ঢাকা, সোমবার, ২ কার্তিক ১৪২৮, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জাতীয়

মা-মেয়ে-বোন, শোকে পাথর হয়ে আছে অসংখ্য চোখ

হোসাইন মোহাম্মদ সাগর, ফিচার রিপোর্টার | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯৫৯ ঘণ্টা, জুলাই ১০, ২০২১
মা-মেয়ে-বোন, শোকে পাথর হয়ে আছে অসংখ্য চোখ ছবি: রাজীন চৌধুরী

ঢাকা: একসঙ্গে একই ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন মা পারভীনা আক্তার এবং মেয়ে তাসলিমা খাতুন। দুজনের কাজের জায়গাও ছিল এক, চতুর্থ তলা।

দুপুর ১টায় মা-মেয়ে দুপুরের খাবারও খেয়েছেন একসঙ্গে। তখনো সব ঠিক আছে। কিছুক্ষণ পর ভবনের একতলার প্রোডাকশন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। এসময় কাজের জন্য মা পারভীনাকে পাঠানো হয় এক তলায়। সেভাবেই দুইজন কাজ করছিলেন দুই ফ্লোরে। এরপর সন্ধ্যায় আগুন লাগলে নিচতলা থেকে সকলকে বের করে দেওয়া হলেও চতুর্থ তলা থেকে বেরুতে পারেনি মেয়ে তাসলিমা খাতুন। অনেক চেষ্টা করেছেন মা, তবে ওই সময় আর কাউকে ভবনে প্রবেশ করতে না দেওয়ায় আহাজারিতে বুক ফাটিয়েছেন পথেই। মেয়ে পুড়েছে। সে আগুন যে চোখে মা দেখেছেন, সেই চোখ এখনো পাথর হয়ে আছে শোকে।

শনিবার (১০ জুলাই) দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতাল মর্গে এসে যখন মেয়ের মরদেহের জন্য ডিএনএ টেস্ট করতে নমুনা দিচ্ছিলেন, তখন কথা হয় তার সঙ্গে। মায়ের মুখ থেকে কথা বেরুই না, শুধু দুটো চোখ তাকিয়ে থাকে অপলক, দৃষ্টি শূন্য হয়ে। সে চোখে জল আছে। টলটলে জল, যেন শরীরে একটু ঝাকুনি লাগলেই তা গড়িয়ে পড়বে।

হঠাতই কানে এসে বাজে জোর কান্নার আওয়াজ। একটু এগিয়ে যেতেই মধ্যবয়সী এক নারী মানুষ দেখে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন- ‘আমার বোইন কই! আমার বোইনডারে দয়া করে দিয়া দেন আপনেরা, দয়া করে দিয়া দ্যান’।

একটু এগিয়ে হাতে ছোট্ট একটা শিশুকে শক্ত করে আকড়ে ধরে আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘আমরা দুই বোন একসঙ্গে ডিউটিতে গেছি। আমার বোইন এক সেকশনে কাজ করে, আমি আরেক সেকশনে। আমার বোইন যেই সেকশনে কাজ করে ওইখানেই আগুন লাগছে। এরপর আমার স্যারকে বলে বাইরে বেরিয়ে দেখি কি সবাই আছে, কিন্তু আমার বোইন বের হয় নাই। তারপর আবার ভেতরে গেছি। সেখানে দেখি কি আমার বোইন নাই। আগুন লাগছে। আগুন লাগার পরে আমার বোইনরে খুইজ্জা আমি পাই নাই। সিকিউরিটিরে আমি কইছি কি- স্যার সাইড দেন, সাইড দেন, আমার বোইনে এই জায়গায় আছে। সিকিউরিটি আমারে ধাক্কা দিয়ে বাইর কইরা দিছে। আমি অনেকক্ষণ খুজছি, পাই নাই। রাইত ১১টা বাজেও মনে করেন ছাদে থেইক্যা লোক নামছে, মই দিয়ে নামাইছে। আমি তখন ভাবছি কি আমার বোইন বোধহয় ছাদে আছে। কিন্তু দেখি আমার বোইন আর নাই। যারা পানি দিয়া আগুন নিভায়, তাদের কতবার কইছি- ভাই ওইখানে আমার বোইনডা আছে, আমারে একটু ঢুকতে দেন। কিন্তু ঢুকতে কেউ আর দেয় নাই ভাই, আমারে কেউ ঢুকতে দেয় নাই। এই যে আমার বোনের মাইয়াডা, কোনো কিছু কয় নাই। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠছে। অন্যদিন মায়ের হাতে খাই। আমি খাওয়াইতে গেলেও খাই না। কই যে- আমার মা আইনা দেন আন্টি, আমার মা আইন্না দেন। আমার মা কই, লইয়া যান। আমার বোইনডারে দয়া করে দিয়া দেন আপনেরা, দয়া করে দিয়া দ্যান’।

বোন অমৃতা বেগমের মরদেহ শনাক্তের জন্য বোনের চার বছরের মেয়ে সোমাকে নিয়ে ডিএনএ নমুনা দিতে এসে এভাবেই আহাজারি করে কেঁদে কেঁদে কথাগুলো বলছিলেন রোজিনা আক্তার। স্বজনের সেই আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ। সেই বেদনাময় পরিবেশেই ধীরপায়ে এগিয়ে আসে নয়ন। নয়নের বয়স কত হবে? বড় জোর পাঁচ থেকে ছয়। তার নানির হিসাব অনুযায়ী সাত।

বাস্তবতা এখনও ছুঁতে না পারা এই শিশুকেও এখনো স্পর্শ করেনি মায়ের মৃত্যু। সেজন্যই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে এখনও শনাক্ত না হওয়া অবলীলায় বলে উঠলো ‘আম্মুকে নিতে এসেছি’।

বাবা তৌহিদুর ও নানি কল্পনা বেগমের হাত ধরে ঘুরে ফিরছিল মর্গের এদিক-ওদিক। এরই ফাঁকে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। দৃষ্টি শূন্য চাহনিতে নয়ন বাংলানিউজকে বলে, ‘আমার মা নেই। সকালে এখানে এসে মাকে দেখিনি। আমি আমার আম্মুকে নিতে এসেছি’।

শনিবার সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতদের স্বজনরা ভিড় জমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গের সামনে। এ মুহূর্তে সেখানে ৪৮টি মরদেহ রয়েছে। মরদেহগুলোর ডিএনএ টেস্ট চলছে। এরপর ঢামেকের ইমারজেন্সি মর্গে আটটি মরদেহ, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ১৫টি ও বাকিগুলো ঢামেকের ফরেনসিক মর্গে রাখা হবে।

এদিকে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগবে মরদেহের ডিএনএ পরিক্ষার ফলাফল আসতে। মরদেহের মধ্যে সাতজন পুরুষ ও সাতজন নারী চিহ্নিত হয়েছে। বাকিগুলো এখনও অজ্ঞাত বা বুঝা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান।

 

এছাড়া এদিন দুপুর ২টা পর্যন্ত ৩০টি পরিবারের ৪২ জনের স্বজন নমুনা দিয়েছে বলে জানিয়েছে ঢামেকে দায়িত্বরত পুলিশের সিআইডি বিভাগ।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় অবস্থিত সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২৯ ঘণ্টা পর ডেমরা, কাঞ্চনসহ ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজ সম্পন্ন করে। কারখানা থেকে উদ্ধার করা হয় ৫২ জনের মরদেহ। আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন।

আরও পড়ুন>>

>>> ৫২ জনের মৃত্যু: গ্রেফতারকৃতদের ১০ দিন করে রিমান্ডের আবেদন
>>> আবুল হাসেম ও তার ছেলেসহ গ্রেফতার ৮
>> দগ্ধ ৩০ মরদেহ শনাক্তে ৪২ জনের নমুনা সংগ্রহ
>> ‘ভবনের ছাদে উঠার পথ বন্ধ থাকায় মৃত্যু বেড়েছে’
>> নারায়ণগঞ্জে অগ্নিকাণ্ড: কারখানায় ছিল না পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা
>> নারায়ণগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৩ তদন্ত কমিটি
>> ২৯ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে, ফের উদ্ধার অভিযান সকালে
>> সেজান জুস কারখানায় আগুন: ধসে পড়ছে ভবন, ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা
>> গেট ভাঙতে পারলেও তালা ভাঙতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস
>>> রূপগঞ্জে অগ্নিকাণ্ড: অর্ধশতাধিক মৃত্যুর ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন
>>>নিয়ন্ত্রণে আসেনি সেজান জুসের কারখানার আগুন, নিহত ৩
>>সেজান জুসের কারখানায় আগুন: কয়েকজন ঢামেকে ভর্তি
>>>রূপগঞ্জে সেজান জুসের কারখানায় আগুন, নিহত ২
>>>১৫ ঘণ্টাও নেভেনি আগুন, ফায়ার সার্ভিসের ক্লান্তিহীন চেষ্টা
>>>জুস কারখানায় অতিরিক্ত দাহ্য পদার্থ থাকায় নিয়ন্ত্রণে আসছে না আগুন
>>>জীবিত নেই কেউ, প্রিয়জনের খবর পেতে স্বজনদের অপেক্ষা
>>> সেজানের পোড়া কারখানা থেকে বের হলো ৫২ মরদেহ
>>> জুস কারখানায় আগুন: গাফিলতি থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা
>>> বু’র সঙ্গে আমার আর শেষ কথা হলো না...

বাংলাদেশ সময়: ১৭৫৯ ঘণ্টা, জুলাই ১০, ২০২১
এইচএমএস/কেএআর

 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa