
ঢাকা: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ক্ষেত্রে পাইকারি-খুচরা বাজারের আকাশ-পাতাল তফাত ভোগাচ্ছে ক্রেতাদের। সাধারণ ভোক্তাদের পাইকারি বাজারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দামে খুচরা বাজার থেকে পণ্য কিনতে গিয়ে নাভি:শ্বাস উঠছে। রমজানকে সামনে রেখে পণ্যমূল্য বিশেষ করে রমজানের দ্রব্যসামগ্রীগুলোর মূল্যবৃদ্ধির প্রতিযোগিতা দুর্ভোগ আরো বাড়িয়েই চলেছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি এবং খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কম থাকলেও খুচরা বাজারে এসে সে দামই হয়ে যাচ্ছে আকাশচুম্বী।
ক্রেতাদের অভিযোগ, বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে খুচরা বিক্রেতারা অধিক মুনাফা করছেন। ফলে বাজার করতে আসা ক্রেতারা অসহায় হয়ে পড়ছেন খুচরা বিক্রেতাদের কাছে। রমজান মাসকে কেন্দ্র করে আরো মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাও করছেন তারা।
রাজধানীর বৃহৎ পাইকারি বাজার শ্যামবাজার, চকবাজার ও কারওয়ান বাজার এবং খুচরা বাজার নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর, জিগাতলা ও কাঁঠালবাগান বাজার ঘুরে দামের আকাশ-পাতাল পার্থক্য চোখে পড়েছে। দেখা গেছে, পাইকারি বাজারের বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের খুচরা বাজারে গিয়ে বিক্রি হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে।
আবার অনেক সময় পাইকারি বাজারে দাম কমলেও খুচরা বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়ছে না।
খুচরা বাজারে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ, আলুর দাম
গত সপ্তাহের তুলনায় খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা করে বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। বর্তমানে দেশি পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৩৪ টাকা এবং ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৪ টাকা থেকে ২৫ টাকা।
আলুর দামও কেজি প্রতি ১ থেকে ২ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকা দরে। কেজিপ্রতি দেশি রসুন ৫০ টাকা এবং চায়নিজ রসুন বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকা।
কাঁচা মরিচের দাম স্থিতিশীল থাকলেও শুকনা মরিচের দাম বেড়েছে হঠাৎ করে। যা এখন বিক্রি হচ্ছে প্রকারভেদে প্রতি কেজি ১৫০ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা।
পাইকারি বাজারে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ, আলুর দাম
কিন্তু রাজধানীর অন্যতম বড় পাইকারি বাজার শ্যামবাজারে এ চিত্র একেবারেই আলাদা। এখানে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ২৫ টাকা থেকে ২৮ টাকা এবং ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৬ টাকা থেকে ১৮ টাকা কেজি দরে।
দেশি রসুন ২৮ টাকা থেকে ৩০ টাকা এবং চায়নিজ রসুন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা থেকে ৮২ টাকা দরে।
চায়নিজ এবং ভারতীয় আদা বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকা থেকে ৩৭ টাকা দরে।
ফলে দেখা যাচ্ছে খুচরা এবং পাইকারি বাজারে নিত্যপণ্যের দামের পার্থক্য প্রায় দ্বিগুণ।
শ্যামবাজারের মেসার্স বিক্রমপুর ট্রেডার্সের মালিক মো: আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘বর্তমানে পেঁয়াজ, রসুন এবং আদার দাম কমেছে। কারণ, আমরা ভারত এবং চীন থেকে যে মালামাল নিয়ে আসি এর কর বাড়ানোর কথা থাকলেও সরকার তা বাড়ায়নি।’’
তবে তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘আমাদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা যে মালামাল নিয়ে যান, তা তারা তিন ভাগে বিভক্ত করেন এবং বেশি দামে বিক্রি করেন।’’
খুচরা বাজারে ডালের দাম
রাজধানীর খুচরা বাজারে মশুর ডাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১১২ টাকা থেকে ১১৫ টাকা। কাঁচা ছোলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০ টাকা থেকে ৮৮ টাকা।
এদিকে বুটের ডাল ৯৪ টাকা থেকে ১০০ টাকা এবং খেসারি ডাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা থেকে ৫৬ টাকা প্রতি কেজি।
পাইকারি বাজারে ডালের দাম
রাজধানীর বৃহৎ পাইকারি ডালের বাজার চকবাজারের ডালপট্টিতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রকারভেদে বিদেশি মশুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা থেকে ৮০ টাকায় এবং দেশি মশুর ডাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০ টাকা থেকে ১০৪ টাকা।
প্রকারভেদে বুটের ডাল বিক্রি হচ্ছে ৯২ টাকা এবং ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৭৩ টাকা থেকে ৮০ টাকা কেজি।
এছাড়া খেসারির ডাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪৫ টাকা থেকে ৪৬ টাকা।
এ বিষয়ে হারুনার রশিদ ডালের আড়তের মালিক মো: মাহমুদুর রশিদ বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘আমরা সাধারণত ডাল অস্ট্রেলিয়া এবং মিয়ানমার থেকে আমদানি করে থাকি। বর্তমানে আমরা এ সমস্ত দেশ থেকে কয়েক সপ্তাহের তুলনায় কম দামে পাচ্ছি।’’
তিনি আরো বলেন, ডালের বাজারদর তাই এখন কমতির দিকে।
পাইকারি বাজারে কাঁচা সবজি
রাজাধানির কারওয়ানবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় কাঁচা সবজির দাম কমেছে।
যেমন কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা থেকে ৪০ টাকা। এছাড়া প্রতি কেজি পেঁপে ১৮ টাকা থেকে ২০ টাকা, বেগুন ২০ টাকা, পটল ২০ টাকা, ঝিঙা ২০ টাকা, ঢঁ্যাড়স ২০ টাকা এবং টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়।
খুচরা বাজারে কাঁচা সবজি
কিন্তু কারওয়ানবাজার থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের কাঁঠালবাগান কাঁচাবাজার, নিউমার্কেট এবং জিগাতলা কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র।
পাইকারি বাজারের ৩৫ টাকা থেকে ৪০ টাকার কাঁচা মরিচ খুচরা বাজারে গিয়ে বিক্রি হচ্ছে দ্বিগুন দামে ৭৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা।
এছাড়া প্রকারভেদে প্রতি কেজি বেগুন ৪০ টাকা থেকে ৪৫ টাকা, ঢ্যাড়স ৪০ টাকা, করলা ৪০ টাকা, পেঁপে ৩০ টাকা, ঝিঙা ৪০ টাকা, করলা ৪০ টাকা এবং টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা থেকে ৮৫ টাকা।
খুচরা এবং পাইকারি বাজারে দামের আকাশ-পাতাল পার্থক্যের কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের(টিসিবি) উপ-প্রধান সৈয়দা গুলশান নাহার বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘সামনে রমজানের অযুহাতে খুচরা ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা লাভের জন্যে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘আমরা আমাদের পক্ষ থেকে মনিটরিং করছি। অনিয়ম দেখলে দোকান প্রতি ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করছি।’’
‘‘এতেও কোনো লাভ হচ্ছে না। এর একটাই কারণ, লাভ করার প্রবণতা ব্যবসায়িদের মধ্যে প্রকট।’’
এছাড়া মাছের ক্ষেত্রেও পাইকারি এবং খুচরা বাজারে আকাশ-পাতাল তফাৎ লক্ষ্য করা গেছে।
ভোজ্যতেল, চাল, মুরগি ও ডিমের মূল্য একই খুচরা ও পাইকারি বাজারে
তবে ভোজ্যতেল, চাল এবং মুরগির দাম খুচরা ও পাইকারি কাঁচাবাজারে খুব একটা পার্থক্য দেখা যায় না।
সয়াবিন তেল লিটার প্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৩২ টাকা। ৫ লিটারের তীর ব্র্যান্ডের বোতলজাত তেল ৬৭০ টাকা এবং রুপচাঁদা বিক্রি হচ্ছে ৬৬৫ টাকায়। পাম তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১০৫ টাকা।
গত সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম কমেছে। এখন তা বিক্রি হচ্ছে বাজার ভেদে প্রতি কেজি ১৪৫ টাকা থেকে ১৫০ টাকা। অন্যদিকে গরুর মাংসের দামও স্থিতিশীল রয়েছে। গত সপ্তাহের মতোই চলতি সপ্তাহেও প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৭০ থেকে ২৭৫ টাকায়।
প্রতি হালি সাদা ডিম ৩৬ টাকা, লাল ডিম ৩৫ টাকা, হাসের ডিম ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশি মুরগির ডিমের সংকট রয়েছে কারওয়ানবাজারে।
তবে নিউমার্কেটে দেশি মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে প্রতি হালি ৪০ টাকা।
বাজারে চাল বিক্রি হচ্ছে আগের দরেই। তবে সব ধরনের পোলাওয়ের চালের দাম বেড়েছে। এরফান খোলা পোলাওয়ের চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৯৬ টাকা এবং প্যাকেটজাত চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০৫ থেকে ১০৮ টাকা।
বাংলাদেশ সময়: ২১৫৫ ঘন্টা, জুলাই ১৭, ২০১২
এমআইএস/ সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর