ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ মাঘ ১৪২৯, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১০ রজব ১৪৪৪

অপার মহিমার রমজান

মিসরে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে অমুসলিমরাও রমজানে উপবাস থাকেন

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০৫৬ ঘণ্টা, জুন ১১, ২০১৬
মিসরে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে অমুসলিমরাও রমজানে উপবাস থাকেন ফাইল ছবি

পিরামিডের দেশ মিসর। ফেরাউনের স্মৃতিবিজড়িত মিসর।

নীল নদ ও তুর পর্বতের দেশ মিসর। শুধু পিরামিড, নীল নদ বা তুর পর্বতই নয়; শ্রেষ্ঠ কোরআন তেলাওয়াতের দেশও মিসর। সাহাবি হজরত আমর ইবনুল আস বাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে স্বাধীন হওয়া- এই দেশেই বিশ্বের প্রাচীনতম আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।

জনসংখ্যার দিক থেকে সর্ববৃহৎ আরব দেশ হলো মিসর। দেশটিতে রমজান মাস এলে অফিসের কর্ম ঘণ্টা কমানো হয়। যাতে সিয়াম পালনকারীরা ইবাদতের জন্য পর্যাপ্ত সময় পান।

মিসরীয় শিশুদের কাছে রমজান মাসটি সবচেয়ে বেশি আনন্দময়। তারা এ সময় আমাদের দেশের বাচ্চাদের মতো পিতামাতার কাছে রোজা রাখার দাবী জানায়।

মিসরের মোট জনসংখ্যার ১০ ভাগ খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী হলেও তারা রমজান মাসের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে প্রকাশ্যে ধূমপান ও খাদ্য গ্রহণ করেন না। অনেক উদারপন্থি খ্রিষ্টান জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখতে এ মাসে উপবাস করেন। মিসরের নারীরা রমজান মাসে পর্দার ব্যাপারে বেশ যত্নবান থাকেন।

সাধারণ অভ্যাসমতে আমরা যেমন ঈদের আগে পরে পরিচিত কাউকে দেখেলেই বা কারো সঙ্গে কথা হলে ‘ঈদ মোবারক’ বলি, মিসরীয়রা তেমনই সারা রোজা একে অপরকে বিভিন্ন ধরণের সম্ভাষণে ভূষিত করে থাবে। এসব সম্ভাষণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ‘রামাদান কারিম’। এর উত্তরে বলা হয়, ‘আল্লাহু আকরাম’। আরও বলা হয়- ‘কুল্লু সানা ওয়া আনতুম তাইয়্যিব’ অর্থাৎ সারা বছর তুমি ভালো থেকো।

মিসরে পবিত্র রমজান মাসে ফানুস দিয়ে সাজসজ্জা বহুদিনের ঐতিহ্য। রাস্তাঘাট, দোকানপাট, বাড়িঘর- সবখানে জ্বলে রঙিন কাঁচের লণ্ঠন। এটাকে মিসরীয়রা ফানুস বলে। রমজানের সময় ছেলেপুলেরা মোমবাতি দিয়ে ফানুস বা লণ্ঠন জ্বালায় এবং তারা রাস্তায় রাস্তায় প্রদক্ষিণ করে। আনন্দ করে। এসময় তারা আল্লাহর নামে গানও করে। যেমন ‘যদি রমজান না আসতো, আমরা আসতাম না। ’ ‘হাঁটতে হাঁটতে আমাদের পা ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে, হে দয়ালু আল্লাহ...’।

 

অন্য গানে আছে, ‘ও সুলতানের কন্যা ইয়াহা, তোমার সুন্দর জলোয়া, মাথার ঝলকানো টিকলি মুসাফিরকে আর আকৃষ্ট করবে না। রমজান এসেছে দ্বারে এসো আল্লাহর ইবাদতে শামিল হই। ’

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মিসরীয়রা প্রথম রমজানের ফানুস ব্যবহার করে ৩৫৮ হিজরির (২৪ জুলাই ৯৬৮) ৫ রমজান তারিখে। এই তারিখে ফাতেমি খলিফা আল মুয়িজ রাতে কায়রো প্রবেশ করেন। স্থানীয়রা টর্চ, বাতি, মোমবাতি ইত্যাদি জ্বেলে তাকে স্বাগত জানায়। মোমবাতিগুলো যাতে বাতাসের বেগে নিভে না যায় সেজন্য তারা মোমবাতিকে কাঠের ফ্রেমে রেখে কয়েকদিক থেকে বন্ধ করে দেয় পাম পাতা ও চামড়ার টুকরা দিয়ে। সেই থেকে শুরু। এখন তা রমজান ঐতিহ্য হিসেবে পরিগণিত।

লণ্ঠনের অবয়ব খুব তাড়াতাড়ি পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে টিনের একটি ক্যানের মতো ছিল দেখতে। এর ভেতরে থাকত মোমবাতি। এর পর টিনের পরিবর্তে কাঁচ ব্যবহার শুরু হয়। এরপর কাঁচে ফাঁফানো অংশ সৃষ্টি করে বাতাস ঢোকানো হয়, নানা রঙ ব্যবহার করে বর্ণিল করা হয়। কোনো কোনো লণ্ঠনে আরবি ক্যালিওগ্রাফি ব্যবহার হয়। লণ্ঠনের আলো, নানা রঙের আলো, চোখ ধাঁধানো রঙ, আলোর ঝলকে ঝকমক করে উঠে। মানুষ মোহিত হয়ে লণ্ঠনের মিছিলের পানে তাকিয়ে থাকে।

মিসরের রাজধানী কায়রো। জোহরের নামাজের পর থেকে ‘বাজারের শহর’ নামে খ্যাত কায়রো শহরের অলিগলিতে ঢাকার চকবাজারের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে হরেক রকম ইফতারের আয়োজন। মিসরীয় মুসলিমরা সুন্নতের অনুসরণ করে পানি ও খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করে। অনেকেই আবার ফলের রস, চা দিয়েও ইফতার শুরু করে।

মিসরীয়দের কাছে কোনাফা, রেইজিন (কিসমিস) আর চিনির শিরা বা মধু দিয়ে মিষ্টি করা ময়দার টুকরোর মতো পেস্ট্রি রমজান মাসের খাবার হিসেবে জনপ্রিয়, তেমনি পনির, বাদাম আর রেইজিনের পুর দেওয়া শিরা ছিটানো পিঠা কাতায়েফও জনপ্রিয়। বহু মিসরীয় রমজান মাসে খেজুর, খুবানি, রেইজিন আর কালোজাম মিশিয়ে ফলের ককটেল খুশাফ তৈরি করে। মিসরের মানুষ ইফতারে মিষ্টিটা বেশি খায়। আর সেহরিতে সাধারণ খাবার যেমন- রুটি, ফল এসব খেয়ে থাকে। সঙ্গে থাকে টক দই। এটাকে মিসরীরা বলে জাবাদি। রোজার সময় খাবার-দাবারের প্রতি মিসরের নাগরিকরা একটু বেশি নজর দিলেও খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে না।

আরেকটি ব্যাপারে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, মিসরের মুসলমানরা ইফতার করেন আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাসায়। ফলে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হয়ে উঠে। তবে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই ইফতার করেন ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, হোটেল প্রভৃতিতে। তাই রমজান মাসে পাঁচতারা হোটেল ও অন্যান্য রেস্তোরাঁগুলোতে অ্যারাবিয়ান ডেকোরেশনে তাবু সাজিয়ে ঐতিহ্যবাহী ইফতার পরিবেশন হয়।

আর্থিকভাবে অনগ্রসর সর্বাধিক জনসংখ্যার আরব দেশ মিসরের সম্পদশালীরা প্রায়শই অপেক্ষাকৃত কম ভাগ্যবানদের জন্য ইফতার স্পন্সর করে থাকেন। বছরের এই সময় একজন রোজাদার মুসলিমকে খাওয়ানোর ব্যাপারটাকে পুণ্য ও বিশেষ সুযোগ বলে মনে করা হয়। মিসরের রাজধানী কায়রোর রাস্তাগুলো রমজানে থাকে ইফতার রেস্তোরাঁয় ভরা। অলিগলি পর্যন্ত ছেয়ে যায় ইফতার সামগ্রীর স্টল দিয়ে। তবে পয়সা দিয়ে নয়; রোজাদারদের জন্য একেবারে ফ্রি। সম্পদশালী লোকজন রোজাদারদের ইফতার করানোর মহান সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না। আর যারা এসবের আয়োজন করছেন, তাদের বেশিরভাগই তা প্রচার করতে চান না। এমনকি ছবি পর্যন্ত তুলতে দেন না। যাকে দেখেন তাকেই বলেন- ‘শায়খ! তাফাদ্দাল তাফতার মাআনা!’ অর্থাৎ জনাব! দয়া করে আমাদের এখানে ইফতার করে যান।

এ লক্ষে কায়রোর রাস্তাগুলোতে বিকেল থেকেই টেবিল সাজানোর কাজ শুরু হয়ে যায়। কোনো কোনো ব্লকে অসংখ্য টেবিল বসে। শত শত চেয়ার সাজানো হয়। আর এত টেবিলে কেবল গরিব আর দুঃস্থরাই বসেন না, নানা কাজে রাস্তায় থাকা লোকজনও আনায়াসে শামিল হয়ে যান এতে। এমনকি ইফতারের সময় রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ী আটকে যাত্রীদের ইফতার দিয়ে আপ্যায়িত করে থাকেন।

পবিত্র কোরআন অবতীর্ণের মাসে রমজান। আর শ্রেষ্ঠ তেলাওয়াতের দেশ মিসর। এ যেন সোনায় সোহাগা। আপনি যদি তারাবির নামাজের সময় কায়রো শহরে বের হন, আপনার মনে অন্যরকম এক অনূভূতি সৃষ্টি হবে। মসজিদের উঁচু উঁচু মিনার থেকে সুন্দর সুন্দর তেলাওয়াত আপনার কানে ভেসে আসবে, আপনাকে মুগ্ধ করবে কোরআনের সুর। রমজান মাসে মিসরের নামকরা কারীরা ছুটে যান ইউরোপ, আমেরিকায়। আর মিসরের গ্রামাঞ্চলের কারীরা চলে আসেন শহরে। চারদিকের তেলাওয়াত শুনে আপনার মনে হবে, একজনের চেয়ে আরেকজন সুন্দর করে কোরআন করছে। মনে হতে পারে আপনি কোনো প্রতিযোগিতার আসরে আছেন। হয়তো এ কারণেরই বলা হয়, ‘কোরআন নাজিল হয়েছে সৌদিতে, পড়া হয় মিসরে এবং লেখা হয় তুরস্কে। ’

আমাদের দেশে বিশ রাকাত তারাবি আদায় করতে যে পরিমাণ সময় লাগে, মিসরে ৮ রাকাত নামাজ আদায় করতে তার প্রায় তিন গুণ বেশি সময় লাগে। দেশটিতে সূরা তারাবির প্রচলন নাই বললেই চলে। মিসরে সাধারণত ৮ রাকাত নামাজ আদায় করা হয়। কিছু কিছু মসজিদে ২০ রাকাতও আদায় করা হয়।

মিসরে বিশ রোজার পর থেকে তাহাজ্জুদের জামাত শুরু হয়। সাধারণত রাত ২টা থেকে শুরু হয় এই নামাজ। অনেক মসজিদে তাহাজ্জুদের নামাজে আলাদা কোরআন খতমের ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া সচরাচর দেখা যায়, পাবিলক বাসের যাত্রীরা সবাই কোরআন তেলাওয়াতে মশগুল। সিটে বসে কিংবা দাঁড়িয়েই কোরআন তেলাওয়াত  করছে।

মিসীয়রা ঘরবাড়ি রঙ করে বা সাজিয়ে, ঈদ কার্ড পাঠিয়ে এবং নতুন কাপড় কিনে ঈদুল ফিতর উদযাপনের প্রস্তুতি নেয়। তবে সেখানে তিন দিন ধরে ঈদের উৎসব উদযাপিত হলেও মাত্র এক দিনের জন্য সরকারি ছুটি থাকে। বহু পরিবার নীল নদের তীরে, পার্কে বা বিভিন্ন মেলায় দিনের কিছু অংশ কাটিয়ে থাকে। বহু পরিবার ঈদের বিশেষ খাবার হিসেবে কাহক (অক্ষরিক অর্থে কেক) নামে এক ধরনের কুকি (পিঠা) কেনে বা বানায়। এই কুকি দশম শতাব্দীর মিসরের রাজপ্রাসাদের চুল্লিতে ছিল বলে জানা যায়, সেখানে বাবুর্চিরা কুকির ভেতর সোনার মুদ্রা পুরে দিত। আজকের দিনে এগুলো খালি রেখে দেওয়া হয় বা খেজুর ভর্তা, বাদাম বা টার্কিশ ডিলাইটের (জেলির মতো এক ধরনের ক্যান্ডি) পুর দেওয়া হয়। কাতায়েফ আরেকটি জনপ্রিয় ঈদের মিষ্টি। সব মিলিয়ে দারুণ কাটে হালের রাজা সিসির দেশে ঈদ ও রোজা।

বাংলাদেশ সময়: ২০৫৫ ঘণ্টা, জুন ১১, ২০১৬
এমএইউ/

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa