bangla news
সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি শ্রমিক

বাড়িতে ভালো আছে শুনলে আর কষ্ট লাগে না

6333 |
আপডেট: ২০১৪-১০-৩১ ১:২১:০০ এএম
ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

রুমটার আয়তন ২৪ থেকে ৩০ বর্গফুটের মধ্যে। দু’টি দ্বিতল বিছানা। নিচের বিছানায় সোজা হয়ে বসতে চাইলে উপরেরটা চাপ দিয়ে রাখে। বিছানার পেছনে চাপা পড়েছে রুমের ছোটো জানালা। কারখানার চিমনির এয়ারকুলারের মতো দু’টি ফ্যানের বাতাস বদ্ধ রুমটাকে আরো তাঁতিয়ে তুলেছে।

সিঙ্গাপুর থেকে: রুমটার আয়তন ২৪ থেকে ৩০ বর্গফুটের মধ্যে। দু’টি দ্বিতল বিছানা। নিচের বিছানায় সোজা হয়ে বসতে চাইলে উপরেরটা চাপ দিয়ে রাখে। বিছানার পেছনে চাপা পড়েছে রুমের ছোটো জানালা। কারখানার চিমনির এয়ারকুলারের মতো দু’টি ফ্যানের বাতাস বদ্ধ রুমটাকে আরো তাঁতিয়ে তুলেছে।

এখানেই বাস করে সিঙ্গাপুরের ইংরেজি বলা বাঙালি শ্রমিকেরা। সিঙ্গাপুরের প্রচলিত ভাষায় কথা বলতে গিয়ে শ্রমিকেরা বেশ ভালোই ভাঙা ভাঙা ইংরেজি রপ্ত করেছে। গেলাংয়ের ৮ নম্বর রোডের এই বাসায় ৪ বাংলাদেশি শ্রমিক বাস করেন। অন্য রুমগুলোতে রয়েছে ভারতীয়রা।

ঝকঝকে শহর সিঙ্গাপুরের চোখ ঝলসানো আলোর নিচে এক নোংরা স্যাঁতস্যাতে সিঁড়ি বেয়ে চার তলায় উঠতে হয় আতাউরদের বাসায় যেতে হলে। বাসা ভর্তি দ্বিতল বিছানা। বাথরুমের পাশের রুমটি বাঙালি শ্রমিকদের। জুতার ৠাক উপচে ফ্লোরেও রয়েছে কনস্ট্রাকশনে কাজ করা শ্রমিকদের ভারি জুতা।

মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর থানায় বাড়ি আতাউরের। ১৯৯৬ সালে সিঙ্গাপুরে আসেন তিনি কার্পেন্টার হিসেবে। এখানকার অন্য শ্রমিকদের মতোই কাজ করছেন বি-টেক ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির কনস্ট্রাকশন সাইডে।

এ বাসাটিতে নিজ শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা করেছে বি-টেক কোম্পানি।

বিকেল ৫টার পর দুই বা তিন ঘণ্টা ওভারটাইম করে এখানে শ্রমিকরা ফিরছে এক এক করে। আবার বাসার সামনের ঘাসের ওপর পায়ের ওপর পা তুলে বা গ্রিল ধরে মোবাইলে কথা বলছে অনেকে। এখানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ফোনে কথা বলা নিয়ে বেশ অভিযোগ রয়েছে। দেশে স্ত্রী বা প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলে অর্থ এবং সময় দু’টোরই বেশ অপচয় করে বলে, অপবাদ দেওয়া হয় তাদের।

গত বছর বিয়ে করেছেন আতাউর। বয়স জিজ্ঞাসা করলাম না, তবে বেঝা যাচ্ছে যে কিছুটা দেরিতেই বিয়ে করেছেন তিনি। অবশ্য ১৬ বছর ধরে বিদেশে থাকায় বিয়ের বিষয়টিতেও হয়তো রাইট টাইমে রাইট ক্লিকটি দিতে পারেননি।

এরই মধ্যে রুমে প্রবেশ করেন লালমনিরহাটের একরাম উল হক। পাতলা গড়নের বেশ হাসিমাখা মুখ।  ২০০৯ সালে এক সাপ্লাই কোম্পানির মাধ্যমে আসেন তিনি। সাপ্লাই কোম্পানি হচ্ছে মানবসম্পদ প্রতিষ্ঠান। কোনো কোম্পানির শ্রমিক দরকার হলে, এ প্রতিষ্ঠান লোক সরবরাহ করে।

২০১১ এর ১৭ মার্চ থেকে তিনি রয়েছেন বি-টেক কোম্পানিতে। নিজের ছোট মামার মাধ্যমে এ দেশে এসেছেন তিনি। এরপর নিজের ২ ভাইকেও নিয়ে এসেছেন।

দু’জনেই জানান, দেশে যে পরিবার রেখে এসেছিলেন, আর্থিকভাবে এখন সেই পরিবারের অবস্থা বেশ ভালো হয়েছে।

আতাউর বলেন, নিজে কষ্ট করে হলেও দেশে টাকা পাঠাতে পারলে ভালো লাগে। বাড়িতে বাবা-মা ভালো আছে শুনলে আর কষ্ট পাই না। 

একরামরা ৪ ভাই। তিনি তৃতীয়। বলেন, এক সময় পরিবারের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। বাবা একসময় বিভিন্ন ধরনের মৌসুমী ব্যবসা করতেন। আমাদের জন্যে অনেক কষ্ট করেছেন। এখন বুড়ো বয়সে কিছুটা সুখে হয়তো রাখতে পারছি।

এই কোম্পানির দেনা পাওনা ভালো। দু’জনেই জানালেন, কোনো দিন অসুস্থ থাকলে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হয়। প্রেসক্রিপশন দেখালে আর সমস্যা হয় না, সেই দিনের বেতন পাওয়া যায়। আবার যাতায়াতের ভাড়াও দেওয়া হয়।

এ ধরনের কাজে মাসে বেতন ৭০০ থেকে ৯০০ ডলারের (৪৪ হাজার টাকা থেকে ৫৬ হাজার টাকা) মধ্যে। দেশি ভাইয়েরা জানান, এর মধ্যে খাওয়ার খরচটা নিজেদের চালাতে হয়। এখানে জিনিসপত্রের দাম অনেক। এর মধ্যেই যেভাবেই হয় টাকা সঞ্চয় করতে হয়ে। দেশে কিছু পাঠাতে হয়।

এর মধ্যেই আসলো রান্না প্রসঙ্গ। আতাউর বলেন, দেশে থাকতে তিনি কখনোই রান্না করেননি। তবে এখন করতে হচ্ছে। আর একরাম বলেন, ছোটো বেলা থেকে মায়ের পাশে বসে রান্নার কিছু খুটিনাটি শিখেছেন তিনি। তাই এই রুমের চারজনের মধ্যে সেরা রন্ধনশিল্পীর পদটি এখন তারই দখলে। 

জুয়েল হোসেন মুন্সিগঞ্জের ছেলে। ২০০৭ সালে তিনিও এজেন্টের মাধ্যমে আসেন ভোকেশনাল ট্রেইনিং নিয়ে। স্কিল শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন সাপ্লাই কোম্পানিতে।

প্রথমে এক বছর ক্ষেপ। এরপর বি টেকে। বিয়ে করেন এ বছরের মার্চে। বাড়িতে বাবা-মা, ভাই-ভাবি রয়েছে তার।

জুয়েল এখনো দেশে টাকা পাঠাতে পারেননি। ৩ মাস হলো বি-টেক কোম্পানিতে রয়েছেন। ২ বছরের চুক্তি। ধীরে ধীরে ঋণ শোধ করছেন। তার মেঝ ভাই সৌদিতে থাকেন। সেও দেশে টাকা পাঠায়। আশা করছেন আগামী এক বছরের মধ্যেই পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা ঘুরে দাঁড়াবে।

তিনজনেই বলেন, এখানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের খরচও অনেক। তবে বুঝে চললে আর নিজের স্বভাবকে নিয়ন্ত্রণ করেই টাকা সঞ্চয় করতে হয়। তারা বলেন, এখানে টাকা ওড়ানোর অনেক জায়গা রয়েছে। ঘুরলেই টাকা খরচ।

একরাম বলেন, তাই কাজ শেষেই এই ঘরে ঢুকে যাই যেন টাকা খরচ না হয়।

ঢাকার মিরপুরে ব্যবসায় ক্ষতিপূরণ দিয়ে এখন সিঙ্গাপুরে আল-আমিন। ২০০৯ সালে স্কিল হয়েই সিঙ্গাপুরে এসেছেন তিনি। আমিনের আরো ২ ভাই রয়েছেন সিঙ্গাপুরে। আমিনের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান হচ্ছে দেশের ৬ বছরের মেয়ে। বলেন, সব কষ্ট ওর জন্যেই করছি।

পরিবারের অবস্থা বেশ ভাল এখন আমিনদের।

এসব শ্রমিকরা জানান, বন্ধের দিন অফিস করলে ৩ ডলারের জায়গায় ৬ ডলার দেওয়া হয়।

এখানে বাধ্যতামূলক কাজে যেতে হয়। কোম্পানি থেকে প্রতি শ্রমিকের জন্যে বছরে ৭০০ থেকে ৮০০ ডলার লেবি (শ্রমিকের জন্যে সরকারের কর) দিতে হয়। এ কারণে কোম্পানি শ্রমিকের কাজে যাওয়াটা নিশ্চিত করতে চায়।

অনেক অনুরোধ করা হলো রাতে খেয়ে যাওয়ার জন্যে। আরেকদিনের কথা বলে বের হলাম। আতাউর এগিয়ে দিলো। বাসা থেকে বের হয়ে মনে হলো আবার প্রশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে। তবে আরো কিছুটা সময় ভাইদের সঙ্গে কাটাতে পারলে হয়তো আরো অনেক কথা জানতে পারতাম।

দুই ঘণ্টা আগে বাসায় প্রবেশের পূর্বে যে শ্রমিককে দেখছিলাম ঘাসের ওপর বসে ফোনে কথা বলছে, তাকে তখন দেখলাম একই ভঙ্গিতে কথা বলে যাচ্ছে। অনুমান করা যায়, ফোনে কথা বলার অভিযোগ মিথ্যা নয়।

এরই মধ্যে আরো একজন শ্রমিকের সঙ্গে পরিচয় হলো। হন্ত-দন্ত হয়ে বের হয়েছে। পরিচয়ের পরেই আর বেশি সময় দিলেন না। তাড়া রয়েছে।

আতাউর বলেন, এভাবেই শ্রমিকেরা অর্থের অপচয় করে। শেষেরবার হাত মেলানোর সময় অনুভব করলাম, পাথরের মতোই শক্ত আর মজবুত বাংলাদেশি শ্রমিক আতাউরের কব্জি।

বাংলাদেশ সময়: ১১২১ ঘণ্টা, অক্টোবর ৩১, ২০১৪

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

প্রবাসে বাংলাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2014-10-31 01:21:00