bangla news

ত্যাগের মানসে তৈরি ঐতিহাসিক লাল মসজিদ

স্বপন চন্দ্র দাস, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৯-০৫-২৯ ১১:৫৮:০৮ এএম
ঐতিহাসিক লাল মসজিদ। ছবি: বাংলানিউজ

ঐতিহাসিক লাল মসজিদ। ছবি: বাংলানিউজ

সিরাজগঞ্জ: হোসেনপুর লাল মসজিদটির বয়স প্রায় ১৪৩ বছর। ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটি দীর্ঘদিন ধরে গৌরব আর মহিমা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি ও দ্বন্ধের পর ত্যাগে ভাস্বর হওয়ার মানসে এ মসজিদ নির্মাণ হয়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মসজিদ স্থাপন নিয়ে তৎকালীন জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল সিরাজগঞ্জ শহরের হোসেনপুর মহল্লার ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী ও অন্যান্যদের সঙ্গে দাঙ্গাও হয়েছিল। আর এমনই মুহূর্তে প্রভাবশালী জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর হাতে রক্তাক্ত হলেও মসজিদ স্থাপন করবেন, এমন দুর্বার চ্যালেঞ্জ নেন মুসল্লিরা। আর সেই থেকেই এ মসজিদের নামকরণ করা হয় ‘হোসেনপুর লাল মসজিদ’।

হোসেনপুর এলাকার বয়োবৃদ্ধ মুরুব্বিয়ান ও মুসল্লিরা বাংলানিউজকে এই মসজিদটি নির্মাণের ইতিহাস জানান। তারা বলেন, প্রায় দেড়শ বছর আগে সিরাজগঞ্জের তৎকালীন কৃর্তিমান আলেম মুন্সী মেহের উল্লাহ হোসেনপুর এলাকায় মসজিদ স্থাপনের উদ্যোগ নেন। এলাকাটি মুসলিম অধ্যুষিত হলেও প্রভাবশালী জমিদার ও তার লোকজন মসজিদ স্থাপনে বাধা দেন। এ নিয়ে জমিদারের সঙ্গে স্থানীয় মুসলিমদের দ্বন্দ্ব ও দাঙ্গা শুরু হয়। এক পর্যায়ে মুন্সী মেহের উল্লাহসহ স্থানীয় মুসল্লিরা প্রতিবাদী কণ্ঠে বলেন, প্রয়োজনে জমিদার বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে রক্তে লাল হবো—তবুও মসজিদ এখানে করবোই। এমনই এক পরিস্থিতিতে জমিদারদের বাধা উপেক্ষা করে ১৮৭৬ সালে মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মুন্সী মেহের উল্লাহর পাশাপাশি দামিউল্লাহ মুন্সী ও হিসাব উদ্দিনের দান করা ৪২ একর জমির উপর ছোট্ট পরিসরে মসজিদ এবং এর সামনে ঈদগাহ মাঠ তৈরি করা হয়। মসজিদটি নির্মাণে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন হোসেনপুর গ্রামবাসী। পরবর্তীতে একতলা ভবন করা হয়, যা ছিল সম্পূর্ণ লাল রঙের।

ঐতিহাসিক লাল মসজিদ। ছবি: বাংলানিউজ

কিন্তু ১৯৯০-৯১ সালে মসজিদের পুরাতন ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় সেটি ভেঙে একই স্থানে নতুন দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়। ওই সময় ফজলে রাব্বী হারুন নামে হোসেনপুর এলাকার এক ধনাঢ্য ব্যক্তি মসজিদটি পুণঃনির্মাণে আর্থিক সহযোগিতা করেন। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার কাজে হাত দেয় মসজিদ কমিটি। গ্রামবাসীর আর্থিক সহায়তা ও কায়িক শ্রমের মাধ্যমে ২০১৮ সালে তৃতীয় তলার নির্মাণ কাজ শেষ হয়।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা গাজী আলতাফ হোসেন (৭৩) বাংলানিউজকে  বলেন, তার মরহুম দাদা মুন্সী মেহের উল্লাহ একজন প্রখ্যাত আলেম ছিলেন। ইসলাম প্রচারে তিনি বিভিন্ন এলাতকায় যেতেন। ইসলামী সভাগুলোতে তিনি চোঙা ফুকিয়ে ওয়াজ করতেন। মুন্সী মেহের উল্লাহ হোসেনপুর এলাকায় মসজিদ স্থাপনের উদ্যোগ নেন। জমিদারের বাঁধা উপেক্ষা করে গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মসজিদটি স্থাপন করেন।

হোসেনপুর মহল্লার বয়োবৃদ্ধ বজলার রহমান অটো (৮৬) বাংলানিউজকে বলেন, মসজিদটি নির্মাণে মুন্সী মেহের উল্লাহ, দামিউল্লা মুন্সী ও হিসাব উদ্দিনের সমান অবদান রয়েছে। পাশাপাশি ওই সময়ে এলাকার মুসল্লিরাও তাদের সহযোগিতা করেন।

ঐতিহাসিক লাল মসজিদের প্রাচীন ছবি/বাংলানিউজ

মুক্তিযোদ্ধা গাজী মো. শাহজাহান আলী বলেন, আমরা শিশুকাল থেকে দেখে এসেছি-এ মসজিদটি শহরের অন্যতম মসজিদ ছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এখানে একটি সম্মেলন করেছিলেন। অপরদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সিরাজগঞ্জে এসে এই মসজিদে নামাজ পড়েছেন।

মসজিদের ইমাম ও খতিব  মাওলানা মোস্তফা মাহমুদ বাংলানিউজকে বলেন, সিরাজগঞ্জে ইসলামী জাগরণের ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এ মসজিদটিতে প্রতি জুমার নামাজে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি হাজির হন। খুতবা শোনার জন্য সিরাজগঞ্জ শহর ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলা পর্যায় থেকে মুসল্লিরা এ মসজিদে আসেন। 

তিনি আরও বলেন, মসজিদের সামনেই ঈদগাহ মাঠ। এটি এক সময় সিরাজগঞ্জের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ ছিল। মহুকুমা প্রশাসক সহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ মাঠেই ঈদের নামাজ পড়তেন।

মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুরুজ আলী মিস্ত্রী বাংলানিউজকে বলেন, মসজিদের উন্নয়নের হোসেনপুর গ্রামবাসীর বছরের পর বছর ধরে সার্বিক সহযোগিতা করে আসছেন। এ কারণে এখনও ভালভাবেই টিকে রয়েছে মসজিদটি। আর যুগ যুগ ধরেই মসজিদে গ্রহণযোগ্য ইমাম ও খতিব নিয়োগ করার ফলে মসজিদের সুনাম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

রমজানবিষয়ক যেকোনো লেখা আপনিও দিতে পারেন। লেখা পাঠাতে মেইল করুন: bn24.islam@gmail.com

বাংলাদেশ সময়: ১১৫৬ ঘন্টা, মে ২৯, ২০১৯
এমএমইউ

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন :   রমজান
        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

অপার মহিমার রমজান বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2019-05-29 11:58:08