ঢাকা, সোমবার, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৩ মে ২০২২, ২১ শাওয়াল ১৪৪৩

জাতীয়

খুঁজছে হারিয়ে যাওয়া লাল জুতা, হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ছে মাকে

আবাদুজ্জামান শিমুল, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮২৬ ঘণ্টা, জানুয়ারি ২২, ২০২২
খুঁজছে হারিয়ে যাওয়া লাল জুতা, হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ছে মাকে

ঢাকা: ‘আইছিলাম লাল জুতা পইর‌্যা, আমার লাল জুতা কই? আমার মা কই। ’ যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলে মা ও শিশু হাসপাতালের সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় মা-বাবা ও নানাকে হারিয়ে মামি সোনিয়া পারভীন মনির পাশে বসে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে এভাবেই বিলাপ করছিল বেঁচে যাওয়া আহত শিশু শাকিরা মিষ্টি।

শনিবার (২২ জানুয়ারি) বিকেলে ঢামেক হাসপাতালের ২০৩ নম্বর ওয়ার্ডের ১০ নম্বর বেডে গিয়ে দেখা যায় মামি ও তার বোন শিরিন সুলতানা শাকিরাকে দেখভাল করছেন।

পরে চিকিৎসকের পরামর্শে শিশুটিকে কোলে নিয়ে শিরিন সুলতানা সিটি স্ক্যানসহ বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে নিয়ে যায়। যেতে যেতে কোলে থাকা শিশু শাকিরা বলছিল, ‘আমার লাল জুতা কই? মামা আমাকে লাল জুতা কিনে দিয়েছে। ’  তখন তার পায়ে ছিল শুধু মোজা। হঠাৎ আবার বলতে থাকে  ‘আমি মার কাছে যামু, আমার মা কই?’

মামি সোনিয়া পারভীন মনি জানান, শনিবার দুর্ঘটনার কথা তার কিছুই মনে নেই। তাকে আর মনে করাতেও চাই না। বাচ্চা মানুষ, শুধু একটু পর পর খালি বলছে মা কই? আমি মায়ের কাছে যাব। তখন  তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলি তোমার নানু অসুস্থ, তোমার মা নানুর কাছে। তখন সে বলে আমি বাড়ি যাব, আমার মায়ের কাছে যাব।

আজকে হঠাৎ বলছে, তার এক মামা আছে, তিনি লাল জুতা কিনে দিয়েছেন। দুর্ঘটনায় সময় তার লাল জুতাটা মনে হয় হারিয়ে গেছে। বারবার এক কথাই বলছে, আমার লাল জুতা কই, আমি মার কাছে যামু, আমার লাল জুতা দাও।

আহত শিশুর মামী  সোনিয়া  পারভীন মনি জানান, শাকিরার বাবা-মা ও নানার মরদেহ নিয়ে পরিবারের অন্যান্য  সবাই বাড়ি গেছেন দাফনের জন্য। শাকিরাকে দেখভালের জন্য আমি আছি। আজকে (শনিবার) সাভার থেকে আমার বড় বোন এসেছে।

তিনি আরও জানান, শিশুটির সিটি স্ক্যান থেকে শুরু করে যাবতীয় সব পরীক্ষা হাসপাতালের পরিচালক ফ্রি করে দিয়েছেন। শাকিরা শুক্রবার মধ্য রাতে ঘুম থেকে উঠে বলছে আমার বুক ব্যথা করে, পেট ব্যথা করে।

মামি মনি বলেন, শাকিরার বড় ভাই শাহরিয়া (১১) কয়েক দিন আগে গ্রাম থেকে যাত্রাবাড়ীতে মামার বাসায় বেড়াতে আসে। ঘটনার সময় সে মামার বাসায় ছিল। শাকিরার বাবা গ্রামে একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। তিনি আরও জানান,মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতালে শিশুটির নানী সাহেদা বেগম চিকিৎসাধীন আছেন, তাকেও জানানো হয়নি তার স্বামী, মেয়ে ও মেয়ের জামাই মারা গেছেন।   হাসপাতালে ভর্তি কাগজে  শাকিরার ভুল নাম লিপিবদ্ধ হয়েছে। তার নাম বৃষ্টি না, শাকিরা মিষ্টি।

ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হক জানান, কিছুক্ষণ পরপরই শিশুটির খবর নেওয়া হচ্ছে। তার লোকজনদের বলা হয়েছে কোন সমস্যা হলেই যেন সরাসরি আমাকে জানায়।
শিশুটি শঙ্কামুক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। সব রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করে শনিবার (২২ জানুয়ারি) আবার চিকিৎসকরা বিস্তারিত জানাবেন।

এদিকে যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম  জানান, এই দুর্ঘটনায় শুক্রবার (২১ জানুয়ারি) রাতেই থানায় একটি মামলা হয়েছে (মামলা নম্বর ১০০)  সেন্টমার্টিন পরিবহনের ঘাতক বাসটি জব্দ করা হয়েছে। সেটা রাজধানীর আরামবাগ থেকে কক্সবাজার লাইনে চলাচল করে। শনিবার চালক ও হেলপারকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।

উল্লেখ্য, শুক্রবার (২১ জানুয়ারি) সকাল ৭টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানাধীন মাতুয়াইল মা ও শিশু হাসপাতাল সংলগ্ন রাস্তায় একটি বাসের ধাক্কায় সিএনজি চালিত অটোরিকশার চালকসহ ৫ জন আহত হন। পরে পাঁচ জনকে আহত অবস্থায় পুলিশ ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তিন জনকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতরা হলেন- আব্দুর রহমান (৬৫), তার মেয়ে শারমিন আক্তার (৩৫) এবং শারমিনের স্বামী রিয়াজুল (৪৫)। আহত হয়েছেন শারমিনের মেয়ে শাকিরা মিষ্টি (৬) ও অটোরিকশা চালক রফিক (৪২)

>>> আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে বাসের ধাক্কায় একই পরিবারের ৩ জন নিহত
এজেডএস/এমএমজেড

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa