ঢাকা, বুধবার, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ০৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

রাজনীতি

‘গোলাম আযমকে বাঁচাতে জীবন দিতে প্রস্তুত,নিজামীদের বেলায় শীতনিদ্রা!’

আসাদ জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১২৫২ ঘণ্টা, অক্টোবর ৭, ২০১০
‘গোলাম আযমকে বাঁচাতে জীবন দিতে প্রস্তুত,নিজামীদের বেলায় শীতনিদ্রা!’

ঢাকা: জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমকে বাঁচাতে যেমন মরিয়া হয়েছিল ইসলামী ছাত্রশিবির, বর্তমান আমীর মতিউর রহমান নিজামী ও অন্য নেতাদের বেলায় সে তুলনায় যেন নীরবেই রয়েছে সংগঠনটি।

বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা বিশ্লেষণ।

একই রাজনৈতিক মতাদর্শের রাজাকার বাহিনীর প্রধান গোলাম আযমের জন্য প্রাণ দিতে একদা প্রস্তুত ইসলামী ছাত্রশিবির আলবদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমানের বেলায় কেন নীরব?

‘গোলাম আযমকে বাঁচাতে জীবন উৎসর্গে প্রস্তুত শিবির নিজামীদের বেলায় কেন শীতনিদ্রায়!’ এ প্রশ্ন এখন জামায়াত বিরোধী ও জামায়াতপন্থী সবার।

এ ব্যাপারে ফোনে কথা বলতে চাইলে শিবিরের সাবেক সভাপতি ও রমনা থানা জামায়াতের বর্তমান আমীর সেলিম উদ্দিন বাংলানিউজকে জানালেন, সরাসরি সাক্ষাৎ ছাড়া কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে তিনি কথা বলেন না।

সরাসরি দেখা করতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন আমি ব্যস্ত। সাক্ষাৎ দেওয়ার মতো সময় হাতে নেই। ’

কবে নাগাদ সময় হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন কিছু বলতে পারছি না। ’

অপরদিকে শিবিরের বর্তমান সভাপতি মোহাম্মদ রেজাউল করিমের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। অন্য নম্বর চেয়ে শিবিরের কেন্দ্রীয় অফিসে যোগাযোগ করলে শফিক নামে একজন অফিসকর্মী জানান ‘অনুমতি ছাড়া ফোন নম্বর দেওয়া যাবে না। ’

সভাপতির সঙ্গে কথা বলতে হলে সরাসরি অফিসে যাওয়ার পরমর্শ দেন শফিক।

এর পর কয়েক দফা অফিসে গিয়েও শিবির সভাপতিকে পাওয়া যায়নি। খোঁজ মেলেনি অন্য কোনো কেন্দ্রীয় নেতারও। অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু ফোন রাখা বা নম্বর বদলানো নয়, আগের আবাসিক ঠিকানাও বদলে ফেলেছেন শিবির নেতারা।

সেদিন রাস্তায় শুয়ে পড়েছিল শিবির কর্মীরা

১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ শহীদ জননী জাহানারা ঈমামের নেতৃত্বে ঘাতাক দালাল নিমূল কমিটি’র গণআদালত জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন।

গোলাম আজমকে গ্রেপ্তার ও ফাঁসির রায় কার্যকর করতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলন এবং তাতে আওয়ামী লীগসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ও সহযোগিতা সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। অপরদিকে, গোলাম আযমকে হত্যার মিশন বাস্তবায়নে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ১ হাজার সদস্য’র সুইসাইট স্কয়াড গঠন করেছে বলেও ওই সময় গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
    
রাজনৈতিক পর্যবেকদের মতে, ওই পরিস্থিতিতে গোলাম আযমকে নিরাপদ হেফাজতে রাখতেই শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন বিএনপি সরকার।

সরকারের নির্দেশে ২৪ মার্চ ১৯৯২ গোলাম আযমকে গ্রেপ্তার করতে তার বাসায় যায় পুলিশ। এসময় গ্রেপ্তারের হাত থেকে জামায়াত আমীরকে বাঁচাতে শিবিরকর্মীরা তার বাড়ির চারিদিকে তৈরি করে মানব প্রাচীর। কয়েক হাজার কর্মী গোলাম আযমের বাড়ির সামনের রাস্তায় শুয়ে পড়ে সোলআগ দিতে থাকে, ‘জীবন দেব তবু গোলাম আযমকে  গ্রেপ্তার করতে দেব না। ’

সূত্র জানায়, ‘গোলাম আযম নিরাপদ থাকবেন’- সরকারের কাছ থেকে এ ধরনের নিশ্চয়তা পাওয়ার পর গোলাম আযমের নির্দেশে শিবির নেতা-কর্মীরা মানব প্রাচীর তুলে নেওয়ার পর সেদিন গ্রেপ্তার হন গোলাম আযম।

তবে কারাগার থেকে  গোলাম আযম মুক্ত হবার আগ পর্যন্ত বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলন অব্যাহত রেখেছিল ছাত্রশিবির।

নিজামীর বেলায় তৎপরতা নেই!

এদিকে গত ২৯ জুন জামায়াতের বর্তমান আমীর মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও নায়েবে আমীর  দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং ১৩ জুলাই জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আব্দুল কাদের মোল্লা গ্রেপ্তার হবার পর শিবিরকে তেমনভাবে মাঠে নামতে দেখা যায়নি।

এমনকি গত ২৫ আগস্ট শিবিরের সাবেক সভাপতি ও ঢাকা মহানগর জামায়াতের বর্তমান আমীর রফিকুল ইসলাম মিয়া গ্রেপ্তার হবার পরও নীরব থেকেছে শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তির এই ছাত্র সংগঠনটি।

মূল দলের আমীরসহ শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় সব নেতাকে গ্রেপ্তারের পরও শিবিরের এই নীরবতাকে রহস্যজনক মনে করছেন র্পবেকরা। তাদের মতে, নিজেদের সঞ্চিত শক্তি (রিজার্ভ ফোর্স) খরচ করতে চায় না বলেই কৌশলে শিবিরকে দূরে রেখেছে জামায়াত। পর্যবেকদের বিশ্বাস, মূলত জামায়াত নেতৃত্বের সিদ্ধান্তেই শিবিরের এই শীতনিদ্রা।

শিবিরের সাবেক সভাপতি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের সাম্প্রতিক ‘রিজার্ভ ফোর্স’ তত্ত্বের পর তাদের এ ধারণাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না বেল মনে করেন তারা।
তবে আরেকটি পরে মতে, বর্তমান বাস্তবতা আর গোলাম আযমকে গ্রেপ্তারকালীন বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। তখন মতায় ছিল জামায়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল বিএনপি সরকার। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মতায় আসীন মহাজোট সরকারের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। এবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার দিয়ে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মতায় এসেছে আওয়ামী লীগ।

তাদের মতে, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং বিচারের রায় কার্যকর করার দায়সহ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা, ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলা মামলাসহ দেশজুড়ে জঙ্গিবাদ তথা জেএমবির তৎপরতা সামাল দেওয়ার জটিল কর্মযজ্ঞে আওয়ামী লীগের জন্য যৌক্তিক এবং স্বাভাবিক গতিপথ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশীয় রাজনীতি ও প্রশাসনে ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকা জামায়াত-শিবির দমন।

এতে করে আওয়ামী লীগের এক ঢিলে অনেক পাখি শিকারের কাজ হয়ে যাবে বলে এ পটি মনে করছেন।

সেজন্যে মতায় থাকা আওয়ামী লীগ এখন যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবিরের ওপর খড়গ হস্ত। বিষয়টি অনুধাবন করেই আত্মরার প্রয়োজনে শিবির অনেকটা শীতনিদ্রায় রয়েছে। অনুকূল পরিবেশ দেখলে সহসাই আড়মোড়া ভেঙ্গে স্বমূর্তি ধরবে জামায়াতের এই ছাত্র সংগঠনটি।

প্রসঙ্গত, ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জামায়াতের বর্তমান নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাশেম আলীকে সভাপতি করে ছাত্র শিবিরের জন্ম হয়। ছাত্রশিবিরের আগের নাম ছিল ইসলামী ছাত্র সংঘ। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন জামায়াতের বর্তমান আমীর মতিউর রহমান নিজামী।

অভিযোগ রয়েছে, ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতারাই পাকিস্তানী হানাদারদের সহযোগিতায় রাজাকার, আল বদর ও আল শাম্স বাহিনী গঠন করে এদেশে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞসহ ব্যাপক নারী নির্যাতন, নৃশংসতা ও বর্বরতার রাজত্ব কায়েম করেছিল।

বাংলাদেশ সময়: ১৩২৭ ঘণ্টা, অক্টোবর ৭, ২০১০

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa