ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ কার্তিক ১৪২৮, ২১ অক্টোবর ২০২১, ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জাতীয়

খসে পড়েছে কারখানা ভবনের ছাদ!

শেখ জাহাঙ্গীর আলম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০০৪ ঘণ্টা, জুলাই ১০, ২০২১
খসে পড়েছে কারখানা ভবনের ছাদ! ছবি: শাকিল আহমেদ

নারায়ণগঞ্জ থেকে: আগুনের ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে, ভবনের নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার জায়গায় জায়গায় ভেঙে পড়েছে।

আগুনের তাপে ছাদগুলোর আস্তরণ খসে পড়েছে। উপরের তিন ফ্লোরের ছাদ জায়গায় জায়গায় দেবে গেছে।

ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেজান জুস কারখানার প্রতিটি ফ্লোরই ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনের চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার তিনটি ফ্লোরই এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর।

তবে ঝুঁকি নিয়েই ভবনে ডাম্পিংয়ের কাজ করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

শনিবার (১০ জুলাই) নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ভেতরে সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেনেন্স) দেবাশীষ বর্ধন বাংলানিউজকে বলেন, ভবনে দাহ্য পদার্থ বেশি থাকায় আগুন নির্বাপণ করতে ৪৫ ঘণ্টা সময় লেগেছে। ভেতরে কোনো প্রকার ফায়ার সেফটি নেই। পুরো ভবনটি ত্রুটিপূর্ণ থাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এত প্রাণহানি ঘটেছে। কারখানাটিতে ফায়ার সেফটি প্ল্যানের কোনো অনুমোদন ছিল না।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বলছেন, ভবনটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার ছাদ ও ফ্লোর নাজুক অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো সময় এই ছাদগুলো ভেঙে পড়তে পারে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ভবনের নিচতলায় ছিল গোডাউন৷ গেটে লেখা— সেন্ট্রাল স্টোর। সেখানে কার্টন, কর্ক, বোতল, প্লাস্টিকের দানা মজুদ রাখা ছিল। দাহ্য সেই সবই আগুনে পুড়ে গেছে। দ্বিতীয় তলা ও তৃতীয় তলায় কারখানা। চতুর্থ তলায় জুসের মেশিনের পাইপ ও প্যাকেজিং করার মেশিন, পঞ্চম তলায় জুস ও ললিপপ তৈরির ভারী মেশিন দেখা যায়। এগুলো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ভবনের ষষ্ঠ তলাও গোডাউন। সেখানে স্তরে স্তরে কার্টন রাখা ছিল। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার ছাদ আগুনে পুড়ে খসে পড়েছে৷ অনেক জায়গায় দেবে গেছে। ভবনের ছাদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিমগুলো থেকে ছাদ দেবে গেছে। জায়গা জায়গায় সিমেন্ট খসে পড়তে দেখা গেছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বাংলানিউজকে বলেন, ভবনটি বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে ফায়ার ফাইটাররা সেখানে কাজ করছেন। ভবনে কোনো ধরনের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। ভবনের পরিধি অনুযায়ী সিঁড়ি রাখা হয়েছে মাত্র দুটি। তাও সরু। ভবনটিতে কোনো বহির্গমণ সিঁড়ি নেই। যে কারণে এত প্রাণহানি ঘটেছে৷

শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভবনের পর্যবেক্ষণ করেন ইলেক্ট্রনিক সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ নামে একটি সংস্থা। তারা ভবনের বিভিন্ন অংশের পর্যবেক্ষণ করেন।  

সংস্থটির ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনজুর আলম বলেন, এই ভবনের নকশার অনুমোদনের আগেই ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি মূলত সেন্ট্রাল স্টোর হিসেবে করা হয়েছিল। ভবনের ফায়ার সেফটির কোনো অনুমোদন নেই। ভেতরে আমরা পরিদর্শন করে কোথাও সামান্য এক্সটিংগুইশারও দেখিনি।

তিনি বলেন, এই ভবন নির্মাণে ও কারখানা পরিচালনায় অনেক ব্যত্যয় আমরা পেয়েছি। তবে নকশার অনুমোদনের আগে ভবন নির্মাণ করা একটি বড় ত্রুটি হিসেবে আমরা দেখছি।

ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে ফায়ার সার্ভিস, কল-কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রথম দিন তিনজনের মৃত্যু হয়। আহত হন অর্ধশত শ্রমিক। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর শুক্রবার ওই ভবনের চারতলা থেকে ২৬ নারীসহ আরও ৪৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে ৫২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

৫২ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. আবুল হাসেম এবং তার ছেলে হাসীব বিন হাসেমসহ ৮ জনকে আসামি করে রূপগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। আসামিদের সবাইকে আটক করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৯৫৮ ঘণ্টা, জুলাই ১০, ২০২১
এসজেএ/এমজেএফ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa