ঢাকা, শুক্রবার, ২২ আশ্বিন ১৪২৯, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

জাতীয়

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা সব পায়, আমি থাকি রাস্তায়

উপজেলা করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২১২১ ঘণ্টা, আগস্ট ১৬, ২০২২
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা সব পায়, আমি থাকি রাস্তায় মো. জব্বার আলী

কেরানীগঞ্জ : ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান সরকারি ভাতা পায়, ঘর-বাড়ি পায়, নানা সুযোগ সুবিধা পায় অথচ আমরা সম্মুখ যোদ্ধা হয়েও না খেয়ে থাকি, রাস্তায় ঘুমাই।

কাছের কোনো লোকজন না থাকায় পাইনি মুক্তিযোদ্ধা কার্ড।

সরকারি কোনো সুযোগ সুবিধাও মেলেনি কোনোদিন। ছেলে সন্তান অভাবী, তারা খেয়ে না খেয়ে থাকে। তারাও আমার খোজ খবর রাখে না। তাই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি, মানুষের দেওয়া খাবার খেয়ে কোনোমতে বাঁচে আছি। এতো কষ্ট করে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলাম সে স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধা রাস্তায় ঘুমায়!

দুই হাতের কনুই, পায়ের হাঁটুর দাগও আমাকে মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণ করেনি? পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে দুই দিন গলাপানিতে কাটিয়েছি, জোঁকে রক্ত খেয়েছে, শরীরের দাগ মোছেনি আজও, সে দেশে আমি না খেয়ে রাস্তায় থাকি?

অত্যন্ত কষ্টের এ কথাগুলো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার (দাবিদার)। নাম তার মো. জব্বার আলী। বয়স ৬৫। তার বাড়ি মাদারীপুর সদর থানার সিন্নাদী/শ্রীনদী বড়বাড়ি গ্রামে। বাবার নাম মোতালেব সিকদার (মৃত)। ভাগ্যের পরিহাসে জব্বার আজ ভবঘুরে!

মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) নিচের কষ্টের কথাগুলো তিনি তুলে ধরেন স্থানীয় সাংবাদিক ও কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশের কাছে।

অসুস্থ অবস্থায় জব্বার নিজের কথাগুলো বলেন। জানান, ৭১ সালে তিনি শুমাদার,কল্লাবাড়ী, ঘড মাঝি, মস্তাপুর, ঘটকচর এলাকায় যুদ্ধ করেছেন। ছিলেন কমান্ডার মো. খান শাহজাহানের নেতৃত্বে। দিনের পর দিন কষ্টকর পরিস্থিতি তাকে এতটাই অসুস্থ করে তুলেছে, ঠিকভাবে কথা বলতে পারেন না। তার সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, এমন অনেকেই বেঁচে আছেন ভালোভাবে, সুখেও আছেন। কিন্তু ভাগ্য তাকে নিয়ে যেতে পারেনি। তাই আক্ষেপও রয়েছে জব্বারের।

জব্বার নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করলেও এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাকে উদ্ধারকারী কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মামুন আর রশীদ। তিনি জানান, সোমবার (১৫ আগস্ট) রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাৎ বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে জিনজিরা ও আশপাশের এলাকায় গরিব ও অসহায় মানুষকে খাবার দিচ্ছিলেন তারা। জীর্ণশীর্ণ পোশাকে রাস্তায় ঘুমিয়ে থাকা জব্বারকেও এ সময় তারা খাবার দেন।

কিন্তু চলে আসার সময় কথা বলেন জব্বার। নিজেকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বলে পরিচয় দেন। যে তথ্য তিনি দেন, তাতে তাকে মুক্তিযোদ্ধা বলেই ধরে নেন ওসি রশীদ। পরে পুলিশের গাড়ি করে জব্বারকে নিয়ে আসেন থানায়।

১৫ আগস্ট রাতেই জব্বারকে গোসল করিয়ে উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। ভালো পোশাক পরিয়ে মঙ্গলবার তাকে নিয়ে আসা হয় আটিবাজারস্থ আপন ঘর ফাউন্ডেশন নামে একটি এনজিওতে। সেখানে জব্বারের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা দাবি করায় তার ব্যাপারে আরও তথ্য পেতে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করা হচ্ছে বলেও জানান ওসি রশীদ।

আপন ঘর ফাউন্ডেশনের সুপারভাইজার আব্দুল হান্নান জানান, জব্বার মুক্তিযোদ্ধা নাকি না, তা দেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছেন না তারা। সবার আগে তিনি একজন মানুষ, তার কথাবার্তায় মনে হয় তিনি ভালো বংশের। মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তিনি ভালো জ্ঞান রাখেন।

জব্বার অনেক অসুস্থ, তাকে চিকিৎসা দেওয়া হবে। যতদিন তার পরিচয় নিশ্চিত না হয়, তিনি আপন ঘর ফাউন্ডেশনেই থাকবেন। ফাউন্ডেশন থেকে তাকে থাকা-খাওয়াসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুই দেওয়া হবে বলেও জানান আব্দুল হান্নান

বাংলাদেশ সময় : ২১১৬ ঘণ্টা, আগস্ট ১৬, ২০২২
এমজে

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa