ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২১ মে ২০২৪, ১২ জিলকদ ১৪৪৫

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য

তীব্র কাঁটায় সুরক্ষিত সুস্বাদু বিরল ফল ‘লুকলুকি’

বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন, ডিভিশনাল সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৩২৩ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৭
তীব্র কাঁটায় সুরক্ষিত সুস্বাদু বিরল ফল ‘লুকলুকি’ গাছে ঝুলে আছে কাঁচা-পাকা বিরল লুকলুকি, ছবি : বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন

মৌলভীবাজার: দুর্লভ গাছের সন্ধানে বুনো প্রকৃতি-ভ্রমণ বৃথা যায়নি। তবে প্রথম দিনই যে তার সফলতা মিলেছে, এমনটি আসলে নয়। একাধিক দিন গভীর বনের পথে পথে জোঁকের সঙ্গী হয়ে ব্যস্ত রাখতে হয়েছে খুঁজে বেড়ানো চোখ আর চরণযুগলকে। তার বহু পর এসেছে বহু প্রতীক্ষিত মাহেন্দ্রক্ষণটি।

শত গাছের ভিড়ে বিরল ‘লুকলুকি’ নিজেকে আড়াল করে রেখেছে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ‘লুকলুকি’ থাকার কথা বহু আগেই শুনেছি গবেষকদের মুখে।

তবে নিজের চোখে দেখা ওঠেনি এতোকাল। অবশেষে সম্প্রতি তার দেখা পেলাম।  

বৃক্ষপ্রেমী ইউনুস মিয়া বরাবরই আশাবাদী মানুষ। ‘লুকলুকি’ ফলের নামটি শুনেই তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। ঢোঁক গিলে বলেন, লাউয়াছড়ায় যেখানে গাছটি আছে, চলুন সেখানে আপনাকে নিয়ে যাবো।

বিরল ফল দেখার স্বপ্ন নিয়ে সঙ্গী হলাম তার। আকাবাঁকা টিলার পথ; সেই সাথে আগের রাতে তুমুল বৃষ্টি সহ্য করা লাউয়াছড়ার পাহাড়ি মাটি অনেকটাই বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। পিছলে পড়ার ভয় কিছুটা কাজ করছে মনে।  
তারপর একসময় কাঙ্ক্ষিত বিরল ফলদ বৃক্ষটির দেখা পেলাম: ‘এই দেখুন স্যার! লুকলুকি গাছ। ’ 

ইউনুস মিয়ার কণ্ঠ তখন কিছুটা আবেগাপ্লুত। ‘এর গায়ে এতো কাঁটা?’ -এই প্রশ্নে উত্তরে তিনি বললেন, ‘ফলটি সুস্বাদু তো! তাই কাঁটা দিয়ে নিজেকে চেক দিয়ে (সুরক্ষা দিয়ে) রাখে। ’  
বিরল লুকলুকি গাছের শরীরজুড়ে বড় বড় কাটা, ছবি: বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
লুকলুকি অম্ল-মিষ্টি স্বাদযুক্ত বুনো ফল। ইংরেজি নাম Flacourtia। বৈজ্ঞানিক নাম Flacourtia jangomes। ‘টেপা’ এ ফলের অনিবার্য ও চূড়ান্ত নিয়তি বলে ‘টেপাফল' বা ‘টিপফল' নামেই এর পরিচিতি ব্যাপক। লুকলুকি মাঝারি আকারের বৃক্ষ। সারা শরীরজুড়ে বড় বড় কাঁটা ছড়ানো।  

গাছে কাঁচা অবস্থায় ফলটি সবুজ থাকে। পাকলে ফলের রং লালচে বেগুনী হয়ে যায়। ফলের অভ্যন্তরভাগে শাঁসের রং গোলাপী সাদা বা হালকা বাদামী। খোসাসহ পুরো ফল খাওয়া যায়। তবে ফলটির পূর্ণ স্বাদ পেতে হলে খাওয়ার আগে টিপে টিপে ওকে মারতেই(নরম করতেই) হবে। পাকা ফল হাতের তালুতে নিয়ে লাড্ডুর মতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বা টিপে যত নরম করে খাওয়া যায় ততই সুস্বাদু ও মিষ্ট লাগে বলে জানান এক লুকলুকি ফলপ্রেমী।  

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অজিত কুমার পাল বলেন, লুকলুকির গাছটা অদ্ভুত ধরনের। ওর গোড়া থেকে মোটা কাণ্ডের সারা গা ভরে থাকে বড় বড় কাঁটায়। এর কাঁটাগুলো যূথবদ্ধ। তাই কাণ্ড বেয়ে গাছে ওঠা ও ফল পাড়ার কথা কেউ চিন্তাই করে না।  
কাঁচা বিরল লুকলুকি গাছে ঝুলে আছে, ছবি : বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপনতিনি আরো বলেন, লুকলুকির গাছ খাটো থেকে মাঝারি আকারের বৃক্ষ। উচ্চতায় ৪-৫ মিটার হয়। ডালপালাও কাঁটাপূর্ণ। পাতা একক, ডিম্বাকৃতি, তবে কিছুটা লম্বাটে গড়নের। অগ্রভাগ সূঁচালো। সবুজ রংয়ের পাতা কিছুটা ঢেউ খেলানো। কিনারা সামান্য খাঁজ কাটা।  

মার্চ-এপ্রিল মাসে ফুল আসে। মুদ্রাকৃতির বেগুনী রংয়ের ফুল ফোটে গুচ্ছাকারে, ছড়ায়। ফল গোলাকার মার্বেলের মতো। খোসা খুব পাতলা ও মসৃণ। কাঁচা ফলের রং গাঢ় সবুজ। কাঁচা ফলও খাওয়া যায়। ফল পাকে জুলাই-আগস্ট মাসে। পাকা ফলের সংরক্ষণ গুণ ভালো বলে জানান কৃষি কর্মকর্তা।  

পুষ্টিগুণ সম্পর্কে অজিত কুমার পাল বলেন, লুকলুকি ফলটি টিপে খাওয়া যায় এবং জুস তৈরি করেও খাওয়া যায়।
প্রতি ১০০ গ্রামে পুষ্টি উপাদান হলো: খনিজ পদার্থ (গ্রাম) ০.৩৯, হজমযোগ্য আঁশ ২.৩, খাদ্যশক্তি (কিলোক্যালরি): আমিষ (গ্রাম) ১.১, শর্করা (গ্রাম) ২৪, ক্যালসিয়াম (মিলিগ্রাম) ২৪, লৌহ (মিলিগ্রাম) ১.২, ভিটামিন বি১ (মিলিগ্রাম) ১.২, ভিটামিন বি২ (মিলিগ্রাম) .২, ভিটামিন সি (মিলিগ্রাম) ৮৫।
কাঁচা-পাকা বিরল লুকলুকি, ছবি : বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন শ্রীমঙ্গল শহরের ফলবিক্রেতা সালাম বলেন, লুকলুকির চাহিদা এক সময় খুব একটা না থাকলেও মানুষ এখন এই ফলসহ অন্যান্য দেশি ফল কিনে খাচ্ছেন। খুচরা প্রতি কেজি লুকলুকি ২শ’ টাকা এবং একশ’ গ্রাম লুকলুকি ২০ টাকা দরে বিক্রয় করছেন বলে জানান।  

বাংলাদেশ সময়: ০৯১০ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৭
বিবিবি/জেএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।