ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আষাঢ় ১৪২৯, ০৫ জুলাই ২০২২, ০৫ জিলহজ ১৪৪৩

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

হালদায় ডিমের পরিমাণ কমে যাওয়ার নেপথ্যে ৭ কারণ

সৈয়দ বাইজিদ ইমন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১২১১ ঘণ্টা, মে ১৬, ২০২২
হালদায় ডিমের পরিমাণ কমে যাওয়ার নেপথ্যে ৭ কারণ ...

চট্টগ্রাম: হালদা। এটি পৃথিবীর একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী, যেখান থেকে সরাসরি রুই জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়।

অর্থনৈতিকভাবে হালদা নদী বাংলাদেশের সাদা সোনার খনি! জাতীয় মৎস্য প্রজনন ঐতিহ্যের দাবিদার নদীটি অবহেলিত, দূষণযুক্ত নদীতে পরিণত হয়েছে। সাতটি প্রতিবন্ধকতার কারণে মা মাছের ডিমের পরিমাণও কমে যাচ্ছে।

অমাবস্যা বা পূর্ণিমা তিথিতে বজ্রসহ প্রচুর বৃষ্টিপাত, উজানের পাহাড়ি ঢল, তীব্র স্রোত, ফেনিল ঘোলা পানিসহ নদীর ভৌত-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বিত ক্রিয়ায় হালদা নদীতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। হালদার সঙ্গে সংযুক্ত নদীগুলো থেকে এখন বিশেষ করে কর্ণফুলী থেকে মাইগ্রেট করে প্রজননের জন্য হালদা নদীতে আসে মাছ। প্রজনন শেষে আবার আগের আবাসিক নদীতে ফিরে যায়।  

কিন্তু অবিরত দূষণ, কুম ভরাট, ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলন, রাবার ড্যাম, বাঁক কাটা, বেড়িবাঁধ, স্লুইসগেইট, দখল-বেদখলসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে হালদা নদী।  

রাবার ড্যাম

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভূজপুর এলাকায় হালদা নদীর ওপর তৈরি করা হয় একটি রাবার ড্যাম (বাঁধ)। এছাড়াও ভূজপুর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে হারুয়ালছড়ি খালে আরেকটি রাবার ড্যাম। এ দুটি রাবার ড্যামের কারণে এখন বছরে চার মাস হালদার উজানের অন্তত ৬ কিলোমিটার প্রায় পানিশূন্য অবস্থায় থাকে। এতে নদীর পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ক্ষতির পাশাপাশি হালদার জীববৈচিত্র্যও হুমকিতে পড়ছে। হালদায় দিনে দিনে মাছের সংখ্যা ও মাছের ডিম ছাড়ার পরিমাণ কমে যাওয়ার পেছনে এই বাঁধ দু’টিকে দায়ী করছেন গবেষকেরা। ফটিকছড়ি উপজেলার পূর্ব ভূজপুর এলাকায় হালদা নদীর উজানে ২০১২ সালের মার্চ মাসে রাবার ড্যাম উদ্বোধন করা হয়। পরের বছর হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের হারুয়ালছড়ি খালেও রাবারের বাঁধ দেওয়া হয়। বাঁধের কারণে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় জলজ প্রাণের খাদ্য তৈরিতে অন্তরায় তৈরি করছে।

তামাক চাষ

তামাক চাষের কারণে দূষিত হচ্ছে দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদী। যার কারণে ডিম ছাড়ার পানির নাব্যতা হারিয়ে যাচ্ছে। অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছে না মা মাছ। হালদ নদীর উৎপত্তিস্থল খাগড়াছড়ি জেলার রামগড়, মানিকছড়িসহ পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে নদীটির দুই তীরে দীর্ঘদিন ধরে তামাক চাষ হচ্ছে। তামাকের নির্যাস ও চাষে ব্যবহৃত সার এবং রাসায়নিক মিশ্রিত পানি সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদীতে। এই নদীর উৎপত্তি খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার হালদাছড়া থেকে। রাসায়নিক দূষণ হালদার জলজ প্রাণীর জন্য হুমকি। বর্ষার শুরুতে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে তামাকের মূল এবং পচা তামাক পাতা গিয়ে পড়ে নদীতে। এতে পানি দূষিত হয়। আবার দূষণটাও হয় মাছের প্রজনন মৌসুমে।

কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য

অবিরত দূষণ, ভরাট, দখল-বেদখলসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী। নিকটবর্তী আটটি প্রতিষ্ঠানের কারণে মূলত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে হালদা নদীর মৎস্য প্রজনন। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনও কার্যকর তরল বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) না থাকায় কারখানার তরল বর্জ্য এবং গৃহস্থালির বর্জ্যের মাধ্যমে দূষিত হচ্ছে হালদা। নদীর সঙ্গে সংযুক্ত বিভিন্ন খাল ও ছোট ছোট ছড়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে এ দূষণ। সিডিএর অন্যান্য আবাসিক এলাকার মাধ্যমে চট্টগ্রাম সিটি এলাকার যে বর্জ্য বামনশাহী, কুয়াইশ ও খন্দকিয়া খাল হয়ে হালদা নদীতে পড়ছে, তা যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে নদী ৭০ থেকে ৮০ ভাগ দূষণমুক্ত হবে।

নদীর বাঁক কাটা

নদীর ১৯টি স্থানে বাঁক সমান করে ফেলায় মাছের বিচরণ ও প্রজনন কমে গেছে। বাঁক না থাকায় প্রাকৃতিকভাবে কোনও কুম (নদীর তলদেশে গভীর খাদ, যেখানে আগে মা মাছেরা ডিম ছাড়তো) তৈরি হচ্ছে না। উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ায় এখন মা মাছেরা নমুনা ডিম ছাড়ার পর, আর কোনও ডিম ছাড়ছে না। ফলে দিন দিন নদীতে মা মাছের ডিম ছাড়ার হার কমছে। এর বাইরে কিছু কিছু জায়গায় জেগে ওঠা চর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে।

স্লুইস গেইট

হালদা নদীতে স্লুইসগেইট নির্মাণের কারণে শাখা নদীতে মা মাছ প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। যার কারণে মা মাছ শাখা নদীতে গিয়ে নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারছে না। যে গেইটগুলো নির্মাণ করা হয়েছে সবগুলো ছোট। শাখা নদী থেকে পানি আর মা মাছ আসতে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ গেইট তৈরির কারণে হালদার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেখানে কোন চাষ হচ্ছে না। মা মাছ যখন ডিম ছাড়ে তখন দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন তারা ডলফিনের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য শাখা নদীতে প্রবেশ করে৷ কিন্তু স্লুইস গেইট তৈরিতে শাখা নদীতে মা মাছ প্রবেশে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। ভরাট হয়ে যাচ্ছে খালগুলো। স্লুইস গেইট করলেও করা হয়নি স্লুইস ব্যাংক।

কুম ভরাট

হালদায় মা মাছ ডিম ছাড়ে নদীর কুমগুলোতে (গভীর এলাকা)। নদীর অঙ্কুরিঘোনা থেকে রামদাশ হাট পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার এলাকায় রয়েছে এসব কুম। কিন্তু নদীর পাড় রক্ষা ও ভাঙন রোধে এসব কুমের মধ্যে জিও ব্যাগ ফেলায় অনেকটা ভরাট হয়ে গেছে। ফলে প্রজনন মৌসুমে এসব কুমে পানির স্রোত কমে গেছে। যে কারণে মা মাছ এখানে ডিম ছাড়বে না বলে আশঙ্কা করছেন ডিম সংগ্রহকারী ও গবেষকরা। আগে কুমগুলোর গভীরতা ছিল ১০০ হাত। আর এখন সে কুম ভরাট হয়ে ২০ হাতে চলে এসেছে। মা মাছের আশ্রয়কেন্দ্র হলো এ কুমগুলো। কুমগুলো নষ্ট আর ভরাট হওয়ার কারণে মা মাছ তাদের আশ্রয়স্থল হারাচ্ছে। তাই ডিম সংগ্রহও কম হচ্ছে। অনুকূল পরিবেশ না পেলে মা মাছ ডিম ছাড়ে না।

বেড়িবাঁধ নির্মাণ

শাখা নদী, খাল ও পুকুর থেকে কিছু মাছ নদীতে আসতো। কিন্তু বেড়িবাঁধ নির্মাণের কারণে সে মাছগুলো হালদা নদীতে প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। স্লুইস গেইট তৈরি করলেও স্লুইস ব্যাংক তৈরি না করাতে মা মাছ শাখা নদীতে আসা যাওয়ার পথে বাধা তৈরি হয়েছে। বৃষ্টিতে পানির ঢলেও কিছু মাছ আসত। বেড়িবাঁধের কারণে সে মাছগুলো স্লুইস গেইট ছোট হওয়ার কারণে প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা নদী বিশেষজ্ঞ ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বাংলানিউজকে বলেন, ‘জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য পানিতে যে পরিমাণ অক্সিজেন থাকা প্রয়োজন, আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি, দূষণের কারণে হালদার পানিতে এখন সেই পরিমাণ অক্সিজেন নেই। উল্টো পানিতে প্রচুর পরিমাণে অ্যামোনিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। শুধু কারখানার বর্জ্যই নয়, নদীর গতিপথে বিভিন্ন রকমের বাধা-বিপত্তি, রাবার ড্যাম, ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলনের কারণে দিন দিন হালদা নদী মাছ শূন্য হয়ে যাচ্ছে। ’ এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই নদীটি তার স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।  

হালদা পাড়ের বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন ধরে ডিম সংগ্রহকারী কামাল সওদাগর বাংলানিউজকে বলেন, এক সময়ের সোনার খনি হালদা নদী নানা কারণে ধ্বংসের মুখে পড়েছে। যার মধ্যে রাবার ড্যাম, তামাক চাষ, নদীর বাঁক কাটা, স্লুইস গেইট নির্মাণ, বেড়িবাঁধ তৈরি অন্যতম।

বাংলাদেশ সময়: ১১৫০ ঘণ্টা, মে ১৬, ২০২২
বিই/এসি/টিসি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa