ঢাকা, শুক্রবার, ২২ আশ্বিন ১৪২৯, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

জাতীয়

বাসে ডাকাতি-ধর্ষণ: একাধিক নারীর ওপর চলে নির্যাতন

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩১৬ ঘণ্টা, আগস্ট ৮, ২০২২
বাসে ডাকাতি-ধর্ষণ: একাধিক নারীর ওপর চলে নির্যাতন

ঢাকা:

বাসের হেলপারির ছদ্মবেশে ২০১৮ সাল থেকে যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলো মো. রতন হোসেন (২১)। তিনি এ চক্রের দলনেতা।

তার অধীনে ১৩-১৫ জন্য সদস্যও রয়েছে। ডাকাতির ঘটনায় দুই দুইফায় সে কারাভোগও করেছেন। দ্বিতীয় দফায় ৯ মাস কারাভোগের পর জামিনে বের হয়ে আসে এবং পুনরায় যাত্রীবাহী বাসে ডাকাতি সংঘটিত করে দলনেতা রতন হোসেন।

সম্প্রতি কুষ্টিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জ গামী ঈগল এক্সপ্রেসের যাত্রীবাহী একটি বাসে ডাকাতির সময় দলবদ্ধ ধর্ষণের পাশাপাশি একাধিক নারীর শ্লীলতাহানিও করে ডাকাত দলের সদস্যরা।

র‍্যাব বলছে, রাত্রিকালীন কোচ ঈগল এক্সপ্রেসের ওই বাসে মোট ২৪ জন যাত্রী ছিল। এদের মধ্যে ৫-৭ জন ছিলেন নারী যাত্রী। ওই বাসে ১৩ জন ডাকাত সদস্য অস্ত্রের মুখে সব যাত্রীকে জিম্মি করে ফেলে। যাত্রীদের বাসের জানালার পর্দা দিয়ে হাত-পা বেধে ফেলা হয়। ডাকাত দলের সদস্যরা নারী যাত্রীদের মধ্যে একজনকে দলবদ্ধ ভাবে ধর্ষণ করে। পাশাপাশি একাধিক নারীর শ্লীলতাহানি করে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

গত ২ আগস্ট রাতে সংঘটিত টাংগাইল মহাসড়কে চলন্ত বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী রতন হোসেনসহ চক্রের ১০  সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-১২ ও ১৪)।  

রোববার (৭ আগস্ট) রাজধানীর ঢাকা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে র‍্যাব। গ্রেফতার ডাকাত দলের বাকি সদস্য রা হলেন- মো. আলাউদ্দিন (২৪), মো. সোহাগ মন্ডল (২০), খন্দকার মো. হাসমত আলী ওরফে দীপু (২৩), মো. বাবু হোসেন ওরফে জুলহাস (২১), মো. জীবন (২১), মো. আব্দুল মান্নান (২২), মো. নাঈম সরকার (১৯), রাসেল তালুকদার (৩২) ও  আসলাম তালুকদার ওরফে রায়হান (১৮)। অভিযানে তাদের কাছ থেকে ২০টি মোবাইল, ২টি রূপার চুড়ি, ১৪টি সিমকার্ড ও ডাকাতিতে ব্যবহৃত ১টি দেশিয় অস্ত্র (ক্ষুর) জব্দ করা হয়।

সোমবার (৮ আগস্ট) বেলা ১২ টার দিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, গত ২ আগস্ট সন্ধ্যায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থেকে ঈগল এক্সপ্রেসের একটি বাস নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিরাজগঞ্জের একটি খাবারের হোটেলে যাত্রাবিরতি নেয় বাসটি। সেখান থেকে ছেড়ে আসার পর তিন দফায় যাত্রী সেজে ওই বাসে ওঠেন ডাকাত চক্রের সদস্যরা। ওই বাসে ডাকাত দলের ১৩ সদস্য ডাকাতি ও এক নারী যাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় ৩ আগস্ট ওই বাসের এক যাত্রী বাদি হয়ে মধুপুর থানায় অজ্ঞাত ১০/১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। অভিযোগের ছায়া তদন্ত করে ডাকাত দলের মুলহোতাসহ ১০ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তবে এর আগে এ চক্রের তিন সদস্যকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিলো।

র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ডাকাত সদস্যরা জানায়- দলনেতা রতন হোসেন বাস ডাকাতির ঘটনার ৩ দিন আগে তার সহযোগী রাজা মিয়াকে প্রস্তাব দেয়। এরপর রাজা তাদের দলের অন্যান্য সদস্যদের সংঘটিত করে। গ্রেফতার রতন, মান্নান, জীবন, দীপু, আউয়াল ও নুরনবীকে ডাকাতির পরিকল্পনার কথা জানায় এবং দলের অন্যতম সদস্য মান্নান তার সহযোগী সোহাগ, আসলাম, রাসেল, নাঈম ও আলাউদ্দিনকে নিয়ে ডাকাতিতে যোগ দেয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী রতন ডাকাতি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৫ হাজার টাকার একটি ফান্ড তৈরি করে। পরে ডাকাত সদস্যরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে যায়। পরিকল্পনা মোতাবেক, রতন ডাকাত ২ আগস্ট রাতে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা মোড়ের একটি দোকান থেকে ডাকাতি কাজে ব্যবহৃত ৪টি চাকু, ২টি ধারালো কাঁচি ও ১টি ক্ষুর কিনে এবং তা ব্যাগে ভরে সঙ্গে নিয়ে যায়। পরে তারা ওই রাত ১টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহনের বাসটি সিরাজগঞ্জ রোড মোড়ে থামিয়ে যাত্রীবেশে রতন, রাজা, মান্নান ও নুরনবী উঠে। পরে আরও দুই দফায় ডাকাত দলের অন্য সদস্যরা বাসটিতে যাত্রীবেশে ওঠে।

বাসটি যখন বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু এলাকা পার করে, তখন দলনেতা রতন সবাইকে চাকু ও ধারালো কাঁচি দেয়। আউয়াল ডাকাত ধূমপানের কথা বলে বাসের গেটের কাছে যায় এবং অন্যান্যদের ইশারা দিলে রাজা, রতন, মান্নান ও নূরনবী ড্রাইভিং সিটের কাছে গিয়ে চালককে জিম্মি করে এবং বাসটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।  

ডাকাত দলের বাকি সদস্যরা বাসের চালক ও সুপারভাইজার, হেলপারসহ যাত্রীদের হাত-মুখ বেঁধে ফেলে। তারা যাত্রীদের সঙ্গে থাকা নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নেয়। সেখানে এক নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানি করে। পরে বাসটি যখন টাঙ্গাইলের হাটুভাঙ্গা মোড় হয়ে মধুপুরে ঢুকে তখন ডাকাত সদস্যদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বাকবিতণ্ডা ঘটে এতে বাসের স্টেয়ারিংয়ে থাকা রতন পেছনে তাকালে বাসটি রাস্তার পাশের বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা লেগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে বালুর মধ্যে পড়ে যায়। তখন ডাকাত সদস্যরা সবাই লুণ্ঠিত মালামাল নিয়ে বাস থেকে পালিয়ে যায়৷

খন্দকার আল মঈন বলেন, আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই বাসে থাকা এক নারী যাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং অন্য নারী যাত্রীদের শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটায় বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা আরও জানায়, সেখান থেকে ডাকাত সদস্যরা টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকায় যায় এবং অটোরিকশাযোগে মধুপুরের কুড়ালিয়া এলাকায় রতনের এক আত্মীয়ের ফাঁকা বাড়িতে গিয়ে অবস্থান করে। সেখানে লুণ্ঠিত মালামাল ভাগবাটোয়ারা করে রতন গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকায় আত্মগোপন করে। গ্রেফতার মান্নান, আলাউদ্দিন ও বাবু আশুলিয়ার জিরানী বাজার এলাকায় আত্মগোপন করে। আসলাম, নাঈম, রাসেল প্রথমে নিজের এলাকায় ও পরবর্তীতে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ এলাকায় আত্মগোপন করে। ডাকাত জীবন কোনাবাড়ীতে এবং দীপু গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকায় আত্মগোপন করে।

হেলপার থেকে দুর্ধর্ষ ডাকাত রতন:

ডাকাত দলের মুলহোতা রতন হোসেন পেশায় গাড়ীর হেলপার। তার বিরুদ্ধে আগেও ডাকাতির অভিযোগ রয়েছে। রতন ২০১৮ সালে গ্রেফতার আসামি নূরনবী, জীবন ও অন্যান্য কয়েকজনকে নিয়ে রোড ব্লক করে সাভার পরিবহনের একটি বাস ডাকাতি করেছিলো। ওই ঘটনায় রতন গ্রেফতার হয়ে দেড় বছর কারাভোগ করে। জামিনে বের হয়ে ২০২০ সালে পুনরায় ডাকাতি করেন৷ গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি অটোরিকশা ছিনতাই করার ঘটনায় তিনি আবারও গ্রেফতার হন। নয় মাস কারাভোগের পর জামিনে বের হয়ে তার সিন্ডিকেট নিয়ে সাভার, গাজীপুর বা সিরাজগঞ্জ এলাকায় মহাসড়কে আরও বেশ কয়েকটি ডাকাতি শুরু করে।

আসামি জীবন পেশায় গাড়ির হেলপার। হেলপার পেশার আড়ালে সে বেশ কয়েকটি পরিবহন ডাকাতিতে অংশ নেন। তিনি যাত্রীদের মালামাল লুটের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে। ২০১৮ ও ২০২০ সালে দুটি ডাকাতির মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করেন। অপর আসামি মান্নান গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। সে ২০১৯ সালে আশুলিয়া থানায় একটি চুরির মামলায় কারাভোগ করে। তার অধীনে রয়েছে ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক শ্রমিক চাকরিরত আলাউদ্দিন, সোহাগ, বাবু, দীপু, রাসেল, রায়হান, নাঈম।  

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার আল মঈন বলেন, আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই বাসে থাকা এক নারী যাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং অন্য নারী যাত্রীদের শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটায় বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন:

চলন্ত বাস কব্জায় নিয়ে তিন ঘণ্টা ধরে ডাকাতি, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ

টাঙ্গাইলে বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণ: মূল হোতা গ্রেফতার

চোখ বাঁধা অবস্থায় ৬ ডাকাতের ধর্ষণের শিকার হন তিনি

পরনের পোশাক খুলে চোখ-মুখ বাঁধা হয় বাসযাত্রীদের

বাংলাদেশ সময়: ১৩১৫ ঘণ্টা, আগস্ট ০৮, ২০২২
এসজেএ/এনএইচআর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa