ঢাকা, রবিবার, ৮ কার্তিক ১৪২৮, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জাতীয়

এই অপেক্ষার শেষ কোথায়?

দীপন নন্দী, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮০৯ ঘণ্টা, জুলাই ১০, ২০২১
এই অপেক্ষার শেষ কোথায়? মরদেহ নিতে মর্গের সামনে অপেক্ষায় স্বজনরা। ছবি: রাজীন চৌধুরী

ঢাকা: চোখে জল, হাতে ছবি। দৃষ্টিতে প্রতীক্ষা।

রাত গড়িয়ে ভোর পেরিয়ে দুপুর নেমেছে। কিন্তু পাওয়া যায়নি কোনো খোঁজ। নারায়ণগঞ্জের জুস ফ্যাক্টরির অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের ভিড় বেড়েই চলেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গের সামনে। স্বজন হারা রিক্ত মানুষগুলোর একটাই চাওয়া-স্বজনদের মরদেহ।  

শনিবার (১০ জুলাই) সকাল থেকে বিকেল অব্দি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য নজরে পড়ে।

ভাই মোহাম্মদ আলীর মরদেহের খোঁজে মর্গের সামনে এসেছিলেন মিজানুর রহমান।  

তিনি বলেন, আগুন লাগার পর ছয়টা তিন মিনিটে ভাই আমারে ফোন দিছিলো। দিয়ে বলে, ভাই তোরা আমারে মাফ করে দিস। আমার জন্য দোয়া করিস। আর আমার ছেলেরে দেখিস। আমি জিজ্ঞাস করলাম, তোর কী হয়েছে? ও বললো, আমার চারপাশে আগুন আর ধোঁয়া। আমি চোখে কিছু দেখতে পারছি না। নিশ্বাস নিতে পারতেছি না। আমি ওপরে উঠে যাওয়ার কথা বললে, সে জানায়, তাদের ফ্লোরের গেটে আর সিঁড়ি তালা মারা। ওর সঙ্গে আরো ৫০ থেকে ৬০ জন লোক ছিলো। তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের মাত্র দেড় বছর আগে বিয়ে হয়েছিলো। ওর একটা ছেলে, রুমান নাম। ছেলেটার বয়স মাত্র দুই মাস দশ দিন। ও ফোনে বারবার ছেলেকে দেখে রাখতে বলছিলো।  

মাত্র ১২ বছর বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে চাকরিতে যোগ দেয় ভোলার চরফ্যাশনের দক্ষিণ আমিনাবাদ কবি মুজাম্মেল হক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মো. হাসনাইন। বাবার চিকিৎসার খরচ যোগাতে বইয়ের ব্যাগ ফেলে চাকরিতে জয়েন করে সে।  

তার খালা লাইজু বলেন, হাসনাইনের বাবা ফজলুল হক অসুস্থ। গলা দিয়ে রক্ত বের হয়। এ অবস্থায় পাঁচ হাজার টাকা বেতনে চাকরিতে যোগ দেয় সে।  
বাবা ফজলুল হক বলেন, আমি আমার ছেলেরা মানা করছিলাম। ও শোনে নাই। বলছিলো, ঘর চালাতে হবে। আজ আমার সব শেষ হয়ে গেলো রে, সব শেষ হয়ে গেলো।  

কিশোরগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন নাজমুল। দুই মাস কাজ করলেও হাতে পাননি বেতন। আজ সেসব চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে। আর তার বাবা চাঁন মিয়া ছেলের ছবি হাতে নিয়ে ঘুরছিলেন মর্গের সামনে।  

বললেন, আমার এক ছেলে, দুই মেয়ে। মেয়ে দুইটা ছোট। গরিব মানুষ। পোলাটারে কাজ পাঠায়ছিলাম। জানতাম না পোলাটার লাশ খুঁজতে আসতে হবে।  
শেষ কবে কথা হয়েছিলো, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিন দিন আগে পোলাটার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিলো।  

এদিকে শনিবার সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতদের স্বজনরা ভিড় জমাচ্ছেন ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতাল মর্গের সামনে। এ মুহূর্তে সেখানে ৪৮টি মরদেহ রয়েছে। মরদেহগুলোর ডিএনএ টেস্ট চলছে। এরপর ঢামেকের হাসপাতালের ইমারজেন্সি মর্গে আটটি মরদেহ, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ১৫টি ও বাকিগুলো ঢামেকের ফরেনসিক মর্গে রাখা হবে।

এদিকে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগবে মরদেহের ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল আসতে। মরদেহের মধ্যে সাতজন পুরুষ ও সাতজন নারী চিহ্নিত হয়েছে। বাকিগুলো এখনো অজ্ঞাত বা বোঝা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান।  

এদিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৩০টি মরদেহের বিপরীতে ৪২ জনের স্বজন নমুনা দিয়েছে বলে জানিয়েছে ঢামেকে দায়িত্বরত পুলিশের সিআইডি বিভাগ।

বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় অবস্থিত সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২৯ ঘণ্টা পর ডেমরা, কাঞ্চনসহ ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজ সম্পন্ন করে৷ কারখানা থেকে উদ্ধার করা হয় ৫২ জনের মরদেহ৷ আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন।  

বাংলাদেশ সময়: ১৮০১ ঘণ্টা, জুলাই ১০, ২০২১
ডিএন/এএটি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa