ঢাকা, সোমবার, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭, ১০ আগস্ট ২০২০, ১৯ জিলহজ ১৪৪১

কুয়েত

এমআরপির কার্যক্রম শেষ করতে যাচ্ছে কুয়েত দূতাবাস

মঈন উদ্দিন সরকার সুমন, কুয়েত থেকে | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৪০৮ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৪
এমআরপির কার্যক্রম শেষ করতে যাচ্ছে কুয়েত দূতাবাস

কুয়েত: প্রায় ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত মরুভূমি ঘেরা তেলসমৃদ্ধ বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ কুয়েত। স্থানীয় বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্যমতে কুয়েতে কর্মরত আছেন প্রায় দুই লক্ষ বাংলাদেশি অভিবাসী।



বর্তমানে কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে পাসপোর্ট অটোমেশন এর কাজ প্রায় সম্পন্ন হওয়ার পথে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিলের পর কেউ হাতে লেখা পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবেন না।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের  পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে প্রবাসীদের ডিজিটাল পাসপোর্ট দেয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইতোমধ্যেই কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের ডিজিটাল পাসপোর্ট কার্যক্রম প্রায় শেষের দিকে।

দূতাবাসের কনস্যুলার অফিসার প্রথম সচিব মো. আ. জলিল এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ২০১৫ সালের আগেই সকল  হাতে লেখা পাসপোর্ট এমআরপিতে কনভার্ট করার লক্ষ্যে তারা দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তাদের টিমওয়ার্ক ছিল অনেক ভালো। সময়মত পাসপোর্ট ডেলিভারি দেয়ার জন্য তারা শনিবার ছুটির  দিনেও স্ক্যানিং এর কাজ করেছেন। অটোমেশন সফলভাবে সম্পন্ন করে তারা বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য নজির স্থাপন করবেন বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

দূতাবাসে দালালের দৌরাত্ম্য ও তাদের সাথে দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ, ছবিতোলাকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি, প্রবাসীদের সাথে দূতাবাস কর্তৃপক্ষের খারাপ আচরণ সহ আরো অসংখ্য অভিযোগের কথা জানতে চাইলে তিনি জানান, এমন অভিযোগ কিছুটা সত্য হতে পারে। কেননা  আমরা আগে টেলিফোন করে আবেদনকারীকে ডেকে এনে ছবি তুলতাম। কেউ হয়তো ফোন ধরেননি।   ফলে নির্দিষ্ট দিনে ছবি তুলতে পারেননি। আমি কনস্যুলারের দায়িত্ব নেয়ার কয়েক মাস পরে ছবি তোলার ম্যানুয়াল সিস্টেম বাতিল করি। নিজেদের তাগিদে ডেভেলপ করি নতুন সফটওয়্যার। এ সফটওয়্যার এর বিশেষ দিক হচ্ছে টাকা জমা দেয়ার রশিদে সফটওয়্যার নিজেই  বিশেষ অ্যালগোরিদম ব্যবহার করে ছবিতোলার তারিখ, সিরিয়াল নাম্বার এবং দূতাবাসে উপস্থিত হবার সময় প্রিন্ট করে দেয়। উপস্থিত হবার সময় ভিন্ন ভিন্ন তারিখ উল্লেখ থাকায় অনেক মানুষ একত্রে দূতাবাসে জড়ো হন না  তাই পূর্বের মত দূতাবাসে অযথা ভিড় হয় না।

ডিজিটাল পাসপোর্ট করতে গেলে ভোটার আইডি কার্ড অথবা  জন্ম-নিবন্ধন প্রয়োজন হয়। দূতাবাস থেকে কোন জাতীয় পরিচয় পত্র দেয়া হয় না, শুধু জন্ম-নিবন্ধন  দেয়া হয়। আগে জন্ম-নিবন্ধন দিতে দূতাবাস এক মাসেরও বেশি সময় নিত। এর অন্যতম  কারণ ছিল স্থানীয় সরকারের তৈরি করা জন্ম-নিবন্ধন ওয়েব সাইটে আমাদের বিভিন্ন ভল্যুমে  আবেদনকারীর নাম খুঁজে বের করে জন্ম-নিবন্ধন সার্টিফিকেট প্রিন্ট করা হতো। একটা সার্টিফিকেট  প্রিন্ট করতে সময় লাগত ১২-১৫ মিনিট। কাজের এই শ্লথ গতির জন্য আমরা এক সময় দেখলাম  প্রায় ২৫০০ অ্যাপ্লিকেশন জমে গেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে যায় যে এক মাসেও  জন্ম-নিবন্ধন দেয়া কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। এ সমস্যা থেকে বের হবার জন্য আমরা নতুন সফটওয়্যারে  একটি ফিচার অ্যাড করি যেন টাকা জমা দেবার সময় একই সাথে জন্ম-নিবন্ধন প্রিন্ট করা যায়।   বর্তমানে যে দিন টাকা জমা দেয়া হয় সেদিনই জন্ম-নিবন্ধন সার্টিফিকেট প্রিন্ট করে দেয়া হচ্ছে।  

কনস্যুলারের কাজের স্বচ্ছতা বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সমগ্র কনস্যুলারের কাজ স্বচ্ছ এবং  দূতাবাসের প্রত্যেক কম্পিউটার ব্যবহারকারীর নিকট তা উন্মুক্ত। আমাদের নতুন সফটওয়্যার ওয়েব  বেজড হওয়ায় দূতাবাসের যেকোন কর্মকর্তা/কর্মচারী ব্রাউজারের দেখতে পান আজ কতগুলি  অ্যাপ্লিকেশন পরেছে এবং কত টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা পড়েছে। দূতাবাসের আর কোন আইটি  কার্যক্রম আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন দূতাবাসের নিজস্ব ডিজাইন করা ওয়েবসাইট রয়েছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে একটি ফেসবুক পেজ চালানো হয় যার সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারের কাছাকাছি। এর মাধ্যমে যে কোন সচেতনতামূলক পোস্ট  ফেসবুকে ৩০০০ বাংলাদেশীর নিকট পৌঁছে যায়। আমরা নিয়মিতভাবে মান্যবর রাষ্ট্রদূতের  নির্দেশনামতো ফেসবুক পেজে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে থাকি। এছাড়া সমগ্র মিশন চত্বর সিসিটিভির  আওতাধীন। একটি শক্তিশালী ডিভিআর এ দূতাবাসের কর্মকর্তা/কর্মচারী এবং সেবা গ্রহণকারীদের  গতিবিধি রেকর্ড হয়ে থাকে। এর ফলে কোন কর্মকর্তা/কর্মচারী সেবা গ্রহণকারীদের সাথে  কেমন ব্যবহার করছেন তা ভিডিও আকারে দেখা যায়। এছাড়া দূতাবাসে আসা সেবা গ্রহণকারীদের  শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কাউন্টারগুলিতে ডিজিটাল কিউ সিস্টেম চালু আছে।

প্রথমে এমআরপি  দেয়ার দৈনিক ক্যাপাসিটি ছিল ১৩০ জনের। এই সংখ্যা আমরা ২৩০ এ উন্নীত করেছি। বর্তমানে কেবল অন-লাইনের আবেদন গ্রহণ করি। এতে কর্মচারীদের কোন ডাটা এন্ট্রির ঝামেলা  পোহাতে হয় না। আমরা তাদেরকে এমআরপি সংশ্লিষ্ট অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারি। আমরা হঠাৎ করে অন-লাইন সিস্টেমে যাইনি। এ জন্য ফরম লেখকদের অন-লাইনে ফরম তৈরির  বিষয়ে ট্রেনিং দেয়া হয়। এই ট্রেনিং প্রোগ্রামে বিভিন্ন কম্পিউটার সেন্টারের ডাটা অপারেটরগণ এবং অন্যান্য ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ  করেন। কিছুদিন আমরা অন-লাইন এবং অফ-লাইন উভয় প্রকার আবেদন পত্র গ্রহণ করতাম। যখন  লক্ষ্য করলাম ফর্ম প্রস্তুতকারীরা সঠিক ভাবে অন-লাইন ফর্ম পূরণ করতে অভ্যস্থ হয়ে গেছে তখন  আমরা অফ-লাইন ফর্ম নেয়া বন্ধ করে দেই, শুধু মাত্র অন-লাইন ফর্ম চালু করি এবং আমাদের  দৈনিক ক্যাপাসিটি ১৩০ থেকে ২৩০ এ উন্নীত করি। এছাড়া যারা  বাংলাদেশে বেড়াতে যাবেন তারা যেন দেশ থেকে এমআরপি করে নিয়ে আসেন এ ব্যাপারে আমরা প্রচারণা চালাচ্ছি।

প্রত্যেকটা দূতাবাসে দালালের দৌরাত্ম্য  দেখা যায়। অনেকে মনে করেন এই দালাল চক্রের সাথে দূতাবাসের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের যোগাযোগে অনেক অন্যায় কাজ হয়ে থাকে। কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে দালালের দৌরাত্ম্য কেমন তা জানতে  চাইলে তিনি বলেন দালালদের নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এরা একটু সহজ-সরল মানুষ  দেখলেই ঠকানোর চেষ্টা করে। এদের একটা কমন বৈশিষ্ট্য বাইরে বলে বেড়ান, অমুক  অফিসারের সাথে আমার সরাসরি যোগাযোগ আছে, কাজটি আমি সহজেই করিয়ে দিতে পারবো,  এজন্য আমাকে এত টাকা দিতে হবে। এদের আর একটি কমন বৈশিষ্ট্য  হলো লজ্জা-শরমের অভাব।   আপনি যতই এদেরকে ভালোভাবে বুঝান খারাপ কাজ না করার জন্য, এরা শুনবে না। সুযোগ পেলে  আগের খারাপ কাজটি করবে। আমি যখন দূতাবাসে যোগদান করি তখন তিন-চারজন দালাল  দূতাবাসের বিল্ডিং এর পাশে বসে বিভিন্ন ফর্ম লেখালেখির কাজ করতো। কনস্যুলারের দায়িত্ব নেয়ার  পর এদেরকে দূতাবাস চত্বর ছেড়ে বাইরে অবস্থান করার কথা বলি। প্রচণ্ড রোদ্দুরে কাজ করার জন্য  এরা আমার উপর কিছুটা ক্ষুব্ধ হন। বর্তমান রাষ্ট্রদূতের নির্দেশনা হলো এসব দালাল দূতাবাসের বাউন্ডারির ভেতর অবস্থান করবে না। কনস্যুলার সংক্রান্ত কাজ করার জন্য দূতাবাসে তাদের  প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ।

আমাদের এখানে সিসি টিভি আছে, ছয় মাস পর্যন্ত ভিডিও রেকর্ড হয়। তাই  কোন দালাল দূতাবাসে প্রবেশ করলো কিনা, কোন কর্মচারী তাদের সাথে কথা বললো কিনা তা  ডিভিআর এ রেকর্ড হয়ে থাকে। আমরা একবার দালালদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এতে কিছু সমস্যা তৈরি হয়।

দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকদেরকে একটা ফর্ম পূরণের জন্য  কুয়েত সিটিতে যেতে হত সেখানে আসা যাওয়ার  ট্যাক্সি ভাড়া চার দিনার লাগতো। সেখানে আবার চার/পাঁচ দিনার দিতে হত ফর্ম পূরণ করতে। এভাবে ৯.৫ দিনারের পাসপোর্ট করতে তাকে অতিরিক্ত আরও ৯ দিনার খরচ করতে  হতো। এতে সেবাগ্রহণকারীদের উপকার না হয়ে হয়রারি বেশি হয়েছে। এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম,  ফর্ম লেখকরা দূতাবাসের বাহিরে অবস্থান করতে পারবে। এর জন্য তাদের সিভিল আইডি’র কপি আমাদের কাছে  জমা দিতে হবে, যেন কাউকে হয়রানি করলে বা ঠকালে আমরা পুলিশি ব্যবস্থা নিতে পারি। বর্তমানে  দালালদের হয়রানি নেই বললেই চলে। যদি খারাপ কিছু আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা নেই।

দূতাবাসের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ আছে। এ  বিষয়ে দূতাবাস থেকে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে জনাব জলিল বলেন, বিদেশের  মাটিতে রাত দিন কষ্ট করে যে শ্রমিক দেশে রেমিটেন্সের পাঠিয়ে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা হবে কোন যুক্তিতে? তার সাথে আমাদের হাসিমুখেই কথা বলা উচিৎ। কিন্তু যদি কোন দালাল-ঠকবাজ ঐ সহজ-সরল শ্রমিককে ৯.৫ কেডির পাসপোর্ট করাতে যেয়ে ৬০ কেডি নিয়ে নেয়  তখন ঐ দালালের সাথে নিশ্চয়ই হাসি মুখে কথা বলা হবে না। এখানে দালালদের ব্যাপারে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। দূতাবাসে আসা প্রবাসীরা যাতে ভালো সেবা পায় তার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে মান্যবর রাষ্ট্রদূত একটি অভিযোগ বাক্স খুলেছেন যেখানে যে কেউ তার অভিযোগ বা মতামত ফেলতে পারেন। প্রতি রোববার অফিসারদের সাপ্তাহিক মিটিংএ অভিযোগ বাক্সে  পরা বিভিন্ন অভিযোগ বা মতামত নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং মান্যবর রাষ্ট্রদূত প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। এছাড়া  সমগ্র দূতাবাস চত্বর সিসিটিভির আওতাভুক্ত হওয়ায় কোন অভিযোগে তারিখ সময় উল্লেখ থাকলে তা আমরা ডিভিআর থেকে ভিডিও আকারে দেখতে পারি।

দূতাবাসের সার্বিক কনস্যুলার সেবা কেমন  তা জানতে চাইলে জনাব জলিল জানান বর্তমানে মাত্র দুবার দূতাবাসে এসে ডিজিটাল পাসপোর্ট  (এমআরপি) বানানো সম্ভব। আগে পাঁচ বার আসার প্রয়োজন হতো। এখন কোন সেবা প্রার্থী  একদিন এসে জন্ম-নিবন্ধন বানাবেন, ডিজিটাল পাসপোর্ট এর টাকা জমা দিবেন এবং ছবি তুলবেন।   আর একদিন এসে নতুন ডিজিটাল পাসপোর্ট নিয়ে যাবেন। দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী বৈধভাবে (১,৯০,০০০) এক লক্ষ নব্বই হাজার বাংলাদেশি কুয়েতে আছেন।   এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় (১,১৫,০০০) এক লক্ষ পনের হাজার এমআরপি কুয়েত দূতাবাস তৈরি করেছে। ধারণা করা হচ্ছে প্রায় (৪০,০০০) চল্লিশ হাজার পাসপোর্ট বাংলাদেশ থেকে  বানানো হয়েছে। আরও ৩৫,০০০ হাজার এমআরপি এখনও বানাতে হবে।   ২০১৫  সালের পূর্বেই এই টার্গেট পূরণ হবে।

কুয়েত প্রবাসীরা যেন আরও বেশি করে এমআরপি বানাতে  আসে এজন্য মান্যবর রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মো. আসহাব উদ্দিন (এনডিসি, পিএসসি)’র নির্দেশনামত বিশেষ প্রচারণা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রচারণা চালানো হচ্ছে কুয়েত রেডিওতে, সভা-সেমিনারে এবং ফেসবুক পেজে। ’

বাংলাদেশ সময়: ১৪০৮ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa