ঢাকা, রবিবার, ৮ কার্তিক ১৪২৮, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

থাইল্যান্ড

থাইল্যান্ড থেকে জাহিদুর রহমান

আসকার কষ্ট বোঝে না কেউ

জাহিদুর রহমান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৯৩৭ ঘণ্টা, আগস্ট ২২, ২০১৬
আসকার কষ্ট বোঝে না কেউ আজরিন আসকা তালুকদার

পাতায়া (থাইল্যান্ড) থেকে: ছোট্ট মেয়ে আসকা। পুরো নাম আজরিন আসকা তালুকদার (৭)।

পড়ছে ঢাকার বারিধারায়। স্কলাস্টিকায় স্টান্ডার্ড ওয়ানে।

মন পড়ে থাকে থাইল্যান্ডে। মা-বাবার কাছে। অন্যদিকে হৃদয়ের টুকরো ছোট্ট আসকা সোনামণির জন্যও মন ছটফট করে তার মা আর বাবার।

কানিজ ফাতেমা তালুকদার আলো ও দীন মোহাম্মদ তালুকদার দম্পতির দুই সন্তানের একজন আসকা।

প্রবাসে জীবন সংগ্রামে নিয়োজিত এই দম্পতি প্রতিষ্ঠাও পেয়েছেন প্রবাসে, থাইল্যান্ডের আলো ঝলমলে নগরী পাতায়ায়।

বিজাতীয় সংস্কৃতিতে নয়। দেশকে ভালোবেসে, দেশের সংস্কৃতি আর মূল্যবোধে সন্তানদের ভবিষ্য‍ৎ গড়ে তুলতে এই দম্পতির ত্যাগ এখন অনেকের মুখে মুখে।

কেবলমাত্র সন্তানদের জন্যই বছরজুড়েই পাতায়া-ব্যাংকক-ঢাকা ছুটোছুটি করতে হয় এই দম্পতিকে।

তার মাঝে প্রবাসে গড়ে তোলা ব্যবসা, সংসার আর দেশে থাকা সন্তানের খোঁজ খবর নিতে নিতে ঘড়ির কাঁটা দিন পেরিয়ে চলে যায় রাতে।

বছরের পর বছর। দিনগুলো চলে এভাবেই।

মা-বাবা পাতায়ায় থাকলে আসকা থাকে ঢাকায়। উত্তরায়। খালা ফারহানা খানম মায়ার বাসায়।

দুই সন্তান সামলে আসকার জন্যও দৌড়ঝাঁপ করা খালার ত্যাগ আর ভালোবাসাও অনন্য।

নরসিংদীর সাটিরপাড়া গ্রামের আব্দুর রউফ মিয়ার মেয়ে কানিজ ফাতেমা আলো। তিন বোনের মধ্যে মেঝো। বরিশালের দীন মোহাম্মদ তালুকদার সোহাগের সঙ্গে গাটছড়া বেঁধে ১৯৯৮ সালে চলে আসেন থাইল্যান্ডে।

পাতায়ার সেকেন্ড রোডে সেন্ট্রাল শপিং আর্চাডের কাছে গড়ে তোলেন নেক্সট ফ্যাশন নামের কাপড়ের ব্যবসা।

সেই সঙ্গে হাল ফ্যাশনের শার্ট, প্যান্ট, স্যুট তৈরির জন্য ভিনদেশি অতিথিদের পছন্দের ঠিকানা এখন এই দোকান।

তাদের দুই সন্তান আরছি তালুকদার আর আজরিন আসকা তালুকদারের জন্ম আলো ঝলমলে নগরী পাতায়ায়।

জন্মের পর দুই সন্তানকেই দেশে পাঠিয়ে দেন আলো ও সোহাগ দম্পতি। মা ও দুই বোনের তত্ত্বাবধানে দেশেই ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়।

বড় ছেলে আরছি তালুকদার দেশে শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ছোট খালা খাদিজাদুল কোবরা জয়ার কাছে থেকেই কমার্স নিয়ে পড়ছে টুয়েলভ এ।

ইউরোপ-আমেরিকার মতো নয়। এখানে জন্ম নিলেও জোটে না নাগরিকত্ব। আরবের মতোই রাজকীয় থাই সরকার প্রবাসীদের কেবল আবাসিক হিসেবে বসবাসের অনুমতি দেয়।

হাতে গোনা দু’একজন, যারা নাগরিকত্ব পেয়েছেন, এমন উদাহরণ ছাড়া অন্যদের মনোভাব অভিন্ন।

যে কারণে এখানকার মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয় অভিভাবককে।

তাই সন্তানদের মানুষ করতে আলো আর সোহাগ দম্পতির জন্যে প্রবাসে টিকে থাকার কষ্ট ও ত্যাগ, দু’টোই বেশি।

কানিজ ফাতেমা তালুকদার আলো বাংলানিউজকে জানান, সন্তানদের জন্য দেশে আর প্রবাসে। দু’টি ঠিকানা বজায় রাখতে গিয়ে বাড়তি অর্থ ব্যয় হয়।

তিনি বলেন, সন্তানদের পরীক্ষার সময় চলে যাই বাংলাদেশে। যে কারণে বারিধারা ডিওএইচএস এলাকায় রাখতে হয়েছে আরেকটি বাসা। অন্য সময় আসকা উত্তরা খালার বাসায় থাকলেও দেশে গিয়ে সেখানে উঠতে হয়।

এভাবেই বড় ছেলেকে পাতায়া থেকেই দৌড়ঝাঁপ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে।

তিনি জানান, মেয়ে যখন দেশে থাকে তখন মন পড়ে থাকে সন্তানের কাছে। আবার যখন মেয়ের টানে দেশে আসি, তখন প্রবাসে থাকা ব্যবসা ও স্বামীর চিন্তায় মন থাকে থাইল্যান্ডে। বিয়ের পর এভাবেই চলছে।

আলো বলেন, আমার মেয়েটার খুব শখ বেড়ানো। এখানে স্বামীর সঙ্গে কোথাও বেড়াতে গেলে মেয়ের কথা ভেবে বুকের মধ্যে তখন শূন্যতা অনুভব করি। গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে আসকা এখন পাতায়ায়। মায়ের ছায়া হয়েই মিশে আছে সে।

কোথায় বেশি ভালো লাগে? এমন প্রশ্নে মাকে জড়িয়ে ধরে আসকার উত্তর, ‘মা যেখানে থাকে। সেখানেই আমার সব চাইতে বেশি ভালো লাগে। ’

দীন মোহাম্মদ তালুকদার সোহাগ বাংলানিউজকে বলেন, প্রবাসে টিকে থাকা এখন আরও কঠিন। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সন্তানদের সত্যিকার অর্থে মানুষ করতে আমাদের একটু বেশিই কষ্ট করতে হয়।

তিনি বলেন, সাধারণত দেশে অফিসে গেলেই সন্তানদের জন্য টেনশন হয়। তারা ঠিকমতো খেলো কি না, পড়লো কি না, ঘুমালো কি না ইত্যাদি। আর এসব খবরই রাখতে হয় আমাদের দু’জনকে এই প্রবাসে থেকে।

সোহাগ বলেন, আরছি বড় হয়ে গেছে। আসকা ছোট। আমাদের ছেড়ে যখন দেশে থাকে। তখন মা-বাবার জন্য ওর কোমল হৃদয়ের অনুভূতি আর কষ্টগুলোর কথা ভেবে অশ্রুসিক্ত হয় দু’চোখ।

তারপর প্রবাস জীবনের বাস্তবতায় এসব কষ্টকে মেনে নিয়েই হাসিমুখে চলতে হয় এই প্রবাসে। বলেন সোহাগ।

বাংলাদেশ সময়: ০৯২৬ ঘণ্টা, আগস্ট ২২, ২০১৬
এইচএ/

** পাতায়ায় মহারানীর ‘রাজা’ সোলায়মান
** সেবার মাধ্যমেই প্রবাসে বাংলাদেশকে তুলে ধরছেন বাবুল
** কোন স্যাটার ডে, সান ডে নেই!

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa