[x]
[x]
ঢাকা, শুক্রবার, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
bangla news
কুয়েত থেকে জাহিদুর রহমান

ভালো নেই মরু জাহাজের নাবিকরা

|
আপডেট: ২০১৫-১২-১৯ ৯:১৯:০০ পিএম
ছবি : বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি : বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

দূর মরুভূমিতে কুঁজোঘাড় উঁচু করে ছুটে বেড়ানো উটগুলোকে কাছে থেকে দেখলে মনে হয় যেন এক একটা ক্ষুদে ডাইনোসর! তেজি,তাগড়া উটের চিৎকার আর চেঁচামেচি তখন শান্ত উটগুলোর চেহারায় এনে দেয় ভিন্নতা।

ওয়াফরা (কুয়েত) থেকে: দূর মরুভূমিতে কুঁজোঘাড় উঁচু করে ছুটে বেড়ানো উটগুলোকে কাছে থেকে দেখলে মনে হয় যেন এক একটা ক্ষুদে ডাইনোসর! তেজি,তাগড়া উটের চিৎকার আর চেঁচামেচি তখন শান্ত উটগুলোর চেহারায় এনে দেয় ভিন্নতা। কখন যে মেজাজ খারাপ করে তেড়ে এসে একটা কিছু ঘটিয়ে দেয়- সেই অনিশ্চয়তাই যেন নিয়মিত আর নিশ্চিত চিন্তার বিষয় এখানে।

তপ্ত মরুর বুকে এদের লালন পালন আর পরিচর্যার কাজটিই করেন বহু বাংলাদেশি। বেতন খুবই সামান্য।বাংলাদেশি টাকায় বড়জোড় ১৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার।

দিনের তীব্র উত্তাপ আর রাতের হাড় কাপাঁনো ঠান্ডা। এই পরিবেশেই বেদুঈন জীবন যাপন করছেন বহু বাংলাদেশি।তবে তাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই।জীবন আর জীবিকার তাগিদে অমানুষিক কষ্টের বিনিময়েই খরচের অবশিষ্ট টাকা পাঠান দেশে। প্রিয়জনের মুখে হাসি ফোটাতে। অথচ প্রতিদিন কি নিদারুন কষ্টই না করতে হয় এই প্রবাসীদের।নিজের চোখে না দেখলে তা বিশ্বাস হবার নয়।

দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমির গভীরে গেলে কোথাও চোখে পড়ে ভ্রাম্যমাণ বাড়ির মতো বেশ কিছু ক্যারাভ্যান। শহর থেকে আসা কুয়েতি খামার মালিকরা সপ্তাহের ব্যস্ততা ছাপিয়ে তপ্ত মরুতে এলে এখানেই বিশ্রাম করেন।

ক্যারাভ্যানগুলোর সামনে পাইপের বেষ্টনী দিয়ে বিশাল জায়গা জুড়ে উটের খামার। বেয়াড়া আর বিশালাকৃতির উটদের জন্যে আলাদা বেষ্টনী।উট শাবকদের জন্যেও বাড়তি সর্তকতা। রয়েছে আলাদা খোয়াড়। আর এদের খাবার পরিবেশন,দুধ দহন,মলমূত্র পরিস্কার,গোসল,যত্নআত্তি সবকিছুই করতে হয় এই বাংলাদেশিদের।

সেই হিসেবে বাঁধা ধরা শ্রমঘণ্টা নয়।বরং উদয়অস্ত। কখনো বা দিনরাত সমান।

‘মরু প্রাণী উটকে আদর করে ডাকা হয় মরুর জাহাজ। তাহলে আমরা যারা এদের পরিচালনা করি তারা তো নিঃসন্দেহে নাবিক’- মরুর বুকে কুঁজ শানিত করে সশব্দে ছুটোছুটি করা উটের পাল সামলে এসে বাংলানিউজের কাছে সর্গবে এই কথাই বলছিলেন মানিকগঞ্জের আব্দুল মজিদ (৪৮)।

মাথার ওপর তীব্র সূর্য্যের কিরণ। তপ্ত মরুভূমিতে বেয়ারা উটগুলোকে বাগে আনতে আনতে ঘামে ভিজে গেছে শরীর ।রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে গায়ের রঙ। উষ্কখুষ্কু মাথার চুল।

‘ভাই আপনি বাংলাদেশ থেকে আইছেন। কি বললেন? বাংলানিউজ! আমাদের কথা তুইল্যা ধরবেন। দেখতেছেনই তো। কি আর তুইল্যা ধরবেন। আমাগো জীবনটাই তো এমন’-এভাবেই একটানা বলে যান আব্দুল মজিদ।

মানিকগঞ্জের দৌলতপুর থানার রৌহা ফুলসিংহ গ্রামের আব্দুল মোতালেব খানের ছেলে।কুয়েতে এসেছেন প্রায় দশ বছর।খরচ হয়েছিলো পৌনে দুই লাখ টাকা।থাকা খাওয়া মালিকের।শুরুতে বেতন ছিলো মাত্র ২০ কেডি (কুয়েতি দিনার)। বাংলাদেশের মুদ্রা মানে মাত্র ৫ হাজার। দশ বছরে বেড়ে এখন বেতন ১’শ কেডি।বাংলাদেশি টাকায় মাত্র ২৫ হাজার।

হিসেবটা খুবই সোজা। অভিবাসন ব্যয় তুলতে এক কথায় বিনা মাইনেতেই তাকে খাটতে হয়েছে প্রায় তিন বছর।

অর্থাৎ তিন বছর ধরে অমানুষিক পরিশ্রম করে যে টাকা উপার্জন করেছেন তা দিয়ে শোধ করতে হয়েছে অভিবাসন ব্যয়ের টাকা।

এই যখন অবস্থা তখন কেন এত টাকা খরচ করে মরুভূমির বুকে আসা?

‘ভাইরে দ্যাশেও শান্তি নাই। আইস্যা দেখলাম। এইহানেও শান্তি নাই। কি করুম। কিছু করনের নাই। আমাগো নিয়তি।

কত্তো কই বেতন বাড়ান। হুনে না (শোনে না) পাসপোর্ট রাইখ্যা দিছে। ফেরত ও দেয়না। কয়,পাসপোর্ট নিলে সোজা দ্যাশে যাওন লাগবো। আমাগো কষ্ট আর দু:খ দ্যাখনের কেউ নাই রে ভাই’

বুকভরা কষ্ট নিয়েই একটানা কথাগুলো বলে যান আব্দুল মজিদ।

মজিদের সাথেই কাজ করেন বরিশালের আলী হোসেন।তাঁর কথা জানতে চাইলাম। অল্প দূরত্বে ছিলেন উটের খামারের কুয়েতি মালিক।পাছে কাজে গাফলতি হয়।এই ভয়ে কথা বলতে নারাজ। আবার সুদূর বাংলাদেশ থেকে এই মরুভূমিতে তাদের কষ্টের কথা শুনতে এসেছি। এটা জেনে কথা বলতেও ইচ্ছুক। এমন দ্বিধা দেখে নিজেই ছুটতে থাকি আলী হোসেনের পেছনে।আলী হোসেন তখন ছুটছেন উটের পেছনে।

একটা উট সামলে খোয়াড়ে তুলছেন তো আরেকটা অন্য উটকে গুতোঁ দিয়ে চলে গেছে খোয়াড়ের বাইরে।এই পরিস্থিতির মধ্যেই কথা হয় আলী হোসেনের সাথে।

বাংলানিউজকে তিনি জানান,অনেক বাংলাদেশিই ৮/১০ বছর ধরে এখানে কাজ করে এখন রোজগার করেন দুই থেকে আড়াই’শ কুয়েতি দিনার। তবে আমরা বছর ভেদে এখন পাই ৭০ দিনার। এই দিয়ে তো নিজেরই হয় না। আবার এখানকার নিয়ম কানুন ও বেশ কঠিন। আমি যে মালিকের অধীনে আছি সেই মালিক ছাড়া অন্য কোথাও কাজ-ও করার সুযোগ নেই।

কুয়েতিরা এটা করেছে এই কারণে যে ভালো না লাগলেও যাতে আমরা অন্যত্র কাজ করতে না পারি।যোগ করেন আলী হোসেন।

এ ব্যাপারে কথা হয় কুয়েতে বাংলাদেশ কমিউনিটির সভাপতি শহিদ ইসলাম পাপুলের সাথে।বাংলানিউজকে তিনি জানান,মূলত এই শ্রমিকদের ঘামে ভেজা টাকাই পাঠানো হয় বাংলাদেশে। তিনি বলেন,যারা পেশাদার ভিসায় এখানে আসেন তারা নিজেরা গাড়ি বাড়ি করা চেষ্টা করেন। যার কারণে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণে তাদের ভূমিকা গৌন। আবার যারা উচুঁ দরের ব্যবসায়ী । তারা দুবাই,লন্ডন বা আমেরিকায় বাড়ি কেনেন। দেশে তারাও খুব বড় একটা বিনিয়োগ করেন না।

এই খেটে খাওয়া মানুষদের শ্রম আর ঘামে ভেজা টাকায় রেকর্ড হয় বৈদেশিক মু্দ্রার রির্জাভের।

তবে বাংলাদেশ কি এদের কথা ভাবে?

উল্টো উত্তরটা ছুঁড়ে দেন কুয়েতে বাংলাদেশ কমিউনিটির সভাপতি শহিদ ইসলাম পাপুল।।

বাংলাদেশ সময়: ০৮১৯ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২০,২০১৫
আরআই

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

প্রবাসে বাংলাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa