ঢাকা, বুধবার, ১ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৭ জুলাই ২০১৯
bangla news

সিরাজগঞ্জে পুলিশের ভয়ে বিএনপি নেতা-কর্মীরা বাড়ি ছাড়া

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১০-১০-১৯ ৮:০৪:৫৯ এএম

ট্রেনে অগ্নিসংযোগ ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় গণগ্রেপ্তার এড়াতে সিরাজগঞ্জের বিএনপি নেতা-কর্মীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এতে তাদের পরিবারগুলো পোহাচ্ছে নানা দুর্ভোগ।

সিরাজগঞ্জ: ট্রেনে অগ্নিসংযোগ ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় গণগ্রেপ্তার এড়াতে সিরাজগঞ্জের বিএনপি নেতা-কর্মীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এতে তাদের পরিবারগুলো পোহাচ্ছে নানা দুর্ভোগ।

গত ১১ অক্টোবরের ওই ঘটনায় বিএনপির প্রায় ১২ হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ৮ টি মামলা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীমও রয়েছেন।

এসব মামলায় গত ৮ দিনে ৬৮ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে আছেন সাবেক যুবদল সভাপতি রাকিবুল হাসান রতন, শাহজাদপুর উপজেলার গারাদহ ইউপি চেয়্যারম্যান ও উপজেলা বিএনপি সহ-সভাপতি আব্দুল জব্বার।

গ্রেপ্তারের ভয়ে শহরের ধানবান্ধি, আমলাপাাড়া, কালিবাড়ি, একঢালা, গয়লা, মালশাপাড়া ও গোশালাসহ বিএনপির এলাকা বলে পরিচিত এলাকা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এখনও যে দু’চারজন থেকে গেছেন, তারাও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে থাকছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আত্মগোপনে থাকা এসব নেতা-কর্মীর অনেকেই আগাম জামিন নিতে ঢাকা কিংবা জেলার বাইরে আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। এদের বেশিরভাগেরই মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে। কেউ কেউ পুরনো বন্ধ সিম চালু করে বা সিম পাল্টে আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ সদর-২ আসনের সাংসদ রোমানা মাহমুদ বাংলানিউজকে জানান, তিনি নিজেও একপ্রকার গৃহবন্দি।

তিনি বলেন, ‘গতকাল আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনার ব্যাপারে আমি আগে থেকেই প্রশাসনকে জানিয়েছি। তারপরও কেন আমার বাড়ি পুলিশ ঘেরাও করলো তা এখনও আমার কাছে বোধগম্য নয়।’

রোমানা বলেন, ‘তারা (পুলিশ) শুধু আমাকেই মানসিক চাপে রাখেনি, বরং আমার বাসার বাবুর্চি, দারোয়ান ও অন্যান্য সদস্যরাও আতঙ্কে রয়েছে।’

তিনি ১১ অক্টোবরের ওই ঘটনায় ট্রেনচালকদের দোষারোপ করে বলেন, ‘ট্রেন তো একটা দানব। তার তো মানুষের মতো বোঝার বিবেক-বুদ্ধি নেই। তাকে যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাকেই তো সাবধান হতে হবে। তার কাজ সমান্তরালভাবে চলে যাওয়া।’  

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম মোকাদ্দেস আলী মোবাইল ফোনে বলেন, ‘সিরাজগঞ্জে বিএনপির রাজনীতি ধ্বংস করতে সরকার প্রশাসনকে দিয়ে নীল-নকশা প্রণয়ন করছে। ট্রেন দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন না করে তারা বিএনপি নিধনে মরিয়া হয়ে উঠেছে।’

জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বাংলানিউজকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘৭১’র সময় পাক হানাদারদের ভয়ে মানুষ যেমন ভিটেছাড়া হয়েছিল ও সব সময় নিরাপত্তাহীনতায় ছিল, আজ আওয়ামী লীগ ও তার পুলিশ বাহিনীও আমাদের ঠিক তেমন আবস্থা করেছে।’

তিনি আরও বলেন, হাজার হাজার নেতা-কর্মী পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এতে তাদের পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ বিএনপি নেতা- কর্মীদের লিস্ট তৈরি করছে। আর পুলিশ ও র‌্যাব বাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্রেপ্তারের নামে তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর, আসবাবপত্র তছনছ ও লুটপাট করছে।
 এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রশাসনের অনুমতি না নিয়ে যারা সরকারি জায়গায় গায়ের জোরে সমাবেশ করেছে, তাদেরকেই এর দায়ভার বহন করতে হবে।’

তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ থেকে কোনও মামলাও করা হয়নি বা কাউকে হয়রানিও করা হচ্ছে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের নিজস্ব কায়দায় দায়িত্ব পালন করছে।’

র‌্যাব-১২’র অপরাধ দমন বিশেষ শাখার অধিনায়ক জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মো. শহিদ উল্লাহ শহিদ বলেন, ‘কোনও দলের উদ্দেশ্য হাসিল করা র‌্যাবের কাজ নয়। ঘটনার সময় ভিডিও ফুটেজ, ছবি, এলাকাবাসী ও প্রত্যদর্শীদের সহায়তা নিয়েই প্রকৃত অপরাধীদের ধরা হচ্ছে।’
 
সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. দেলোয়ার হোসেন সাইদী বলেন, ‘পুলিশ তার নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও ভিডিও ফুটেজ দেখে আসামি ধরছে।’

তিনি গ্রেপ্তারের সময় লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘পুলিশ কোনও ধরনের লুটপাটের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। নিরাপরাধ কাউকে হয়রানি করা আমাদের কাজ নয়।’


গ্রেপ্তার হওয়া পৌর এলাকার এসএস রোডের রফিকুল ইসলাম টরির ছোট ভাই মাসুম তালুকদার বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমার ভাই বিএনপি একজন সমর্থক। ঘটনার দিন যখন ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় তখন সে বাড়িতে ছিল।’

তিনি জানান, ১৩ সদস্যের পরিবারে টরিই ছিলেন প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

উল্লাপাড়া উপজেলার নবগ্রাম গ্রামের পোল্ট্রি খামারি ওবায়দুল ইসলাম মাহবুবের কোনও রাজনৈতিক পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তার স্ত্রী তানজিলা রহমান।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমার স্বামীর কোনও রাজনৈতিক পরিচয় নেই। অথচ গত রোববার ঢাকায় ব্যবসায়িক কাজে গেলে গতরাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।’

দু’ মেয়ে সাবা (১৩) ও স্বর্ণা (৪) এবং শাশুড়ি আছিয়া খাতুনকে (৯০) নিয়ে তানজিলা এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন।

পৌর এলাকার মালশাপাড়া গ্রামের ইকবাল হোসেনের পরিবারেরও একই দশা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার বন্ধু বললেন, ‘ইকবাল বিএনপির একজন সমর্থক। ব্যবসা করে সংসার চালায়। দিন আনে দিন খায়। ৫ সদস্যের পরিবারে সে একাই উপার্জনম।’

ইকবালের গ্রেপ্তারের খবর শুনে তার বাবা-মা দুজনেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, গত ১১ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদ-মুলিবাড়ি রেলক্রসিং সংলগ্ন মাঠে ‘জেহাদ দিবস’ উপলে খালেদা জিয়ার সমাবেশে অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে এক ট্রেন দুর্ঘটনায় কমপে ৭ জন মারা যায়। এতে ুব্ধ ছাত্রদল ও বিএনপি নেতা-কর্মীরা ট্রেনে ভাঙচুর চালায় ও আগুন ধরিয়ে দেয়। কেউ কেউ লুটপাটেও জড়িয়ে পড়েন।

বাংলাদেশ সময়: ১৭৫১ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৯, ২০১০

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
db 2010-10-19 08:04:59