ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ কার্তিক ১৪২৮, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জাতীয়

সড়ক থেকে সরছে মেট্রোরেলের ‘জঞ্জাল’, স্বস্তিতে নগরবাসী

মফিজুল সাদিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৭৫৯ ঘণ্টা, জুলাই ১২, ২০২১
সড়ক থেকে সরছে মেট্রোরেলের ‘জঞ্জাল’, স্বস্তিতে নগরবাসী মেট্রোরেলের নির্মাণ সামগ্রী সরাচ্ছেন শ্রমিকরা। ছবি: বাংলানিউজ

ঢাকা: ঢাকার আগারগাঁও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে রোকেয়া সরণি পর্যন্ত সড়ক থেকে মেট্রোরেলের নির্মাণ সামগ্রী সরানো হচ্ছে। বিশেষ করে কংক্রিট ও স্টিলের রোড ট্রাফিক বেরিয়ার সরানো হচ্ছে।

মূলত মেট্রোরেলের পিলার নির্মাণ করার সময় নিরাপত্তার জন্য এগুলো ব্যবহার করা হয়। এর ফলে সড়কের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সড়ক মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য বন্ধ থাকতো সব সময়। এখন মেট্রোরেলের পিলারসহ অন্যান্য কাজ সমাপ্ত হয়েছে।  

ফলে সড়কের অধিকাংশ স্থান থেকে এগুলো সরিয়ে ফেলা হচ্ছে ফলে বাড়ছে সড়কের প্রশস্ততা। সরু সড়ক এখন আগে জায়গায় ফিরছে অনেক স্থানে। ফলে স্বস্তি এসেছে নগরবসীর মধ্যে। পশ্চিম শেওড়াপাড়ার রোকেয়া সরণিতে সড়কের পাশে পান-সিগারেটের দোকান দিয়ে বসে আছেন সাহাবুদ্দিন। সড়ক থেকে মেট্রোরেলের নির্মাণ সামগ্রী সরে যাওয়ায় স্বস্তিতে তিনি।

সাহাবুদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, এখন রাস্তা অনেক বাড়ছে। আগে রাস্তায় সিমেন্টের দেওয়াল ও লোহার বেড়া ছিল। সড়কের অর্ধেকই বন্ধ থাকতো। এখন আগের মতো আর জটলা হয় না।  

সরেমজিন ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের অনেক স্থানে মেট্রোরেলের কারণে খোঁড়াখুঁড়ি নেই। এরপর পাইলিং, পিলার তৈরিসহ নানা কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন। মেট্রোরেলের প্রথম অংশ উত্তরা তৃতীয় ফেইজ থেকে আগারগাঁও এলাকার অগ্রগতি ৮৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। ফলে বলা চলে আগারগাঁও থেকে দিয়াবাড়ি পর্যন্ত সড়কে মেট্রোরেলের আর কোনো কাজ নেই। যত কাজ ভায়াডাক্টের ওপর। মাটিতে ব্যস্ততম সড়কে এই কর্মযজ্ঞ রাজধানীবাসীর জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে ছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু সেই দুর্ভোগ কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে। মেট্রোরেলের পিলার আশ-পাশে কংক্রিট ও স্টিলের বেড়া অপসারণ করে সড়ক মসৃণ করা হচ্ছে। মেট্রোরেলর পিলারগুলোকে শুধু রক্ষার্থে ছোট পরিসরে সড়কের মাঝ বরাবর সিমেন্টের ব্লক দেওয়া হচ্ছে। ফলে সড়কের শতভাগ অংশ খুলে দেওয়া হচ্ছে। কারণ মেট্রোরেল পিলার শুধু সড়কের মিডিয়ান বরাবর অবস্থান করছে।  

উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও ৯টি স্টেশন নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে। ফলে সড়কে কোনো কাজ নেই। এজন্য মেট্রোরেলের পিলার বাদ দিয়ে বাকি সড়ক জনগণের জন্য উন্মুক্ত করার কাজ চলমান। সব স্টেশনের উপ কাঠামো নির্মাণ এবং সব ভায়াডাক্টের ওপর স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী ও মিরপুর-১০ নম্বর স্টেশনের ছাদ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এখন মিরপুর-১১, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এবং আগারগাঁও স্টেশনের ছাদ নির্মাণ শেষ পর্যায়ে। উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ ও পল্লবী স্টেশনের স্টিলের ছাদ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। মিরপুর-১১ স্টেশনের ছাদ নির্মাণ চলমান। তবে কিছু স্টেশন সংলগ্ন সড়ক এখনো উন্মুক্ত করা হয়নি। কারণ অনেক স্টেশনের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়নি।

নগরীরর কাজীপাড়া এলাকায় মেট্রোরেলের পিলারের পাশ দিয়ে পিলার তৈরি করছেন নীরব হোসেন।

এই প্রসঙ্গে বাংলানিউজকে নীরব হোসেন বলেন, মেট্রোরেল পিলার নির্মাণ করার জন্য সড়ক বন্ধ থাকতো। কাজ শুরুর পর থেকেই বন্ধ ছিল। এখন সব কিছু খুলে দেওয়া হচ্ছে। পিলার ছাড়া আর কিছু থাকছে না সড়কে। ফলে সড়কের বেশিরভাগ অংশ মানুষ ব্যবহার করতে পারছে।  

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্র জানায়, উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার অংশে যেহেতু সড়কে মেট্রোরেলের কোন কাজ বাকি নেই এজন্য সবকিছু সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই কাজ সম্পন্ন হবে। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন ছিদ্দিক বাংলানিউজকে বলেন, আগারগাঁও থেকে উত্তরা পর্যন্ত মেট্রোরেলের কারণে সড়কে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। আমরা সবকিছু সরিয়ে নিচ্ছি। ইতোমধ্যেই নির্মাণ সামগ্রী অপসারণ কাজ শুরু হয়েছে, স্বল্প সময়ে এই কাজ সম্পন্ন হবে। সড়কে  জনসাধারণের চলাচল উন্মুক্ত হবে। শুধু পিলারগুলো সড়কের মাঝখানে থাকবে। মিডিয়ানের বেশি সড়ক আমরা নিচ্ছি না। বলা চলে আগারগাঁও থেকে উত্তরা পর্যন্ত শতভাগ সড়ক যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে।  

বৈশ্বিক মহামারি পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেলের নির্মাণ এগিয়ে চলছে। মেট্রোরেল প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৬৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ইতোমধেই দৃশ্যমান হয়েছে সাড়ে ২৭ কিলোমিটার রেল ট্র্যাকের কাজ এবং আগারগাঁও থেকে মতিঝিলের অগ্রগতি ৬৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুসরণে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার বর্ধিত করার জন্য বর্তমানে ডিটেইল ডিজাইন ও ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলমান। ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সিস্টেম এবং রোলিং স্টক(রেল কোচ) ও ডিপো ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করা কাজের অগ্রগতি ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ইতোমধ্যে মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। ভাড়া নির্ধারণে ভারতসহ অন্যান্য দেশকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এসব দেশে যেসব বিষয় আমলে নিয়ে ভাড়া নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ একই পথ অনুসরণ করবে।

ডিএমটিসিএল জানায়, ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার  ভায়াডাক্টের মধ্যে ১৩ দশমিক  ২৭৫ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট দৃশ্যমান হয়েছে। প্যাকেজ-০৭ এর আওতায় ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল সিস্টেম কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। উত্তরা ডিপোতে রিসিভিং সাব স্টেশনের পূর্ত কাজ শেষ করে বিদ্যুতায়নের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। মতিঝিল রিসিভিং সাব স্টেশনের ভবন নির্মাণ কাজ চলমান। ডিপো এলাকার ওয়ার্কশপ শেডের অভ্যন্তরে ১২টি রেল লাইনের নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। স্ট্যাবলি শেডের অভ্যান্তরে এবং সংলগ্ন ইয়ার্ডে ১৯টি ব্যালাস্টেড রেললাইনের মধ্যে সব লাইনের স্থাপন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ভায়াডাক্টের ওপর মেইন লাইনের ২ হাজার ৬৭৮টি লে জয়েন্ট ওয়েল্ডিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আগারগাঁও পর্যন্ত ২৩ দশমিক ৯৬ কিলোমিটার রেল ট্র্যাক লাইনের মধ্যে সাড়ে ১৭ কিলোমিটার রেল ট্র্যাক অ্যালাইনমেন্টের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তার মধ্যে ১৪ দশমিক ৫০ কিলোমিটার রেল লাইন স্থাপন কাজ চলমান। সাড়ে ১২ কিলোমিটার ওয়্যারিং সম্পন্ন হয়েছে।

ঢাকার যানজট নিরসন ও নগরবাসীর যাতায়াত আরামদায়ক, দ্রুততর ও নিবিঘ্ন করতে ২০১২ সালে গৃহীত হয় মেট্রোরেল প্রকল্প। প্রকল্পের মোট ব্যয় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এরমধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ঋণ দিচ্ছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)।

বাংলাদেশ সময়: ১৭৫৭ ঘণ্টা, জুলাই ১২, ২০২১
এমআইএস/এএটি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa