bangla news

সভাপতি-সম্পাদকের ‘বিতর্কিত’ কাজে ক্ষুব্ধ খাগড়াছড়ি ছাত্রলীগ

অপু দত্ত, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০২০-০২-২১ ৯:০৬:৫৪ এএম
খাগড়াছড়ি ছাত্রলীগের বিক্ষোভ সমাবেশ। ছবি- বাংলানিউজ

খাগড়াছড়ি ছাত্রলীগের বিক্ষোভ সমাবেশ। ছবি- বাংলানিউজ

খাগড়াছড়ি: একের পর এক বিতর্কে জড়াচ্ছেন খাগড়াছড়ি জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি টিকো চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন ফিরোজ। ক্ষুব্ধ সংগঠনটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা সর্বশেষ বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ, কুশপুত্তলিকা দাহসহ তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন। এমনকি সভাপতি-সম্পাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রীয় সংসদের প্রতি দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় পাল্টা জেলা কমিটি গঠনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।

মূলত কমিটি গঠনের দীর্ঘ চার বছরেও সংগঠনের বর্ধিত সভা করতে না পারা, নতুন ইউনিটের সম্মেলন দিতে না পারা, স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান, নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা, বিএনপি-জামায়াত শিবিরকে সংগঠনে পুনর্বাসন, দলে বিভক্তি, শৃঙ্খলাভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়াসহ বিস্তর অভিযোগ জমেছে সভাপতি টিকো চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন ফিরোজের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের ভিত্তি নেই বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
 
সভাপতি-সম্পাদকের কাছে প্রত্যাশা ছিল অনেক:
দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে চলে আসা খাগড়াছড়ি জেলা ছাত্রলীগের ‘ব্যালেন্স কমিটি’র বৃত্ত ভেঙে ২০১৫ সালের ১ জুন নেতাকর্মীদের সরাসারি ভোটে সভাপতি-সম্পাদক নির্বাচিত হন টিকো চাকমা ও জহির উদ্দিন ফিরোজ। এই নিয়ে সংগঠনের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ছিল। কারণ জেলা ছাত্রলীগের ইতিহাসে এটিই ছিল নেতাকর্মীদের ভোটে নির্বাচিত প্রথম কমিটি। তবে উৎসাহে ভাটা পড়ে। একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে গৃহদাহ শুরু হয় ছাত্রলীগে। জেলা ছাত্রলীগের সঙ্গে সমন্বহীনতায় দূরত্ব বাড়ে উপজেলা, পৌর ইউনিটগুলোর। ফাটল ধরে ঐক্যে। বাড়তে থাকে মতবিরোধ।

পৌর নির্বাচন দিয়ে দৃশ্যত ছাত্রলীগের বিভক্তি
জানা গেছে, জেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের ৬ মাস পর অর্থ্যাৎ একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় পৌর নির্বাচন। সে সময় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন ফিরোজ দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী বর্তমান মেয়র মো. রফিকুল আলমের পক্ষে অবস্থান নেন। এতে ছাত্রলীগে বিভক্তি দৃশ্যমান হয়। বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। পরবর্তী সময়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনেও দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে মানববন্ধন, মিছিল করে আলোচনায় থাকেন ফিরোজ। অভিযোগ রয়েছে সংসদ নির্বাচনে সে সময় দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সভাপতি টিকো চাকমার অবস্থানও ছিল বিতর্কিত। 

খাগড়াছড়ি পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল করিম বলেন, ‘পৌর ও সংসদ নির্বাচনে ফিরোজের কী ভূমিকা ছিল তা সবাই জানে। দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে একের পর এক দল বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত।’ নেতাকর্মীদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেয়া টিকো চাকমা সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
 
দল সামলাতে ব্যর্থ সভাপতি-সম্পাদক
সভাপতি-সম্পাদকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ তারা দল পরিচালনায় ব্যর্থ। এখন পর্যন্ত নেতাকর্মীদের নিয়ে কোনো বর্ধিত সভা করতে পারেননি। কমিটি গঠনের চার বছর পরও খাগড়াছড়ি পৌর ছাত্রলীগের কমিটির অনুমোদন দেয়নি। বিভিন্ন ইউনিটের সাথে নেই সভাপতি-সম্পাদকের যোগাযোগ। জেলার ১২টি ইউনিটের মধ্যে ৯টি ইউনিটের সম্মেলন দিতে পারেনি। অনৈতিক ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলেও একাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি তারা। বিএনপি-জামায়াত পন্থিদের পুনর্বাসন, ছাত্রত্ব না থাকালেও পদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পদে থেকে টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, জায়গা দখলের লিখিত অভিযোগ করা হয়।

খাগড়াছড়ি ছাত্রলীগের কুশপুতুল দাহ কার্যক্রম। ছবি- বাংলানিউজ
 
সভাপতি-সম্পাদকের ফেসবুক রাজনীতি
শুরু থেকে দলের সিদ্ধান্তগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে আসছেন সভাপতি-সম্পাদক। সর্বশেষ সভাপতি-সম্পাদকের যৌথ স্বাক্ষরে ফেসবুকে একাধিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এরমধ্যে উপজেলা কলেজ শাখাগুলোকে জেলা শাখার সাংগঠনিক ইউনিট ঘোষণা, উপজেলা-কলেজ কমিটি বাতিল, নতুনভাবে আংশিক কমিটি ঘোষণা করার বিষয়টি বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন নেতাকর্মীরা। মতামত কিংবা আলোচনা না করায় পানছড়ি ডিগ্রি কলেজের সদ্য ঘোষিত আংশিক কমিটির দুই সহসভাপতি সকন চাকমা ও রুবেল ত্রিপুরা এবং সাধারণ সম্পাদক তমাল বিকাশ ত্রিপুরা পদত্যাগ করেছেন। এরপর পানছড়ি উপজেলায় ছাত্রলীগের সব কর্মকাণ্ড স্থগিত করে ফেসবুকে আরেকটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
 
এর আগে পানছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল মোমিন ও সাধারণ সম্পাদক বিজয় কুমার দেবের স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষিত নতুন কমিটি প্রত্যাখান করার কথা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত পরিবারের সন্তান এবং ছাত্রদলের নেতা নিয়ে গঠিত কমিটি তারা গ্রহণ করবেন না।
 
পানছড়ি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শ্রীকান্ত দেব মানিক বলেন, ‘ফেসবুকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আমাদের উপজেলা কলেজকে জেলা শাখার সাংগঠনিক ইউনিট ঘোষণা করা হলো, আমাদের কমিটি বাতিল করা হলো, বিএনপি-জামায়াত দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হলো। অথচ এর কিছুই আমরা জানলাম না। কারো সাথে আলাপ আলোচনা না করে দুইজনের এমন সিদ্ধান্ত আমরা মানব না। ইচ্ছে মত তারা সিদ্ধান্ত দিলে আমরাও পাল্টা জবাব দেব।’
 
ক্ষুদ্ধ নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ

সভাপতি সম্পাদকের এমন কর্মকাণ্ডের পর খাগড়াছড়ি, পানছড়ি ও রামগড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এ সময় তারা টিকো-জহিরের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিলও করেছে জেলা, উপজেলা, পৌর ছাত্রলীগের কয়েক শতাধিক নেতাকর্মী। এসময় তারা ঝাড়ু প্রদর্শন করে স্লোগান দিতে থাকে। মিছিলটি শহর ঘুরে শাপলা চত্বরে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে। এসময় তারা সভাপতি-সম্পাদককের উদ্দেশ্যে ঝাড়ু– প্রদর্শন করেন।

খাগড়াছড়ি ছাত্রলীগের সংবাদ সম্মেলন। ছবি- বাংলানিউজ

বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের সাংবাদ সম্মেলন; সাত দিনের আল্টিমেটাম
বুধবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১২টায় জেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদ সম্মেলন করে। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন খাগড়াছড়ি জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি খোকন চাকমা। এ সময় জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক বাপ্পী চৌধুরী, নয়ন বড়ুয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক কিশোর ময় ত্রিপুরা, মহালছড়ি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জিয়াউর রহমান, গুইমারা উপজেলা ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আনন্দ সম, পানছড়ি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শ্রীকান্ত দেব মানিক, মাটিরাঙ্গা উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সালাহ উদ্দিনসহ জেলা, উপজেলা, পৌর ছাত্রলীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। 

সংবাদ সম্মেলনে টিকো চাকমা ও জহির উদ্দিন ফিরোমের সাংগঠনিক এবং ব্যক্তিগত অনিয়ম, দুর্নীতি তুলে ধরা হয় এবং আগামী সাত দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদ সভাপতি-সম্পাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
 
জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি খোকন চাকমা বলেন, ‘সভাপতি-সম্পাদক ফেসবুক রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। ফেসবুকে বিবৃতি ছেড়ে দিয়ে মন চাইলে কমিটি স্থগিত করে, মন চাইলে বাতিল করে। কোন বিষয়ে আজ পর্যন্ত আমাদের ডেকে আলোচনা করেনি। মূলত আর্থিক সুবিধার জন্য তারা আদর্শিক মিল না থাকার পরও যাকে তাকে পদে বসাচ্ছে। পদ থেকে বাদ দিচ্ছে। আমরা বিষয়টি কেন্দ্রে জানিয়েছি।’
 
তবে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলছেন খাগড়াছড়ি জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি টিকো চাকমা। তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে চাই বলে নতুন কমিটি গঠন করছি। সম্মেলন করার জন্য বার বার বলার পরও কেউ কর্ণপাত করেনি। তাই আমরা যা করছি সাংগঠনিক নিয়ম মেনে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছি।’ তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি। 
 
খাগড়াছড়ি জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন ফিরোজ বলেন, ‘কয়েকজন নেতাকে খুশি করার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে এসব ষড়যন্ত্র করছে। কেউ বলতে পারবে না আমাদের দ্বারা কোনো অন্যায় হয়েছে। কোনো প্রমাণ ছাড়া আমাদের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে এবং নিজের পছন্দের লোক দেওয়ার জন্য এসব ষড়যন্ত্র করছে। আমাদের সিদ্ধান্তে যদি কোনো ভুল থাকে প্রয়োজনে তদন্ত কমিটির মাধ্যমে তা শোধরানো হবে।’
 
বাংলাদেশ সময়: ০৯১২ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০
এডি/এজে

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2020-02-21 09:06:54