ঢাকা, সোমবার, ৯ কার্তিক ১৪২৮, ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জাতীয়

সদস্যদের ‘মনস্তাত্ত্বিক অনুশোচনা’ জাগ্রত করতেন গুনবি

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৭৫৫ ঘণ্টা, জুলাই ১৬, ২০২১
সদস্যদের ‘মনস্তাত্ত্বিক অনুশোচনা’ জাগ্রত করতেন গুনবি

ঢাকা: বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন/প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত থেকে ভেতরে ভেতরে উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার করে জঙ্গি সদস্য তৈরিতে ‘ছায়া সংগঠন’ পরিচালনা করে আসছিলেন মাহমুদ হাসান গুনবি ওরফে হাসান। জঙ্গিবাদ প্রশিক্ষণে গুনবি একজন ‘মানহাজী’ সদস্য ছিলেন।

তার কাজ ছিল মাদরাসাছাত্র ও অন্য ধর্ম থেকে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করা সদস্যদের ‘মনস্তাত্ত্বিক অনুশোচনা’ জাগ্রত করা।

শুক্রবার (১৬ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

এর আগে গত ১৫ জুলাই দিনগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর শাহ আলী থানার বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকা থেকে আনসার আল ইসলামের আধ্যাত্মিক নেতা মাহমুদ হাসান গুনবি ওরফে হাসান ওরফে গুনবিকে (৩৬) গ্রেফতার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৪)। এ সময় তার কাছ থেকে উগ্রবাদী বই ও লিফলেট উদ্ধার করা হয়। তার গ্রমের বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার গুনবতী গ্রামে।  

খন্দকার আল মঈন বলেন, গত ৫ মে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ঢাকা থেকে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গি আল সাকিব (২০) ও ওসামার মতাদর্শ পরিবর্তন করে আত্মঘাতী পন্থায় উদ্বুদ্ধ করার পেছনে মাহমুদ হাসান গুনবি ওরফে হাসানের বিশেষ ভূমিকা ছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকায় জড়ো হয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা করা।  

তিনি বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্য আল সাকিব ও ওসামা গ্রেফতারের পর থেকে গত মে মাসের প্রথম দিকে গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যান গুনবি। তিনি কুমিল্লা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে গিয়ে দুর্গম এলাকায় আত্মগোপন করেন। জুনের শেষের দিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে তিনি পুনরায় স্থান পরিবর্তন করে বান্দরবানে অবস্থান নেন। সেখানে ২-৩ দিন অবস্থান করেন। পরবর্তীতে তিনি লক্ষ্মীপুরের চর গজারিয়া ও চর রমিজে ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করে বেশ কয়েকদিন পার করে দেন। এরপর তিনি আবারও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা টের পেয়ে যান এবং স্থানও পরিবর্তন করেন। অতঃপর তিনি উত্তরবঙ্গে আত্মগোপন করেন। সেখান থেকে দেশ ত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার।  

খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেফতার হওয়া গুনবি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, তিনি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ২০০৮ সালে মোহাম্মদপুরের জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া থেকে তাইসির দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ঢাকাসহ কুমিল্লা, নোয়াখালী, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সজারের বিভিন্ন মাদরাসায় শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। পাশাপাশি ধর্মীয় মতাদর্শের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। ২০১০ সাল থেকে ওয়াজ শুরু করেন তিনি। ২০১৪ সাল থেকে তিনি ধর্মীয় বক্তব্যের মাধ্যমে উগ্রবাদী প্রচার কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। এছাড়া তিনি ধর্মীয় বইয়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন।

র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গুনবি স্বীকার করেন তিনি প্রথমে হরকাতুল জিহাদের (হুজি-বি) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে জসিম উদ্দিন রহমানির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সেখান থেকেই গুনবি আনসার আল বাংলা টিম (আনসার আল ইসলাম) জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। জসিম গ্রেফতারের পর তিনি উগ্রবাদ প্রচারের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

খন্দকার আল মঈন বলেন, আনসার আল ইসলামের দাওয়াত ও প্রশিক্ষণে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে গুনবির। তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকটি মাদরাসায় খণ্ডকালীন/অতিথি বক্তা বা দীর্ঘ মেয়াদী শিক্ষকতা বা পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এসব মাদরাসায় সম্পৃক্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জঙ্গিবাদের বিস্তৃতি ঘটিয়ে আসছিলেন। সেখানে তিনি উগ্রবাদী বক্তব্য দিতেন এবং সেইসঙ্গে উগ্রবাদী বই বিস্তারের ব্যাপারে অন্যান্যদের আগ্রহী করে তোলার কাজও করতেন। এছাড়া তিনি উগ্রবাদী বইগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরবরাহ করতেন। মাদরাসার শিক্ষকদের উগ্রবাদী লেকচার/বক্তব্য দিতে উৎসাহিত করতেন।

জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ ও আত্মঘাতী জঙ্গি সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশে দর্শন বা মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন একটি আবশ্যিক বিষয়। আর সেটাই করতেন গুনবি।

গুনবি আনসার আল ইসলামের (এবিটি) একজন অন্যতম দর্শন পরিবর্তনকারী ছিলেন উল্লেখ করে র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, দর্শন পরিবর্তনের কৌশল সম্পর্কে গুনবি জানায়, তিনি সংগঠনের সদস্যদের গোপন আস্তানায় নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতেন। সেখানে তাদের মতাদর্শ ও দর্শন পরিবর্তনের কাজ করতেন। যেখানে প্রশিক্ষণার্থীরা আত্মীয়-স্বজন, পরিবার বন্ধু-বান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে এমন সব আলোচনা করতেন। সেখানে সদস্যদের বাহিরের জীবন, সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান ইত্যাদি থেকে দূরে রাখা হতো। এতে তাদের মস্তিকে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে ভয়-ভীতি তৈরি ও স্বাভাবিক জীবন সম্পর্কে বিতৃষ্ণা জাগ্রত করা হতো। এতে সদস্যদের মধ্যে তাদের আবেগ, অনুভূতি, বুদ্ধিমত্তা, পারিবারিক বন্ধন, বিচারিক জ্ঞান ইত্যাদি লোপ পায়। এভাবে কোমলমতিদের নৃশংস জঙ্গি হিসেবে গড়ে তোলা হয় সেখানে।

খন্দকার আল মঈন বলেন, গুনবি আনসার আল ইসলামের একজন আধ্যাত্মিক নেতা। তিনি নিজ পেশার আড়ালে জঙ্গিবাদ প্রচার করে আসছিলেন। তিনি একাধিক ধর্মীয় সংগঠন/প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। সংগঠন/প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতর তার ঘনিষ্টদের মধ্যে বেশ কয়েকজন জঙ্গিবাদ সংশ্লিষ্টতায় ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে। এদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম, আব্দুল হামিদ, আনিছুর রহমান ও হাসান উল্লেখযোগ্য।  

এছাড়া তিনি বিভিন্ন ইস্যুতে উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসবাদকে উস্কে দিতেন। তিনি ‘দাওয়াত ইসলাম’-এর ব্যানারে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করে জঙ্গিবাদে অন্তর্ভুক্তির বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতেন। এছাড়া তিনি মাহফিলের আড়ালে জঙ্গি সদস্য রিক্রুট করতেন।

গুনবি বাংলাদেশকে উগ্রবাদী রাষ্ট্র পরিণত করতে উগ্র মতাদর্শ প্রচার, পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার গোপন বৈঠক করেছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে সুযোগ সন্ধানের অপপ্রয়াস চালিয়েছে বলেও জানায়।

বাংলাদেশ সময়: ১৭৫৩ ঘণ্টা, জুলাই ১৬, ২০২১
এসজেএ/আরবি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa