ঢাকা, শনিবার, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯, ০২ জুলাই ২০২২, ০১ জিলহজ ১৪৪৩

স্বাস্থ্য

মাংকিপক্সে আতঙ্ক নয়, সতর্ক হতে হবে

ডা. কামরুল হাসান খান | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮২৯ ঘণ্টা, মে ২৭, ২০২২
মাংকিপক্সে আতঙ্ক নয়, সতর্ক হতে হবে

করোনাভাইরাসের তাণ্ডব যেতে না যেতেই বিশ্বজুড়ে মাংকিপক্সের সংক্রমণ শুরু হয়েছে।

বিস্তার বাড়ছে।

২৫ মে পর্যন্ত ২১ দেশে রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর এসেছে। এর আগেই রোগটি নিয়ে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)।

সংস্থার আশঙ্কা, বিশ্বজুড়ে রোগটির প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মাংকিপক্সের বিস্তার যাতে কমানো যায় সে বিষয়ে সামনের দিনগুলোতে তারা নির্দেশনা ও পরামর্শ দেবে।

ডাব্লিউএইচওর মতে, এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য নির্দেশ করছে, এই রোগ মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। লক্ষণ আছে এমন ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে এটি হচ্ছে।

মাংকিপক্স এমন এক সংক্রামক রোগ; যার উপসর্গ সাধারণত মৃদু। পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় এ রোগের উৎপত্তি। এটি গুটিবসন্তের জন্য দায়ী ভাইরাসের পরিবারভুক্ত। তবে গুটিবসন্তের চেয়ে লক্ষণ মৃদু। মাংকিপক্সে আক্রান্ত হলে সাধারণভাবে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় না। ১৪ থেকে ২১ দিনের মধ্যে রোগী সেরে ওঠে। কিন্তু সংখ্যাগত দিক থেকে কম হলেও মাংকিপক্স প্রাণঘাতী হতে পারে।

মাংকিপক্স যেহেতু শারীরিক সংস্পর্শে আসার কারণে ছড়ায়, তাই স্বেচ্ছা আইসোলেশন কিংবা স্বাস্থ্যবিধি মানার মাধ্যমে এটির বিস্তার সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

ডাব্লিউএইচওর সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডেভিড হেম্যান বলেন, ‘মনে হচ্ছে, এটি যৌন সংক্রমণের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে, বিশেষ করে প্রজনন অঙ্গের মাধ্যমে। এটা যৌনবাহিত রোগের মতোই সংক্রমিত হচ্ছে, যা ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। ’

মানবদেহে মাংকিপক্স প্রথম শনাক্ত করা হয় ১৯৭০ সালে জায়ারে। দেশটি এখন ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো নামে পরিচিত। সেখানে ৯ বছর বয়সী এক শিশুর এই রোগ শনাক্ত হয়। এর দুই বছর আগেই দেশটি থেকে গুটিবসন্ত বিদায় নিয়েছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০ সালের পর থেকে আফ্রিকার ১১টি দেশে মাংকিপক্স ছড়িয়ে পড়ে। দেশগুলো হচ্ছে বেনিন, ক্যামেরুন, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, গ্যাবন, আইভরি কোস্ট, লাইবেরিয়া, নাইজেরিয়া, রিপাবলিক অব কঙ্গো, সিয়েরা লিওন ও সাউথ সুদান। ২০০৩ সালে আফ্রিকার বাইরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম এই রোগ শনাক্ত হয়। মাংকিপক্সের সবচেয়ে বড় প্রকোপ দেখা দেয় নাইজেরিয়ায়, ২০১৭ সালে। সে দেশে মাংকিপক্সের প্রথম কেস ধরা পড়ার ৪০ বছর পর। এতে ১৭২ জন আক্রান্ত হয়।

মাংকিপক্সের বৈশিষ্ট্য
এই রোগ ছড়ায় মাংকিপক্স নামের এক ধরনের ভাইরাসের মাধ্যমে। বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এটি অনেকটা জলবসন্তের ভাইরাসের মতো। তবে এর ক্ষতিকারক প্রভাব কম এবং এর সংক্রমণের হারও কম। পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার নিরক্ষীয় বনাঞ্চলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। মাংকিপক্স দুই ধরনের হয়ে থাকে—মধ্য আফ্রিকান ও পশ্চিম আফ্রিকান।

ব্রিটেনে এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন যে দুই ব্যক্তি তাঁরা সম্প্রতি নাইজেরিয়া সফর করেছেন। তাঁরা সম্ভবত পশ্চিম আফ্রিকান ধরনের মাংকিপক্সে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

মাংকিপক্সের উপসর্গ
তৃতীয় যে ব্যক্তি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি একজন স্বাস্থ্যকর্মী। তিনি রোগীদের কাছ থেকে এই ভাইরাস পেয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

এই রোগের প্রাথমিক উপসর্গ হচ্ছে জ্বর, মাথা ব্যথা, হাড়ের জয়েন্ট ও মাংসপেশিতে ব্যথা এবং দেহে অবসাদ।

জ্বর শুরু হওয়ার পর দেহে গুটি দেখা দেয়। এসব গুটি শুরুতে দেখা দেয় মুখে। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে হাত ও পায়ের পাতাসহ দেহের সব জায়গায়।

এই গুটির জন্য রোগীর দেহে খুব চুলকানি হয়। পরে গুটি থেকে ক্ষত দেখা দেয়। গুটিবসন্তের মতোই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেও দেহে এসব ক্ষতচিহ্ন রয়ে যায়।

রোগ দেখা দেওয়ার ১৪ থেকে ২১ দিনের মধ্যে রোগী আরোগ্য হয়।

যেভাবে ছড়ায়
সংক্রমিত রোগীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ থেকে এই ভাইরাস ছড়ায়। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে, ত্বকের ক্ষত থেকে এবং নাক, মুখ ও চোখের ভেতর দিয়ে এই ভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশ করে।

বানর, ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, এমনকি মাংকিপক্সে আক্রান্ত রোগীর ব্যবহৃত বিছানাপত্র থেকেও এই ভাইরাস অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে।

কতটা বিপজ্জনক এই মাংকিপক্স
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই ভাইরাসের প্রভাব বেশ মৃদু। এর বৈশিষ্ট্য জলবসন্তের মতোই এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।

মাংকিপক্সের চিকিৎসা
এই ভাইরাসের কোনো চিকিৎসা নেই। তবে যেকোনো প্রাদুর্ভাবের মতোই উপযুক্ত পদক্ষেপ নিয়ে এর প্রকোপ রোধ করা যায়।

গুটিবসন্তের টিকা ৮৫ শতাংশ কার্যকর বলে দেখা গেছে।

মাংকিপক্সের জন্য এখন এই টিকাই ব্যবহার করা হচ্ছে।

মাংকিপক্স নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই

ব্যাপক হারে ছড়িয়ে না পড়লে এই ভাইরাস নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।

ইংল্যান্ডের পাবলিক হেলথ বিভাগের কর্মকর্তা ড. নিক ফিন বলেন, এটা বুঝতে হবে যে মাংকিপক্সের ভাইরাস খুব সহজে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে না।

সে কারণেই এখন পর্যন্ত মাংকিপক্স নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সতর্কতা
বাংলাদেশে মাংকিপক্সের জীবাণুর প্রবেশ ঠেকাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সব আন্তর্জাতিক বিমান, নৌ ও স্থলবন্দরে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তবে এটা নিয়ে আপাতত আতঙ্কের কিছু নেই বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এরই মধ্যে দেশের সব বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরকে এ ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অসুস্থ কোনো ব্যক্তি কিংবা সন্দেহভাজন কেউ নজরে এলে তাকে শনাক্ত করে আইসোলেশনে নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত তাকে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতে বলা হয়েছে। মাংকিপক্স ঠেকাতে ভারতের বিমানবন্দরগুলোতে আগাম সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

তবে আমাদের সবার সতর্কতাই মাংকিপক্সকে দূরে রাখতে পারে এবং এর বিস্তারে বাধা হয়ে থাকবে। যেকোনো রোগই আমাদের কিছু না কিছু ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তা যত মৃদুই হোক না, সে সুযোগটা যেন না দিই।

লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa