ঢাকা, সোমবার, ২ কার্তিক ১৪২৮, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জাতীয়

দৃষ্টিহীন চোখে বেদনার অশ্রু

দীপন নন্দী, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৫৫৯ ঘণ্টা, জুলাই ১১, ২০২১
দৃষ্টিহীন চোখে বেদনার অশ্রু মুরশিদ আলী, ছবি: শাকিল

ঢাকা: চোখে দেখেন না মুরশিদ আলী। তার দৃষ্টিহীন চোখে বাধ মানছে না অশ্রুকণা।

ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে উঠছেন তিনি। বারবার একটা কথা, আমার যে মেয়ে ফুলের টোকা সইতে পারতো না, তার পুরোটা শরীর আগুনে পুড়লো। কীভাবে আদরের মেয়ে সহ্য করলো আগুনের গরম।

মুরশিদ আলীর মেয়ে আমেনা বেগম কাজ করতেন নারায়ণগঞ্জের সেজান জুস ফ্যাক্টরিতে। বৃহস্পতিবারের (৮ জুলাই) আগুন কেড়ে নিয়েছে তার প্রাণ। এতটাই দগ্ধ হয়েছে শরীর, যা শনাক্তে প্রয়োজন ডিএনএ পরীক্ষা। যার জন্য রোববার (১১ জুলাই) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গের সামনে স্থাপিত বুথে নমুনা দিতে এসেছিলেন তিনি।

ডিএনএ শনাক্ত বুথের পাশে মুরশিদ আলী চোখ মুছছিলেন। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে বলেন, আপনারা এর বিচার করেন। আমার নাতি এতিম হয়ে গেছে। কীভাবে ওরে বড় করবো? আপনারা এর বিচার করেন।

মুরশিদ আলীর ক্ষুব্ধ কণ্ঠের বেদনা তখন চোখের অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ছিল। মানুষের ভিড় ঠেলে তার পাশে বসতেই জানালেন, সর্বশেষ রোজার ঈদের আগের দিন কথা হয়েছিল মেয়ের সঙ্গে।

বললেন, রোজার ঈদের আগের দিন কথা হইছিল মেয়েটার সঙ্গে। এর পরে আরেকদিন ফোন দিছিলাম, রিং হইছিল, ধরে নাই। আমার মেয়ের রা আর শুনতে পাইলাম না। আমার মেয়ে যে কীভাবে চিল্লাইছে? একটা ফুলের টোকা শরীরে সয় না। তার যে সারাটা শরীর যে পুড়লো, এ ক্যামনে সহ্য করলো?

আবারও অশ্রুসিক্ত মুরশিদ আলী বললেন, আমার নাতিরে বাসায় নিয়ে যেতে চাইছিলাম। হ্যায় আমারে জিগাই, আপনের বাড়িতে কী আমার আম্মু আছে? আমার আম্মুরে দিবাইন? আমি ওর আম্মুরে কই থেকে দিয়াম?

আমেনা বেগমের ছেলে রাফিনের বয়স চার বছর। বাবা রাজীব হাসানের সঙ্গে সেও এসেছিল মর্গের সামনে। এখনও সে জানে না তার গর্ভধারিনী বিদায় নিয়েছে পৃথিবী থেকে।

অস্ফুট স্বরে বললো, আম্মু দাদার বাড়ি গেছে। আসবে। আমারে খাওয়াইয়া দেবে।

রাফিনের কথা যেন হৃদয়ে আঘাত হানছিল সবার। হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো চারপাশে। পাশে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছিলেন রাজীব হাসান। তিনিও একই কারখানায় কাজ করতেন।

বললেন, আমার অফিস কেবল ছুটি হয়েছিল। বাইরে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম। এর পর দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেও যেতে পারিনি। আমি আমার বউরে বাঁচাতে পারলাম না। আমার ছেলেটা এতিম হয়ে গেল।

বিচার চান কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কার কাছে বিচার চাইবো? আমরা গরিব মানুষ, হ্যারা বড়লোক। আমি শুধু লাশটা চাই। লাশটারে মাটি দিতে চাই। আর পোলার দিকে যেন সবাই একটু দেখে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় অবস্থিত সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২৯ ঘণ্টা পর ডেমরা, কাঞ্চনসহ ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজ সম্পন্ন করে। কারখানা থেকে উদ্ধার করা হয় ৫২ জনের মরদেহ। আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন।
 

বাংলাদেশ সময়: ১৫৫৭ ঘণ্টা, জুলাই ১১, ২০২১
ডিএন/আরবি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa