ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২৩ মে ২০২৪, ১৪ জিলকদ ১৪৪৫

উপকূল থেকে উপকূল

উপকূল থেকে উপকূল

স্বস্তি ফিরছে ভয়ের জনপদ ঢালচরে!

রফিকুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৪১৫ ঘণ্টা, অক্টোবর ১২, ২০১৪
স্বস্তি ফিরছে ভয়ের জনপদ ঢালচরে! ছবি : বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ঢালচর, মনপুরা, ভোলা ঘুরে এসে: প্রায় তিরিশ বছর ঢালচরে থেকে অনেক নির্যাতন সহ্য করেছেন চাষি মহিউদ্দিন। দস্যুদের ভয়ে কখনো ছুটে পালিয়েছেন।

তারপরও  ৫-৬ বার দস্যুদের হামলায় সর্বস্ব হারিয়েছেন তিনি।

বাড়িতে ঢুকে সবাইকে বেঁধে লুণ্ঠন করেছে সব অলঙ্কার। বাদ যায়নি গরু-মহিষও। কিন্তু দুর্গম চরের এই চাষি এবার আমন ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।

একইভাবে চরের বাসিন্দা ছকিনা বিবি জানাচ্ছিলেন রাতে দস্যুদের ভয়ে জঙ্গলে গিয়ে লুকানোর কথা। তার বর্ণনায় যে কেউ ভয়ে কেঁপে উঠবে। দীর্ঘদিন ধরে এই চরে ভয়-আতংকের মধ্যে বসবাস করে আসছিলেন বহু মানুষ।

রাতে নারী-পুরুষ ও শিশুরা দলে দলে ছুটতেন বনের গহীনে। যেখানে গেলে দস্যুরা আর পাবে না। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢালচরে আছে ছকিনার মতো অনেক নারী।

এটা ভোলার মনপুরার ঢালচর। চারদিকে দস্যুদের আস্তানা থাকার কারণে এই চর ছিল দস্যুদের নজরে। বর্ষাকাল কিছুটা নিরব থাকলেও চরের ধান পাকতে শুরু করলেই একের পর এক দস্যু বাহিনী হামলা করতো এখানে।

শ্রম আর অর্থের বিনিময়ে চাষিরা জমি আবাদ করলেও ধান উঠতো দস্যুর গোলায়। একশ্রেণির জোতদার চাষির ধান কেটে নেওয়ার অপেক্ষায় থাকতো মাসের পর মাস।

ঢালচরের চাষি মহিউদ্দিন, আবদুল হক, আবদুল মান্নানসহ আরও অনেকে সবুজ ক্ষেতে ধানের শীষের দোল খাওয়া দেখে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন। কবে ধানের শীষগুলো সোনালি হয়ে উঠবে, আর কবেই বা ধান উঠবে গোলায়।

আবার ধান কাটার আগে দস্যু হানা দেবে কিনা, সে ভয়ও আছে। তবে এবার চরে কোস্টগার্ড আসায় বাসিন্দাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।

সূত্র বলছে, কোস্টগার্ড এই চরে ‘কোস্টাল ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার’ স্থাপন করছে। সংক্ষেপে যাকে সিসিএমসি বলা হয়। এজন্য আট একর জমি কোস্টগার্ডকে দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা কামাল উদ্দিন চৌধুরী।

এরইমধ্যে জমির দলিলপত্র সম্পন্ন হয়েছে। ভবন নির্মাণের কাজও প্রক্রিয়াধীন। প্রাথমিক কার্যক্রম হিসেবে ঢালচরে কোস্টগার্ডের একটি দল অবস্থান করছে। তারা সার্বক্ষণিক পাহারায় রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করেছে, ঢালচরে কোস্টগার্ডের সিসিএমসি স্থাপনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে দস্যু ও জোতদার বাহিনী। এখানে যাতে সিসিএমসি স্থাপন না হতে পারে, সেজন্যে রাজনৈতিকভাবেও চেষ্টা-তদবির চলছে বলে দাবি করেছেন অনেকে।

তবে ভোলার খেয়াঘাটে অবস্থিত কোস্টগার্ডের দক্ষিণ জোন সূত্রের দাবি এমন কোনো অপতৎপরতার খবর তাদের জানা নেই। সিসিএমসি স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলেছে।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও প্রশাসন থেকে অনেক দূরে অবস্থানের কারণে এই জনপদে দস্যুদের অবাধ বিচরণ ছিল। ধানের মৌসুমে জোতদার আর দস্যুরা মিলে সাধারণ চাষিদের জমির ধান লুট করে নিয়ে যেত।

রামগতি, কেয়ারিং চর, হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপসহ মেঘনার ওপরের দিকে এসে নির্জন জনপদে হানা দিত দস্যুরা।

কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের চিফ স্টাফ অফিসার কমান্ডার ক্বামীল আলম বাংলানিউজকে বলেন, মেঘনা অববাহিকা ও সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলের জেলেদের নিরাপত্তা ও এই অঞ্চলের বাণিজ্য নির্বিঘ্ন করতেই কোস্টগার্ড ঢালচরে সিসিএমসি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে দস্যুদের বিরুদ্ধে অপারেশন চালানো সম্ভব হবে। এই সেন্টার দস্যু দমনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবে।

তিনি বলেন, ঢালচরে সিসিএমসি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। জমির দলিল সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সেখানে ভবন নির্মাণসহ অন্যান্য কার্যক্রম শুরু হবে। এরইমধ্যে ঢালচরে কোস্টগার্ডের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে সার্বক্ষণিক অবস্থানকারী আটজনের একটি দলে একজন কন্টিজেন্স কমান্ডার ও সাতজন নাবিক রয়েছে। ভবন নির্মাণের জন্য মাটি পরিক্ষার কাজ সম্পন্ন।

কোস্টগার্ডের এই কর্মকর্তা বলেন, ঢালচরে সিসিএমসি স্থাপিত হলে এই দুর্গম অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। জেলে ও ব্যবসায়ীদের মাঝে ফিরে আসবে স্বস্তি। চরের পাকা ধান লুট করতে পারবে না জোতদারেরা। দস্যুদের ভয়ে মানুষদের আর বনে গিয়ে আশ্রয় নিতে হবে না।    

সূত্র বলছে, সিসিএমসিতে কোস্টগার্ডেও ৩০ জনের বেশি জনবল স্থায়ীভাবে অবস্থান করেন। এরা দস্যুদের বিরুদ্ধে অপারেশনের পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবেলায়ও স্থানীয় মানুষদের সহায়তা দেবে। উপকূল অঞ্চলের নিজাপুর, বরিশাল, পাথরঘাটায় এ ধরনের সেন্টার কাজ করছে। লক্ষ্মীপুর, রামগতি, তজুমদ্দিন ও সুদুরচরে ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে ঢালচর ও হাতিয়ায় ভবন নির্মাণ হবে।  

দুর্গম জনপদের মানুষের নিরাপত্তা বিবেচনায় রেখে কোস্টগার্ডের সিসিএমসি নির্মাণের জন্য বিনামূল্যে জমি দিয়েছেন ডেমপিয়ার কৃষি ও ডেইরি ফার্মের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কামাল উদ্দিন চৌধুরী। ফার্মের জমি থেকে তিনি এ জমি দান করেন।

কামাল উদ্দিন চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, এটা একটা সম্ভাবনাময় জনপদ। এখানকার উর্বর জমিতে ফলতে পারে তিন ফসল। আবাদ করেই দারিদ্র্য মানুষের অবস্থা বদলাতে পারে। কিন্তু দস্যুদের আনাগোনা বহু বছর ধরে এ চর অশান্ত করে রেখেছে। দুর্গম জনপদে স্বস্তি ফেরাতেই কোস্টগার্ড এখানে সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। আমি তাদেরকে একটু সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি।   

তিনি বলেন, বেশকিছু দিন ধরে কোস্টগার্ড এখানে অবস্থান করায় মানুষের মাঝে স্বস্তি এসেছে। চরের জমিতে অধিক শ্রম-ঘামে ফলানো ফসল এবার তারা ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখছে।  
                                  
[ পশ্চিমে সাতক্ষীরা, পূর্বে টেকনাফ, উপকূলের এই ৭১০ কিলোমিটার তটরেখা বেষ্টিত অঞ্চলে সরেজমিন ঘুরে পিছিয়ে থাকা জনপদের খবরাখবর তুলে আনছে বাংলানিউজ। প্রকাশিত হচ্ছে ‘উপকূল থেকে উপকূল’ নামের বিশেষ বিভাগে। আপনি উপকূলের কোন খবর বাংলানিউজে দেখতে চাইলে মেইল করুন এই ঠিকানায়: [email protected] ]

বাংলাদেশ সময়: ০৪১৫ ঘণ্টা, অক্টোবর ১২, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।