ঢাকা, শুক্রবার, ৯ আশ্বিন ১৪২৮, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫ সফর ১৪৪৩

সালতামামি

আস্থাসঙ্কট থেকে ঘুরে দাঁড়ায় পুঁজিবাজার

এস এম এ কালাম, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৫০১ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩১, ২০২০
আস্থাসঙ্কট থেকে ঘুরে দাঁড়ায় পুঁজিবাজার .

ঢাকা: ২০২০ সালের শুরুতে চরম আস্থা সংকট দেখা দেয় পুঁজিবাজারে। নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নানা পদক্ষেপের পরেও জানুয়ারি মাসে পুঁজিবাজারে দরপতন অব্যাহত থাকে।

 

ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্ত বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারি দেখা দেওয়ায় বাজারে চরম আস্থার সংকট দেখা দেয়। শুধু ব্যক্তি বিনিয়োগকারী নন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও বাজার থেকে সরে যায়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের ইক্যুইটি নেতিবাচক হয়ে পড়ায় বেশ কিছু ব্রোকারেজ হাউজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সব মিলিয়ে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভয়াবহ সংকটে পড়ে শেয়ারবাজার।  

মার্চের শুরুতে খায়রুল কমিশন শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করেন। এরপরও পতন ঠেকানো যায়নি। একদিনে সূচক ২০০ পয়েন্টের ওপর কমে যায়। উপায় না দেখে ২৬ মার্চ বন্ধ হয়ে যায় শেয়ারবাজার।  

এপ্রিলে বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামসহ অন্য কমিশনাররা দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যাপক উদ্যোগ নেয়। বিএসইসি ৬৬ দিন পর গত ৩১ মে ফের শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হয়। অনিয়ম ও কারসাজি বন্ধে তাদের নেওয়া দৃঢ় পদক্ষেপে বিনিয়োগকারীরা আস্থায় ফিরতে শুরু করে। ৩১ মে ডিএসই’র প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ছিল ৪০৬০ পয়েন্টে। ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪০২ পয়েন্টে।  

এদিকে নতুন কমিশন দায়িত্ব নিয়েই বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে আইন সংস্কার করার সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। দুর্বল ও লোকসানে থাকা কোম্পানিতে স্বচ্ছতা আনতে প্রশাসক বসানো এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পরিবর্তনেরও নির্দেশনা জারি, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জিরো টলারেন্স নীতিতে ফ্রিজ করে দেওযা হয় অনেক কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালকদের বিও হিসেবে থাকা শেয়ার। শুধু তাই নয়, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ন‌্যূনতম ২ শতাংশ এবং সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা নির্দেশনা জারি করে। পাশাপাশি ব্যাংকের নগদ লভ্যাংশ সেপ্টেম্বরের আগে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা, জেড ক্যাটাগরি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করা, ইউনিয়ন পর্যায়ে ও বিদেশে ব্রোকার হাউজের শাখা খোলার অনুমোদনসহ নানা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসি। যার ফলে গত ৭ মাসে ২০০ কোটি টাকার লেনদেন ১৫০০ কোটি টাকা ছাড়ায়।  

এছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধনেও ইতিহাস গড়ে ডিএসই। বিশ্ব মন্দার মধ্যেও নতুন কমিশনের সাহসী পদক্ষেপে পুঁজিবাজারে সকল ক্ষেত্রে সাফল্যের মাইলফলক সৃষ্টি করে।

২০২০ সালের বাজারচিত্র 
আইপিও 

শিল্প উদ্যোক্তারা ২০২০ সালে বাজার থেকে মোট ৮টি কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে ৯৮৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ৩টি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ৩১১ কোটি টাকা মূলধন উত্তোলন করে।  

তালিকাভুক্তি
২০২০ সালে ১টি করপোরেট বন্ডসহ মোট ৯টি সিকিউরিটিজ ৬০০২ কোটি ৭১ টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হয়।  

রাইট শেয়ার ইস্যু 
২০২০ সালে ১টি কোম্পানি ১ কোটি ৫৩ লাখ ৫১ হাজার ৫৫১টি রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মোট ২৩ কোটি ২ লাখ ৭৩ হাজার ২৬৫ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে।

লেনদেন টাকা
করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে ২০২০ সালে ২০৮ দিন লেনদেন হয়। ৩৮ কার্যদিবস লেনদেন কম হলেও ২০২০ সালে ডিএসইতে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১,৩৪,৯৮১ কোটি ২২ লাখ টাকা, যা ডিএসইর ইতিহাসে পঞ্চম সর্বোচ্চ লেনদেন এবং গতবছরের চেয়ে ২১,১৫৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বা ১৮.৫৯ শতাংশ বেশি। যার গড় লেনদেন ছিল ৬৪৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।  

অপরদিকে ২০১৯ সালে ২৩৭ কার্যদিবসে মোট লেনদেনের পরিমান ছিল ১১৩,৮২১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা এবং গড়ে লেনদেনের পরিমান ছিল ৪৮০ কোটি ২৬ লাখ টাকা।  

ডিএসইর মূল্য সূচক সমূহ
ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) 

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্য সূচক ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) আগের বছরের চেয়ে ৯৪৯.১৩ পয়েন্ট বা ২১.৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৪০২.০৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।

ডিএসই ৩০ সূচক (ডিএস৩০) 
২০২০ সালে ডিএসই ৩০ সূচক (ডিএস৩০) ৪৫০.৬১ পয়েন্ট বা ২৯.৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৬৩.৯৬ পয়েন্টে দাঁড়ায়।

ডিএসইএক্স শরীয়াহ্ সূচক (ডিএসইএস) 
২০২০ সালে ডিএসইএক্স শরীয়াহ্ সূচক (ডিএসইএস) ২৪২.২৮ পয়েন্ট বা ২৪.২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১২৪২.১১ পয়েন্টে উন্নীত হয়।  

বাজার মূলধন 
২০২০ সালে বাজার মূলধন ডিএসইর ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। ডিএসই বাজার মূলধন আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ ০৮ হাজার কোটি টাকা বা ৩২.০১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকায় অবস্থান করছে।

সিএসই
২০২০ সালের ১ জানুয়ারি সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ছিল ১৩ হাজার ৫০৫ পয়েন্ট ৩০ ডিসেম্বর সেটি বেড়ে ১৫ হাজার ৫৯২ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এক বছরে সিএসই সূচক বেড়েছে ২০৮৭ পয়েন্ট। দিনের লেনদেন তলানিতে থাকলেও বছর শেষে সেটি ব্যাপক উত্থান দেখা দেয়।  

এদিকে একটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পথ পরিক্রমায় পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করে বৃহৎ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে কর্মস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে তরান্বিত করার ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে আস্থাহীন বাজারে আস্থায় ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কমিশনের অগ্রণী ভূমিকা বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারবান্ধব করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।  

বাংলাদেশ সময়: ১৪৫৭ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩১, ২০২০
এসএমএকে/এজে

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa