ঢাকা, শনিবার, ৭ কার্তিক ১৪২৮, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জাতীয়

রেস্তোরাঁ খোলার সময় বৃদ্ধি ও কর্মচারীদের বেতন দিতে ঋণ দাবি

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩০৫ ঘণ্টা, জুলাই ৮, ২০২১
রেস্তোরাঁ খোলার সময় বৃদ্ধি ও কর্মচারীদের বেতন দিতে ঋণ দাবি

ঢাকা: চলমান সর্বাত্মক ‘লকডাউনে’র অষ্টম দিনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে হোটেল রেস্তোরাঁ খোলা রাখা হলোও এভাবে আর খোলা রাখতে চান না মালিক পক্ষ। রেস্তোরাঁ খোলা রাখায় হোটেল ভাড়া, ইউটিলিটি চার্জ কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সবই দিতে হচ্ছে মালিকদের।

গ্রাহক না থাকায় লোকসান গুণতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এজন্য হোটেল রেস্তোরাঁ খোলা রাখার সময় আরো দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে দেওয়ার দাবি ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যথায় হোটেল রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেবেন তারা। এতে বেকার কর্মচারীদের বেতন-ভাতার ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে বলে জানান খাবার হোটেল ব্যবসায়ীরা।

বৃহস্পতিবার (০৮ জুলাই) সরেজমিনে পুরান ঢাকার বাবুবাজার, নয়াবাজার, বংশাল, গুলিস্তান, পল্টন, বিজয়নগর, শান্তিনগর, মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকার হোটেল ও রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখা গেছে, বেচা-কেনা না থাকায় বেশিরভাগ হোটেল রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যেসব হোটেল ও রেস্তোরাঁ খোলা হয়েছে, সেগুলোতেও বেচা বিক্রি নেই। কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন। হোটেলের ভিতরে কাউকে বসতে দেয়া হচ্ছে না। খাবারের টেবিলে চেয়ার উল্টিয়ে রাখা হয়েছে। শুধুমাত্র পার্সেল দেয়া হচ্ছে। তবে বেশিরভাগ হোটেল-রেস্তোরাঁয় হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা নেই। ক্রেতা- বিক্রেতা ও হোটেল রেস্তোরার কর্মীরা পর্যন্ত মাস্ক ব্যবহারে উদাসীন।

জনসন রোডের আদি ইসলামিয়া রেস্তোরার ম্যানেজার ফারুক আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, আমরা রেস্তোরাঁ পরিচালনা করার জন্য সরকার যেসব নির্দেশনা দিয়েছে, সেগুলো মেনেই রেস্তোরাঁ খোলা রেখেছি। শুধু পার্সেল দেয়া হচ্ছে। ফলে আমাদের বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে। এভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কষ্টকর।  
সরকার আমাদের দিকে সদয় বিবেচনায় যদি হোটেল খোলা রাখার সময় সন্ধ্যা ৮ থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত করে দেয় তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো। আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করবো।  

তিনি বলেন, সরকার যদি এটা না করে তাহলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ দিয়ে বন্ধ করে দিলে আমরা বেঁচে যায়। কারণ ব্যবসা পরিচালনা করেও আমরা এখন যে বেচা কেনা হচ্ছে তা দিয়ে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারব না। হোটেল বন্ধ করার কথা বললে কর্মচারীরা বলেন যে কয়দিন বন্ধ থাকবে সে কয়দিনে বেতন দিতে হবে। যেহেতু সরকার খাবার হোটেল খোলা রাখতে বলেছে। এখন আমরা কি করব বলেন? এজন্য সরকারকে অন্যান্য খাতের মতো এ খাতেও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে প্রণোদনাসহ সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে এ খাতের ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের পথে বসতে হবে।  

পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার মোড়ের কালামস কিচেন চাইনিজ রেস্টুরেন্টের কর্মচারী নুর আলম বাংলানিউজকে বলেন, শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমরা রেস্টুরেন্ট খোলা রেখেছি৷ শুধু পার্সেল বিক্রি করছি। ফলে প্রতিদিন আমাদের বিক্রি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা কমে গেছে। এভাবে চললে মালিক রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেবেন বলে জানিয়েছেন। আর রেস্টুরেন্ট বন্ধ হলে আমরা খাব কি? বেকার থাকলে তো বাবাও বাড়িতে রাখবেন না। মালিক বলেছেন, রেস্টুরেন্ট খোলা থাকলে আমরা ডাল-ভাত খেতে পারব। বেতনের আশা করা যাবে না। সামনে কোরবানির ঈদ, বেতন-ভাতা না পেলে কি করব? কষ্ট হলেও পেটে ভাতে আছি।

পুরানা পল্টনের বৈশাখী রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার মো. সেলিম সরকার বাংলানিউজকে বলেন, বেচাকেনা আগের মতো নেই। হঠাৎ একদিন কাস্টমার কমে গেছে। করোনা প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনার কারণেই কাস্টমার আসতে ভয় পাচ্ছেন। আমরা মনে করি, নির্দেশনা আরও শিথিল করা দরকার।

পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের শাপলা রেস্তোরাঁর ম্যানেজার মো. সাখাওয়াত বাংলানিউজকে বলেন, কঠোর ‘লকডাউনে’র প্রথম সাতদিন ঠিক ছিল। দ্বিতীয় বার যখন আরো সাতদিন বাড়ানো হলো, সেটা আজ থেকে কার্যকর হলো। কিন্তু আমাদের ব্যবসার যে অবস্থা, আমরা তিন বেলা খাবার বিক্রি করতে না পারলে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেব কীভাবে? গত সাতদিন ধরে শুধু সকাল ও বিকেলের নাস্তা বিক্রি করছি। সেটা দিয়ে দোকান ভাড়া ওঠে না। কর্মচারীদের বেতন কীভাবে দেব? তাই আগামী দুই-তিনদিন দেখে রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেব। সরকার যদি আমাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য অন্যান্য খাতের মতো ঋণের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা এ দুর্যোগের সময় কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ঠিকমতো দিতে পারব।  

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বাংলানিউজকে বলেন, বর্তমান ‘লকডাউনে’ স্বাস্থ্যবিধি মেনে হোটেল ও রেস্তোরাঁ পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে করে আমরা শুধু অনলাইনে ব্যবসা করতে পারব। কিন্তু সেই সক্ষমতা সবার নেই। ফলে আমাদের দুই-তিন ভাগ ব্যবসা হবে। এ খাতের প্রতিটা ব্যবসায়ী ভয়াবহ বিপদের মধ্যে আছি। বহু ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে গেছে। অনেক রেস্টুরেন্ট হাত বদল হয়ে গেছে। নতুন যারা আসছেন, তারাও পকেট থেকে খরচ চালাচ্ছেন। আমাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে গেছে। আমরা চাই, সরকার আমাদের বিনা সুদে বা সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করুক। যাতে এ খাতের ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারেন।  

তিনি বলেন, আমরা ‘লকডাউনে’র বিপক্ষে না। আমরা বর্তমানে রাত ৮টা পর্যন্ত খাবারের হোটেল খোলা রাখতে পারি। এতে করে সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য রাত ১০টা পর্যন্ত খাবারের হোটেল খোলার অনুমতি দিলে মালিকরা কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ঠিক মতো দিতে পারবেন। তা না হলে কর্মচারীদের ছুটি দিয়ে হোটেল রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দিতে হবে।  

তিনি আরো বলেন, এখাতে প্রায় ৩০ লাখ লোক কাজ করেন। ৬০ হাজার মালিক রয়েছেন। বিএডিসির হিসাবে চার লাখ ২১ হাজার হোটেল ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। তবে আমরা ৬০ হাজার বলি, কারণ আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের তালিকা ভুক্ত। এছাড়া আরো ১০ হাজার রয়েছেন আমাদের তালিকার বাইরে, যারা তালিকাভুক্ত হননি। সব মিলিয়ে দুই কোটি লোক এ খাতের ওপর নির্ভরশীল।  

এদিকে প্রথম দফায় সাতদিনের ‘লকডাউন’ শেষ হয়েছে বুধবার (৭ জুলাই)। ৮ জুলাই থেকে আরো সাতদিনের দ্বিতীয় দফা ‘লকডাউন’ চলবে ১৪ জুলাই মধ্যরাত পর্যন্ত। এ বিষয়ে গত সোমবার (০৫ জুলাই) বিধিনিষেধ আরোপ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বৃহস্পতিবার (০৮ জুলাই) সকাল ৬টা থেকে সারা দেশে সাতদিনের জন্য কঠোর ‘লকডাউন’ শুরু হয়েছে। ‘লকডাউন’ কঠোরভাবে বাস্তবায়নে পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও সেনাবাহিনী মাঠ আছে। এ সময়ে জনসাধারণ ও যানবাহন চলাচল এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।  

এছাড়া প্রজ্ঞাপনে ২১ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো-  সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে। সড়ক, রেল ও নৌপথে গণপরিবহনসহ সব প্রকার যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলও বন্ধ থাকবে। শপিংমল/মার্কেটসহ সব দোকানপাট বন্ধ থাকবে। সব পর্যটনকেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ থাকবে। জনসমাবেশ হয়, এ ধরনের সামাজিক (বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান, জন্মদিন, পিকনিক পার্টি ইত্যাদি) রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বন্ধ থাকবে। খাবারের দোকান, হোটেল সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খাবার বিক্রি (অনলাইন/টেক ওয়ে) করতে পারবে, বসে খাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ সময়: ১৩০১ ঘণ্টা, জুলাই ০৮, ২০২১
জিসিজি/এসআই
 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa