ঢাকা: বাংলাদেশের মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াতের সময় প্রায়ই চোখে পড়ে একটি সাইনবোর্ড, ‘দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা, সাবধানে চলুন’। কখনও লেখা থাকে ‘ধীরে চলুন, জীবন বাঁচান’।
দায় এড়ানোর সংস্কৃতি
সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষের কাজ হলো মূল কারণ দূর করা, রাস্তার বাঁক, অবকাঠামোগত ত্রুটি, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। আর দুর্ঘটনা ঘটলে তার কারণ অনুসন্ধান করে ভবিষ্যতে যেন তা আর না ঘটে, সে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই দায়িত্ব শেষ হচ্ছে শুধু ‘দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা’ বোর্ড লাগানোতেই।
সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের গবেষণা বলছে, সারা দেশে অন্তত ২২৯টি দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা রয়েছে। এর মধ্যে ১০৮টি স্থানকে “অতি দুর্ঘটনাপ্রবণ” এবং ১২১টি স্থানকে “সাধারণ দুর্ঘটনাপ্রবণ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা জেলায়।
অন্যদিকে হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ২৮৫টি দুর্ঘটনা প্রবণ স্থান চিহ্নিত হয়েছে। কেবল কুমিল্লা জোনেই রয়েছে ৮৭টি ব্ল্যাকস্পট, গাজীপুরে ৭১টি, সিলেটে ২০টি, বগুড়ায় ৩০টি, ময়মনসিংহে ১৬টি, খুলনায় ১৮টি এবং রংপুরে আটটি।
চিন্তার বিষয় হলো, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তালিকা করা হয়েছিল ২০১৮ সালে। তখন তারা মাত্র ৫০টি বিপজ্জনক স্থান চিহ্নিত করেছিল। অর্থাৎ সরকারি তালিকা আর বাস্তব চিত্রের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক।
ব্ল্যাক স্পট: মৃত্যুর ফাঁদ
দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকাকে আন্তর্জাতিক পরিভাষায় বলা হয় ‘ব্ল্যাক স্পট’। এক গবেষণা বলছে, মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটে এইসব ব্ল্যাক স্পটে। তবুও কার্যকর সমাধান না দিয়ে কেবল সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ঝুলিয়েই দায় শেষ করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব জায়গায় রাস্তার নকশা পরিবর্তন, বিপজ্জনক বাঁক সরলীকরণ, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, আলো ও সিগন্যাল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ছাড়া দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব নয়।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক: একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত
২০১১ সালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ঘটে ৫১৭টি দুর্ঘটনা, নিহত হন ৯৬ জন, আহত ৪২১ জন। এ দুর্ঘটনার শিকার হন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরও।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক ড. শামসুল হক ঘটনাস্থল বিশ্লেষণ করে দেখেন, সড়কের বাঁক ছিল অবৈজ্ঞানিক, রাস্তা যথেষ্ট প্রশস্ত ছিল না, দৃষ্টিসীমা ছিল গাছপালায় ঢাকা। এসব কারণে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটত।
পরবর্তীতে সেখানে সড়ক প্রশস্ত করা হয়, ডিভাইডার বসানো হয়। ফল, এখন আর তেমন দুর্ঘটনা ঘটে না। অর্থাৎ প্রকৌশলগত ত্রুটি দূর করলেই দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা
সওজের রোড ডিজাইন অ্যান্ড সেফটি সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তানভীর সিদ্দিকি বাংলানিউজকে জানান, ‘দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা চিহ্নিত হওয়ার পর কিছু অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২০১৩-১৪ সালে ব্ল্যাক স্পট রিনিউয়েবল প্রকল্পের অধীনে মহাসড়কের দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকার বেশ কিছু উন্নয়ন করা হয়। এরপর ২০১৮ সালে আরেকটি প্রকল্প নেয়া হলেও সেটি পাশ হয়নি’। অর্থাৎ ধারাবাহিক প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
অন্যদিকে এআরআই-এর পরিচালক ড. শামসুল হক বলেন, বিপজ্জনক স্থান আর দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা এক নয়। বিপজ্জনক মানে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা, আর দুর্ঘটনা প্রবণ মানে যেখানে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটে। সড়কের ব্ল্যাক স্পটের ‘ট্রিটমেন্ট’ দেওয়া বাধ্যতামূলক।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান এই বিষয়ে বাংলানিউজকে বলেন, সরকার শুধু সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে, আর কিছুই করছে না। মনে হয় মানুষের কাজ হলো সাবধানে চলা, আর সরকারের কাজ শুধু লিখে দেওয়া-এটা দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামোগত ত্রুটি প্রায় ৩০ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ। কেবল সাইনবোর্ডে দায় সেরে ফেলা দীর্ঘমেয়াদে আরও প্রাণহানি ডেকে আনে।
সুপারিশ: কী করা যেতে পারে
দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা চিহ্নিত হওয়ার পর হাইওয়ে পুলিশ, বুয়েট এআরআই ও বেসরকারি সংগঠনগুলো যে সুপারিশগুলো করেছে সেগুলোকে আরও বিস্তৃতভাবে বিবেচনা করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে।
১. সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন
• ভাঙাচোরা ও অসমান রাস্তা দ্রুত সংস্কার করা।
• ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, উঁচু-নিচু অংশ সরলীকরণ।
• আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে রাস্তার প্রস্থ, সিগন্যাল, গার্ডরেল ও ওভারপাস স্থাপন।
• রাতের জন্য পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও রিফ্লেক্টিভ মার্কিং ব্যবহার।
উন্নত দেশে রাস্তার বাঁকে স্বয়ংক্রিয় সাইনাল লাইট, রিফ্লেক্টিভ গার্ড রেল এবং ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে এ ব্যবস্থা এখনো সীমিত।
২. গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
• স্পিড ক্যামেরা, রাডার ও স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থার প্রয়োগ।
• স্কুল, হাসপাতাল ও বাজার এলাকায় স্পিড ব্রেকার বাধ্যতামূলক করা।
• সর্বোচ্চ গতিসীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ ও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন।
ইউরোপের অনেক দেশে গতি নিয়ন্ত্রণ ভঙ্গ করলে লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। বাংলাদেশে কেবল জরিমানায় সীমাবদ্ধ থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
৩. পথচারী নিরাপত্তা
• জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস তৈরি।
• ব্যস্ত এলাকায় ফুটপাত নিশ্চিতকরণ।
• স্কুল, কলেজ ও শিল্পাঞ্চল এলাকায় আলাদা পথচারী জোন।
ঢাকায় অনেক জেব্রা ক্রসিং আছে, কিন্তু ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যকর না থাকায় পথচারীরা ব্যবহার করেন না। আইন প্রয়োগে দুর্বলতাই বড় সমস্যা।
৪. আইন প্রয়োগ ও মনিটরিং
• নিয়মিত মোবাইল কোর্ট, ট্রাফিক পুলিশের নজরদারি।
• লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ।
• সড়কে সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ বাড়ানো।
ভারতের দিল্লিতে এআই-ভিত্তিক মনিটরিং ক্যামেরা ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশে এখনো সীমিত আকারে কয়েকটি সিসিটিভি চালু আছে, কিন্তু সেগুলোর ডেটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় না।
৫. সচেতনতামূলক কার্যক্রম
• গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচার, টিভি ও রেডিওতে নিরাপদ চলাচলের বার্তা।
• ড্রাইভারদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও রিফ্রেশার কোর্স।
• দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকায় তথ্যভিত্তিক বোর্ড স্থাপন, যেমন: গত ৬ মাসে এখানে কতজন নিহত-আহত হয়েছে।
নরওয়ে, সুইডেনের মতো দেশে এই ধরনের তথ্যচিত্র মানুষের মনে ভীতি জাগায়, ফলে চালকরা সাবধান হন।
৬. নীতিমালা বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা
• পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমিতির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
• চালকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও প্রশিক্ষণ।
• অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও ওভারলোডিং রোধে কঠোর শাস্তি।
বাংলাদেশে নীতিমালা থাকলেও প্রয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বলতা বড় বাধা।
ভবিষ্যৎ করণীয়
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখন আর অজুহাত চলে না।
১. দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা শনাক্তের পর অবিলম্বে প্রকৌশলগত পরিবর্তন আনতে হবে।
২. ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে গতি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি জোরদার করতে হবে।
৩. আইন প্রয়োগকারী সংস্থার স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।
৪. জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
৫. আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে সড়ক নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর কেবল “দৈব দুর্বিপাক” নয়, এটি একটি ব্যর্থতা। মানুষ প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে অথচ আমরা দায় ঠেলছি একে অপরের ঘাড়ে। সাইনবোর্ডে সাবধানবাণী লিখে কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব এড়ালেও প্রাণ হারানো মানুষের পরিবারগুলো আজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এখন সময় এসেছে কাগুজে প্রতিশ্রুতি পেরিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আইন প্রয়োগ, সচেতনতা ও জবাবদিহিতা-সবকিছু মিলেই পারে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে। মানুষের জীবনই সবচেয়ে মূল্যবান, আর সেটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।
আরকেআর/জেএইচ