিওসহ)
** শহীদ সাগরে আজও রক্তের চোরা স্রোত
** ‘অলৌকিক’ কুয়া, বট ও নারিকেল গাছের গল্প
** মানবতার ভাববিশ্বে পরিভ্রমণ
** সুধীরের সন্দেশ-ছানার জিলাপির টানে
** নতুন বইয়ে নতুন উদ্যম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa