ঢাকা, বুধবার, ৪ কার্তিক ১৪২৮, ২০ অক্টোবর ২০২১, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মুক্তমত

করোনায় অক্সিজেন: বাস্তবতা ও আশঙ্কা

লেলিন চৌধুরী, অতিথি লেখক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০৪৩ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৮, ২০২১
করোনায় অক্সিজেন: বাস্তবতা ও আশঙ্কা

করোনা ভাইরাসের আক্রমণে সবার আগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের ফুসফুস। আহত ফুসফুস বাতাস থেকে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সংগ্রহের সামর্থ্য হারাতে থাকে।

ফলে শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়।  

মানবশরীরে অক্সিজেনের মাত্রা পরিমাপের নির্দেশক হলো 'অক্সিজেন স্যাচুরেশন'। আমরা শ্বাসগ্রহণ করার পর ফুসফুসের বিশেষ এক ধরনের ফাঁপা কোষে বাতাস প্রবেশ করে। এই ফাঁপা বায়ুভর্তি কোষগুলোর নাম 'অ্যালভিওলি'। এখানে রক্তের সাথে বাতাসের একটি লেনদেন ঘটে। রক্তে হিমোগ্লোবিন নামের একটি উপাদান আছে। হিমোগ্লোবিন অক্সিজেন ও কার্বনডাইঅক্সাইড নামের গ্যাসকে নিজের সাথে আবদ্ধ করতে পারে। শরীরের কোষগুলো খাবার থেকে সংগৃহীত উপাদানকে ভেঙে শক্তিতে রূপান্তরিত করে। উৎপাদিত এই শক্তি দিয়ে কোষগুলো নিজের কাজ আমৃত্যু চলমান রাখে।  

দেহের কোষ থেকে প্রতিনিয়ত একটি বর্জ্য তৈরি হয় যার নাম কার্বনডাইঅক্সাইড। এটি একটি গ্যাস। হিমোগ্লোবিন শরীরের সকল কোষ থেকে উৎপাদিত বর্জ্য কার্বনডাইঅক্সাইডকে বহন করে অ্যালভিওলিতে নিয়ে আসে। অ্যালভিওলির দেয়ালে অতিসূক্ষ্ম জালের মতো রক্তনালি রয়েছে। বাতাস এই জালিকার সংস্পর্শে এলে রক্তের হিমোগ্লোবিন বাতাসের অক্সিজেনকে নিজের সাথে আটকে নেয় এবং বহন করে আনা কার্বনডাইঅক্সাইডকে বাতাসে মুক্ত করে দেয়।  

ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হলে অক্সিজেন গ্রহণ ও কার্বনডাইঅক্সাইড বর্জনের কাজটি ব্যাহত হয়। এতে একদিকে রক্তে অক্সিজেন কমে যায় অন্যদিকে কার্বনডাইঅক্সাইড বেড়ে যায়। অক্সিজেন যত কমে যাবে শরীরের কোষগুলো ততবেশি কাজ করার ক্ষমতা হারাবে। কার্বনডাইঅক্সাইড বেড়ে গেলে কোষগুলো বিষক্রিয়ার শিকার হয়। করোনা আক্রান্ত মানুষ এই প্রক্রিয়ায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তাই বলা হয় করোনারোগীর জন্য একটি অতিপ্রয়োজনীয় জীবনরক্ষকারী ঔষধ হলো মেডিক্যাল অক্সিজেন।  

একজন সুস্থ মানুষের শরীরে অক্সিজেন স্যাচুরেশনের স্বাভাবিক মাত্রা হচ্ছে ৯৫- ১০০%। এইমাত্রা ৯৪%-র কম হলে সতর্ক হতে হয় এবং ৯২%-র কম হলে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা আবশ্যক।

বাংলাদেশে সবমিলিয়ে মেডিক্যাল অক্সিজেন উৎপাদন হচ্ছে দৈনিক ১৫০ টনের মতো। করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে দৈনিক অক্সিজেন-এর চাহিদা হলো ১৪০ থেকে ১৫০টন। অর্থাৎ একইসময়ে দেশে মেডিক্যাল অক্সিজেনের কোনো ঘাটতি নেই। বর্তমানে দেশে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের কম। দিন পনের আগে এই সংখ্যা সাত হাজারের বেশি ছিলো। তখন হাসপাতালে এখনকার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হতো। সে সময় অক্সিজেনের চাহিদা ছিলো দৈনিক ১৮০-২০০ টন। তখন ভারত থেকে আমদানি করে প্রয়োজনীয় ঘাটতি পূরণ করা হতো। ভারতে করোনার প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কোনো কোনো স্থানে অক্সিজেনের অভাবে মানিবক বিপর্যয়ের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। তাই ভারত থেকে এখন অক্সিজেন পাওয়া সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় দেশে করোনারোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে কী হবে?

করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে প্রধানত তিনটি কারণে। ১. করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের কাজে ভুল পদক্ষেপ নেওয়া হলে। ২০২০ সালে ইতালি থেকে আসা বিমানযাত্রীদের কোয়ারেন্টিনে না-রাখা ছিলো এরকম একটি ভুল পদক্ষেপ। গতবছর করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির কালে লোকজন টেস্ট করার জন্য অধীর, সে সময় করোনা টেস্টে মূল্য আরোপ করে একটি টেস্ট-সংকোচন নীতি গ্রহণ করা হয়। যেটা যথাযথ ছিলো না। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার সময়ে এরকম ভুল সিদ্ধান্তে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে।  

২. জনসাধারণকে সচেতন করতে ব্যর্থ হলে করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে করোনা প্রতিরোধের মৌলিক স্তম্ভ। সাধারণ মানুষকে যুক্ত করতে পারলেই  একাজটি সফল হয়। এজন্য করোনাপ্রবন প্রতিটি পাড়া, মহল্লা ও এলাকায় স্থানীয় লোকজনের সমন্বয়ে গণতদারকি কমিটি গঠন করা উচিত।  

৩. সামনের দিনগুলোতে করোনা ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে প্রতিরোধের একাধিক কৌশল নির্ধারণ করে রাখা দরকার। প্রয়োজনের সময় কালবিলম্ব না করে প্রতিরোধ- পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা। এজন্য নিয়মিত করোনা ভাইরাসের জিনবিন্যাসের পরীক্ষা করা অত্যাবশ্যক।

আমরা যদি করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সঠিকভাবে সেগুলোর বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হই তাহলে রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সেটা করতে ব্যর্থ হলে রোগীর সংখ্যা বাড়বে। প্রয়োজন হবে বাড়তি অক্সিজেনের। আমাদের জন্য অতিরিক্ত অক্সিজেন যোগাড় করা সময় ও আয়াসসাধ্য বিষয়। তাই এখন করোনারোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে আমাদের দেশেও মানবিক বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা আর কোনো হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চাই না। এ কথাটা মনে রেখে আমাদের সবাইকে করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে যত্নবান হতে হবে।

লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

বাংলাদেশ সময়: ২০৪২ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৮, ২০২১
নিউজ ডেস্ক

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa