ঢাকা, সোমবার, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮, ০২ আগস্ট ২০২১, ২২ জিলহজ ১৪৪২

জাতীয়

ঈদের দিনেও করোনা রোগীদের পাশে জয় বাংলা অক্সিজেন 

সোলায়মান হাজারী ডালিম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮৩৬ ঘণ্টা, জুলাই ২১, ২০২১
ঈদের দিনেও করোনা রোগীদের পাশে জয় বাংলা অক্সিজেন 

ফেনী: সবাই যখন ঈদের আনন্দ করছিল ঠিক তখন হাসপাতালে বেডে কিছু মানুষ কাঁতরাচ্ছে শ্বাস কষ্টে। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়ালো সেই মানুষগুলো।

প্রয়োজন একটু অক্সিজেন। এসব মানুষের চিন্তা করে তারা ঈদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে ছুটে চলেছেন রোগীদের দার প্রান্তে।  

ঈদের দিন বুধবার (২১ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সারাদেশে ১৭ জন রোগীর জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার বিতরণ করেছেন জয় বাংলা অক্সিজেন সার্ভিসের স্বেচ্ছাসেবকরা।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাবেক স্বাধীনতা, সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী বলেন, অসুস্থতার যেহেতু কোনো দিন নেই, তাই আমরা যেকোনো পরিস্থিতিতে সেবা অব্যাহত রেখেছি।

তিনি বলেন, ঈদের দিনে বাসায় অক্সিজেনসেবা পেয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের চোখে-মুখে এবং আচরণে যে কৃতজ্ঞতাবোধ এবং ভালোবাসা দেখেছি তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।

সাদ বলেন, আগেও বলেছি, এখনো বলছি সেবা অব্যাহত থাকবে এই সংকট অবসান না হওয়া পর্যন্ত।

সাদ আরও বলেন, করোনা  আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যু। আক্রান্ত রোগীর অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে শ্বাসকষ্টের সমস্যা অন্যতম। এরই মধ্যে অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজারে অক্সিজেনের দাম বাড়িয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে এমন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি আমরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাবেক স্বাধীনতা, সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন তরুণ শুরু করেন বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবার কার্যক্রম। মাত্র ছয়টি সিলিন্ডার দিয়ে শুরু হওয়া এই মানবিক কার্যক্রমের নাম দেওয়া হয়- ‘জয় বাংলা অক্সিজেন সার্ভিস’।

‘একটি নতুন ভোরের প্রতীক্ষা’ স্লোগানে সংস্থাটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০২০ সালে ২৫ জুন। এক বছর এক মাসে ‘জয়বাংলা অক্সিজেন সার্ভিস’ থেকে সেবা পেয়েছেন আট হাজার ৪২৭ জন।

শুরুতে শুধু করোনা রোগীর জন্য সেবা চালু থাকলেও বর্তমানে যেকোনো রোগী চিকিৎসকের পরামর্শপত্র দেখিয়ে এ সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। এই মানবিক কার্যক্রমে সাদ’-এর সঙ্গী ছাত্রলীগের উপ-বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক সবুর খান কলিন্স এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম সবুজ।

সেবা দিতে গিয়ে নিজেরাও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। বৃদ্ধ বাবা-মাসহ সাদ’-এর পরিবারের সবাই হয়েছিলেন করোনা আক্রান্ত। কিন্তু থেমে থাকেননি তারা। মানবিক কার্যক্রমে নিজেদের যুক্ত রেখেছেন এখনো পর্যন্ত।

উদ্যোক্তারা জানান, ২০২০ সালের ২৫ জুন রাজধানীতে শুরু হয় এই সেবা। এরপর ২৫ ও ২৯ জুলাই আরো দু’টি বিভাগীয় শহর চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে কার্যক্রম শুরু করে তারা।  

একই বছরের ৬ আগস্ট শুরু হয় কুরিয়ারের মাধ্যমে সারাদেশে করোনা আক্রান্ত রোগীকে অক্সিজেন সরবরাহ কার্যক্রম। ৩ আগস্ট ফেনী জেলার মাধ্যমে শুরু হয় জেলাভিত্তিক কার্যক্রম। এরপর ৮ নভেম্বর লক্ষ্মীপুর জেলায় ও ২৬ নভেম্বর শুরু হয় বগুড়া জেলায় অক্সিজেন সেবা পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম। বর্তমানে কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ এবং খুলনায় এ কার্যক্রম চলছে। এছাড়া কুরিয়ারে সারাদেশেই পাঠানো হচ্ছে অক্সিজেন সেবা।  

সাদ বিন কাদের চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমরা গতবছর ২৫ জুন থেকে চালু করি বিনামূল্যে জয় বাংলা অক্সিজেন সেবা। তখন আসলে পরিস্থিতি বর্তমানের মতো ছিল না। চারদিকে করোনা নিয়ে মারাত্মক ভীতি ছিল। আমরা যখন অক্সিজেন নিয়ে কারো বাসায় যেতাম তখন আশে পাশের বাসা থেকে আমাদের বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো। তবে সময় পাল্টেছে। কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এই সময়টা আমাদের জন্য সংগ্রামের। মানুষের পাশে থাকার সংগ্রাম। মানুষের ভালোবাসার জন্যই এই সংগ্রামের পথ আমরা পাড়ি দিতে সক্ষম হয়েছি। এতে আনন্দ যেমন দেখেছি, ঠিক তেমনি আর্তনাদের সাক্ষী হয়েছি। অন্যের প্রিয়জন হারানোর বেদনা আমাদের ব্যথিত করেছে।

তিনি বলেন, অনেক সময় রোগীর চাপ এত বেশি থাকে যে সবাইকে আমরা অক্সিজেন সিলিন্ডার দিতে পারি না। অনেক সময় আমরা দোকান থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার ভাড়া নিয়ে এবং ভাড়ার মূল্য পরিশোধ করে সেবা দিয়েছি। কিন্তু কিছু সময় থাকে যখন তাদের কাছেও সিলিন্ডার থাকে না। তখন আমরা অতিরিক্ত এই রোগীদের আমাদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে পারি না। তখন আমরা ব্যথিত হই। এই বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের। এ মহামারিতে অনেকে তার প্রিয়জন হারিয়েছেন। এই হারানোর লাইনটা আর দীর্ঘ না হোক সেটি প্রত্যাশা। মানুষের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়ে দিনে ২৪ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে সাত দিন সেবা অব্যাহত রেখেছি আমরা। আমাদের অন্তপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক বন্ধুদের জন্য এটি সম্ভব হয়েছে। আমাদের অনেক স্বেচ্ছাসেবক এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় এবং মানুষের দোয়ায় আমরা সবাই ভালো আছি। সারাদেশে আমাদের প্রায় ১৫০ জন এর মতো স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে।

সাদ বলেন, ব্যক্তিগত পারিবারিক উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণি পেশার মানুষের সহযোগিতায় এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আর্থিক লেনদেনকে নিরুৎসাহিত করে থাকি। আমরা পণ্য গ্রহণ করে থাকি। আমরা প্রতি মাসে একবার করে আর্থিক বিবরণীর হিসেব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা বিশ্বাস করি কাজের স্বচ্ছতা কাজকে গতিশীল করে।

সাদ অরও বলেন, তাদের সেবাটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। সেবার জন্য কোনো যাতায়াত ভাড়া নেই। এমনকি কোনো জামানতও জমা দিতে হয় না। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন থাকা সাপেক্ষে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই সেবাটি আমরা মানুষের বাসায় পৌঁছে দেই।  
 
‘একটি নতুন ভোরের প্রতীক্ষা’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে আমরা সারাদেশে ধাপে-ধাপে চালু করি বিনামূল্যে জয় বাংলা অক্সিজেন সেবা। এ দুর্যোগে যারা মানবিকতার হাতকে প্রশস্ত করেছেন সবার কাছে কৃতজ্ঞতা পোষণ করছি। আমারা বিশ্বাস করি করোনামুক্ত যে নতুন ভোরের স্বপ্ন আমরা দেখি সে ভোর খুব বেশি দূরে নয়।

বাংলাদেশ সময়: ১৮৩৬ ঘণ্টা, জুলাই ২১, ২০২১
এসএইচডি/আরআইএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa