ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

জাতীয়

বাঁকখালীতে ভাসল পাঁচ কল্প জাহাজ

সুনীল বড়য়া, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০৩৬ ঘণ্টা, অক্টোবর ২১, ২০২১
বাঁকখালীতে ভাসল পাঁচ কল্প জাহাজ

কক্সবাজার: বাঁশ, কাঠ, বেত ও রঙিন কাগজের উপর অপূর্ব কারু কাজে তৈরি জাহাজগুলো ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে নদীর এপার থেকে ওপারে। আর সেই জাহাজের ওপরে চলছে বৌদ্ধ কীর্তন- ‘বুদ্ধ ধর্ম সংঘের নাম সবাই বলো রে, বুদ্ধের মতো এমন দয়াল আর নাইরে’।

বলছিলাম কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধদের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী জাহাজ ভাসা উৎসবের কথা। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূণিমা উপলক্ষে রামুর বাঁকখালী নদীতে এ উৎসব উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে বসেছিল হাজারো নর-নারীর মিলন মেলা। এ বছর ভাসানো হয় পাঁচটি কল্প জাহাজ। দুপুরে শুরু হওয়া এ উৎসব চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।  

উৎসবস্থলে দেখা গেছে, পাঁচ থেকে ছয়টি নৌকার উপর বসানো হয়েছে এক একটি কল্প জাহাজ। রঙ-বেরঙয়ের কাগজ আর বাঁশ ও কাঠের অর্পূব কারু কাজে তৈরি প্রতিটি জাহাজই নজর কাড়া। আকর্ষণীয় নির্মাণ শৈলী আর বৈচিত্রে ভরা প্রতিটি জাহাজ।

প্রতিটি জাহাজের মাইকে বাজছে বুদ্ধ কীর্তন- ‘বুদ্ধ ধর্ম সংঘের নাম সবাই বলো রে, বুদ্ধের মতো এমন দয়াল আর নাইরে’। নদীতে ভাসতে ভাসতে জাহাজগুলো যাচ্ছে নদীর এপার থেকে ওপারে।  

নদীতে ভাসছে রঙিন সব জাহাজ। সত্যিই দেখতে অসাধারণ প্রাণবন্ত এক উৎসব। এখানে না এলে বুঝতে পারতাম না কল্প জাহাজগুলো কতটা দৃষ্টিনন্দন হয়। এ উৎসব ঘিরে কতটা আনন্দ উচ্ছ্বাস চলে। কথাগুলো বলছেন অ্যাডভোকেট আশীষ বড়ুয়া।  

চট্টগ্রাম থেকে উৎসবে আসেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক সুবীর মহাজন।  

তিনি বলেন, শুধুমাত্র এ উৎসব দেখার জন্য এখানে আসা। সত্যিই চমৎকার একটি আয়োজন। আমাদের শেকড়ের সংস্কৃতি বা লোক সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এ ধরনের উৎসবকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।  

বাঁশ ও কাগজের তৈরি প্রতিটি জাহাজের নির্মাণ শৈলী অসাধারণ। শিল্পগুণ তো আছেই, এসব জাহাজকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষের যে নির্মল আনন্দ এটিই সত্যিই অভিভূত হয়েছি। যোগ করেন- সুবীর মহাজন।  

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মতে, মহামতি বুদ্ধ রাজগৃহ থেকে বৈশালী যাওয়ার সময়  নাগলোকের মহাঋদ্ধিমান (অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন) নাগেরা চিন্তা করলেন বুদ্ধপূজার এ দুর্লভ সুযোগ তারা হাত ছাড়া করবেন না। সঙ্গে সঙ্গে নাগলোকের পাঁচশত নাগরাজ বিমানের (জাহাজের) মতো পাঁচশত ঋদ্ধিময় ফনা বুদ্ধপ্রমুখ পাঁচশত ভিক্ষুসংঘের মাথার উপর বিস্তার করল।  

এভাবে নাগদের পূজা করতে দেখে দেবলোকের দেবতারা, ব্রহ্ম লোকের ব্রহ্মরা বুদ্ধকে পূজা করতে এসেছিলেন। সেদিন মানুষ, দেবতা, ব্রহ্মা, নাগ সবাই শ্বেতছত্র ধারণ করে ধর্মীয় ধবজা উড্ডয়ন করে বুদ্ধকে পূজা করেছিলেন। বুদ্ধ সেই পূজা গ্রহণ করে পুনরায় রাজগৃহে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।  

সেই শুভ সন্ধিক্ষণ ছিল শুভ প্রবারণা দিবস। মূলত এ স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য বাংলাদেশের বৌদ্ধরা বিশেষ করে রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায় প্রবারণা পূণিমায় বাঁকখালী নদীতে জাহাজ ভাসা উৎসবের আয়োজন করে থাকে।  

কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি ও রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের সহকারী পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বাংলানিউজকে বলেন, আজ থেকে দুইশ বছর আগে এ জাহাজ ভাসা উৎসবের প্রচলন হয় পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে। সে দেশের মুরহন ঘা নামক স্থানে একটি নদীতে মংরাজ ম্রাজংব্রান প্রথম এ উৎসবের আয়োজন করেন। প্রবারণা পূর্ণিমায় একসঙ্গে মিলিত হবার জন্য এ আয়োজন চলতো। সেখান থেকে বাংলাদেশের রামুতে এ উৎসবের প্রচলন। প্রায় শত বছর ধরে রামুতে মহাসমারোহে এ উৎসব হয়ে আসছে।

বাংলাদেশ সময়: ২০৩৪ ঘণ্টা, অক্টোবর ২১, ২০২১
এসবি/আরবি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa