ঢাকা, রবিবার, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৪ আগস্ট ২০২২, ১৫ মহররম ১৪৪৪

জাতীয়

খুলনায় চুইঝালের কেজি দুই হাজার টাকা!

মাহবুবুর রহমান মুন্না, ব্যুরো এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২১৩৪ ঘণ্টা, জুলাই ৬, ২০২২
খুলনায় চুইঝালের কেজি দুই হাজার টাকা!

খুলনা: চুইঝাল ছাড়া খুলনাঞ্চলে কোরবানির মাংস রান্না হয়ই না। যে কারণে এ অঞ্চলের খাদ্যভাণ্ডারের অমূল্য কোহিনূর বলা হয় চুইঝালকে।

চুইঝাল মাংসের স্বাদ বাড়ানোর জন্য এখানে চুইঝাল ব্যবহারের প্রচলন দীর্ঘদিনের। প্রতিবার ঈদের সময় চুইঝালের দাম বেড়ে যায়। এবার খুলনার  হাট-বাজারে চুইঝাল বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৪০০ টাকা থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুগ যুগ ধরে খুলনার ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে রয়েছে এই চুইঝাল, যা ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করছে সর্বত্র।

বুধবার (০৬ জুলাই) সন্ধ্যায় খুলনার বড় বাজারের মহিত শেখ বলেন, ফুলতলার বিভিন্ন গ্রামের চুইঝাল এনে বিক্রি করি। চুই ঝালের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ভালো মানের চুইঝাল ২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

চুইঝাল ব্যবসায়ী শাহীন ব্যাপারী বলেন, এবার চুইঝালের দাম একটু বেশি। ক্রমান্বয়ে জমে উঠেছে চুইঝাল বেচা-কেনা। ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে চুইঝাল বিক্রি হচ্ছে। তবে কোরবানির দুই একদিন আগে দাম আরও বাড়বে।

একই বাজারের চুইঝাল ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম বলেন, খুলনাঞ্চলের ঐহিত্যবাহী চুইঝাল পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করে থাকি। চুইঝাল ছাড়া মাংস খেতে চায় না খুলনার মানুষ। খাবারের মেন্যুতে কোনো না কোনোভাবে চুই থাকলে তারা খুশি হন। যে কারণে ভোজনবিলাসীদের চাহিদা মেটাতে আমরা সব ধরনের চুইঝাল রেখেছি।  

 

বুধবার (০৬ জুলাই) বিকেলে বড়বাজারে চুইঝাল কিনতে আসা লাভলু বলেন, কোরবানির ঈদে বাজারে চুইঝালের ব্যাপক চাহিদা বেড়ে যায়। তবে এবার একটু দাম বেশি।

অনলাইনেও খুলনার চুইঝাল বিক্রি চলছে। এ প্রসঙ্গে অনলাইনে চুইঝাল বিক্রেতা ঐতিহ্যের মালিক মো. জাহিদুল রাহমান বাংলানিউজকে বলেন, খুলনার চুই ঝালের চাহিদা সারা দেশ জুড়ে রয়েছে। তবে কোরবানির সময় চুইঝালের চাহিদা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। যে কারণে বিভিন্ন জেলা থেকে চুইঝালের অর্ডার পেয়ে সরবরাহ করেছি।

কোরবানি এলে চুই ঝালের সবচেয়ে বেশি কদর বাড়ে বলে জানান সেরা রাঁধুনী খুলনার মেয়ে রন্ধনশিল্পী নাদিয়া নাতাশা।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, চুইঝাল খুলনা বাগেরহাট অঞ্চলের অনেক বিখ্যাত। এটা মূলত একধরনের লতা জাতীয় গাছ। গাছের কাণ্ডকে কেটে ছোট ছোট টুকরো করে রান্নাতে দেওয়া হয়। গরু, খাসি, হাসের মাংসে ব্যবহার হয়। ঝাঝালো স্বাদের এই চুইঝাল ব্যবহারের কারণে মাংসের স্বাদ পরিবর্তন হয়ে যায়, মাংসের স্বাদ ও গন্ধ দুটোই পরিবর্তন হয় চুই ঝাল দেওয়ার কারণে। চুইঝাল ও সঙ্গে আস্ত রসুন দিয়ে মাংস রান্নাটা তাই অন্যরকমের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে খুলনাসহ সারা দেশেই। এর স্বাদের পাশাপাশি বিভিন্ন ওষুধি গুণাবলী রয়েছে। হজমে সহায়তা করে, হজমে সাহায্য করে ও হ্মুধামন্দা দূর করে।

জানা যায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল ও বাগেরহাট এলাকায় জনপ্রিয় একটি মসলা হলো চুইঝাল। বর্তমানে দেশের অন্যান্য জেলাতেও মসলা হিসেবে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এ অঞ্চলে মাংস রান্নার এক অন্যতম অনুষঙ্গ চুইঝাল। গরু কিংবা খাসির মাংসে যেন এক আলাদা স্বাদ এনে দেয় চুইঝাল। নামেই বোঝা যায় এটি স্বাদে ঝাল, কিন্তু এই ঝাল একটু আলাদা। এর রয়েছে একটি আলাদা গন্ধ যা তরকারি বা রান্না মাংসে আনে আলাদা এক আমেজ। মাংসের স্বাদ বাড়ানোর জন্য চুইঝাল ব্যবহারের প্রচলন যুগ যুগ ধরে। যে কারণে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চুই ঝালের দাম বেড়ে যায়। খুলনার সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিকভাবে চুইঝালের চাষ হয় ডুমুরিয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায়।

চুইঝাল মূলত তিন ধরনের হয়ে থাকে:

এঁটো চুই: গাছের মোথা বা মূলের অংশটিকে এঁটো চুই বলে। এটি সব থেকে ভালো এবং সুস্বাদু, গালে দিলে একদম গলে যায়। এর দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় শহরাঞ্চলে খুব বেশি পাওয়া যায় না।

গাছ চুই: মোটা ডাল বা কাণ্ডগুলোকে গাছ চুই বলে। এটাও বেশ সুস্বাদু। সহজে গলে যায় বিধায় এই চুইয়েরও রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা।

ডাল চুই: গাছের সরু ডাল বা কাণ্ডকে ডাল চুই বলে। এগুলোতে আঁশের পরিমাণ বেশি থাকে। স্বাদের ভিন্নতার কারণে অনেকেই এই চুইও পছন্দ করেন।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনায় বাণিজ্যিকভাবে চুইঝালের চাষ বাড়ছে। অল্প জায়গায় চারা উৎপাদন করা যায় বলে এটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব অনেক বেশি। খুলনার কৃষকদের সফলতা দেখে বিভিন্ন উপজেলার মানুষ চুই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। বর্তমানে চাহিদা এত বাড়ছে যে চারা উৎপাদনে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকেরা।  

বাংলাদেশ সময়: ২১৩৩ ঘণ্টা, জুলাই ০৬, ২০২২
এমআরএম/আরআইএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa