ঢাকা, বুধবার, ১৩ আশ্বিন ১৪২৮, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০ সফর ১৪৪৩

জাতীয়

‘চাইল-আটা নো চাই, আঙ্গোরে নদীআন বান্দি দেন’

সোলায়মান হাজারী ডালিম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৭৪১ ঘণ্টা, জুন ১, ২০২১
‘চাইল-আটা নো চাই, আঙ্গোরে নদীআন বান্দি দেন’ প্রতি বর্ষা মৌসুমে মেঘনা গ্রাস করে মাইলের পর মাইল জনপদ। 

প্রতিদিন ভাঙছে মেঘনা। অব্যাহত ভাঙনে ভিটে-মাটি, ফসলি জমিসহ সর্বস্ব হারিয়ে পরিবেশ উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে লক্ষ্মীপুর সদর, রামগতি ও কমলনগরসহ মেঘনা তীরবর্তী লাখ লাখ মানুষ।

প্রতি বর্ষা মৌসুমে এই ভাঙন আরও তীব্র হয়, রুদ্র মূর্তি ধারণ করে মেঘনা। গ্রাস করে মাইলের পর মাইল জনপদ।  

মেঘনা পাড়ের ভাঙন কবলিত এসব মানুষের দুঃখগাঁথা তুলে এনেছেন বাংলানিউজের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট সোলায়মান হাজারী ডালিম। ৫ পর্বের ধারাবাহিকের ১ম পর্ব আজ।  

লক্ষ্মীপুর থেকে ফিরে: লক্ষ্মীপুরের সাহেবের হাট ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের জগবন্ধু গ্রামের শাহিনুর বেগম। মেঘনা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে হাত দিয়ে দেখাচ্ছিলেন, একসময় তার ঘরটি কোথায় ছিল। কিন্তু সেখানে এখন আর কিছুই নেই। সেই জায়গাটি হারিয়ে গেছে নদী ভাঙনে। মাত্র তিনদিন আগেও এখানে ছিল সাতটি বসতঘর, এখন একটিও নেই। সব গেছে নদীর গর্ভে। শাহিনুর বলছিলেন, তার ঘরটা ওইখানে ছিল। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের দিন রাতেই নদীর পেটে চলে যায়। নিজের ঘরের জিনিসপত্র কিছুই রাখতে পারেননি তিনি।  

তিনি বলেন, আগে নদীর ভাঙন এতটা তীব্র ছিল না, গত কয়েকবছর ভাঙন বেড়েছে কয়েকগুণ। আগে ১ কিলোমিটার ভাঙতে যেখানে এক বছর লাগতো, এখন সেটা দুই মাসেই ভাঙছে। তিনি বলেন, বিগত ২০ বছরে তিনি ৭ বার ভিটে মাটি হারা হয়েছেন। নদীর বুকে সব গেছে। নিরুপায় হয়ে অন্যের জায়গায় ভাড়া দিয়ে থাকতে হচ্ছে।  

হাতে ক্যামরা দেখে সাংবাদিক এসেছে ভেবে শাহিনুরের মত ভাঙনের শিকার আরও অনেকেই এগিয়ে আসেন কথা বলতে।

নূর নাহার নামে এক নারী জানান,  তার তিন ছেলে, স্বামী নিয়ে তাদের সংসার। বড় দুই ছেলে বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরে। গত ১০ বছরে চার বার ভেঙেছে তাদের ভিটেমাটি। নিরুপায় হয়ে এখন নদীর পাড়ে ঘর তুলে থাকছেন তারা।  

দেলোয়ার হোসেন নামে ওই এলাকার আরেক বৃদ্ধ বলছিলেন তার দুঃখের কথা, সাহেবের হাট ইউনিয়ন পরিষদের পাশে ছিল তার বাড়ি। বাড়ি-পুকুর-ফসলের মাঠ সব মিলিয়ে ১৮০ শতক জমি ছিল। সব গেছে নদীতে, এখন পথের ভিখারী। কোনো রকমে আরেকজনের একটু জায়গায় ভাড়া দিয়ে থাকছেন। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের দিন তার ঘরে কোমর পরিমাণ পানি ছিল, কোথাও যেতে পারেননি, সারা রাত কোমর পানিতেই কাটিয়েছেন তারা।  

তিনি বলেন, নদীতে যদি বেড়িবাঁধ থাকতো তাহলে তারা রক্ষা পেতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশে করে এ বৃদ্ধ বলেন, ‘চাইল-আটা চাই না, আঙ্গোরে নদীটা বান্দি দেন’। এ বৃদ্ধ বলেন, শুধু তিনি নয়-এখানকার সব বাসিন্দাদের একটাই দাবি টেকসই বেড়িবাঁধ। সাময়িক সাহায্য সহযোগিতা তারা চান না।   

এ তো গেল মেঘনা নদীতে ঘর হারানো মানুষদের কথা। নদী তীরে যাদের ঘর এখনও টিকে আছে তারাও দিন কাটান শঙ্কা নিয়েই। আসছে বর্ষায় কী তাদের ভিটেমাটি থাকবে? নাকি আবার ভাঙবে এবং আবার তারা ঠিকানাহীন হবেন।  

জগবন্ধু গ্রাম থেকে বের হওয়ার পথেই চোখে পড়ে কাদের পণ্ডিত হাট-মাতব্বর হাট সড়ক। সড়কের মাঝ বরাবর লম্বায় প্রায় ৩০ ফুটের মত ভাঙা। এক পাশ থেকে আরেক পাশ পুরো বিচ্ছিন্ন। মানুষ হাঁটুসমান পানি দিয়ে হাঁটছেন।

সে পথ দিয়ে আসা সেলিম উদ্দিন মাঝি নামে একজন জানান, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের দিন রাতে অস্বাভাবিক জোয়ারের স্রোতে রাস্তা ভেঙে যায়। প্রশাসনের কেউ এখনও দেখতেই আসেননি। সেলিম মাঝি জানান, তার বাড়ি চাঁদপুরে। এই এলাকায় বিয়ে করার সুবাদে গত ২০ বছর এখানেই থাকেন।

এই ২০ বছরে নদী ভেঙেছে ২০ কিলোমিটারের মতো-বললেন সেলিম মাঝি।  

বাংলাদেশ অন্যতম প্রধান নদী মেঘনা মূলত সুরমা, ধলেশ্বরী, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও গঙ্গার মিলিত স্রোতধারা। মেঘনার তীরবর্তী জেলাগুলোর মধ্যে চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ভোলা ও বরিশালের কিছু কিছু এলাকা মেঘনার ভাঙনের মধ্যে রয়েছে।  

স্থানীয়রা জানান, লক্ষ্মীপুরের ‘কমলনগর উপজেলার ১৭ কিলোমিটার এলাকার ওপর দিয়ে গেছে মেঘনা নদী। সবদিক দিয়েই মেঘনা ভাঙছে। বর্ষা শুরু হওয়ায় ভাঙন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। সাহেবের হাট, চর ফলকন, পাটারির হাট, মতির হাট এলাকায় ভাঙন তীব্র। প্রতিদিন এসব এলাকার জমি যাচ্ছে মেঘনার বুকে।  

মেঘনার ভাঙনের কারণে এ উপজেলার সাহেবের হাট ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৮টি চলে গেছে নদীরগর্ভে। তলিয়ে গেছে বসতঘর, গাছপালা এবং ফসলি জমি। পাটারির হাট এবং চর ফলকনেরও একই অবস্থা। লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদীর ৩১ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণে প্রকল্পের কাজের ধীরগতির কারণে ভাঙনের এ সমস্যা আরও বেড়েছে।

দীর্ঘদিনের এমন ভয়াবহ ভাঙন থেকে জেলার দুটি উপজেলার ৩১ কিলোমিটার মেঘনা নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয়েছে।  

এ প্রকল্পের জন্য ৩ হাজার ৮৯ কোটি ৯৬ লাখ ৯৯ হাজার টাকা বরাদ্দের ফাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান গত ১৭ মে তারিখে সই করেছিলেন। ফাইলটি মঙ্গলবার (১ জুন) একনেক সভায় উপস্থাপনের পর প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়াল মিটিংয়ে অনুমোদনে দেন।

লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ বাংলানিউজ বলেন, একনেকে প্রধানমন্ত্রী যেহেতু অনুমতি দিয়েছেন সেহেতু আশা করা যাচ্ছে অল্প সময়ের মধ্যে ভয়াবহ ভাঙনকবলিত মেঘনা নদী তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।  

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয়ভাবে জানা যায়, মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের কারণে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ও রামগতি উপজেলার প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৪ সালে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ১৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দে রামগতিতে চার কিলোমিটার এবং কমলনগর উপজেলায় এক কিলোমিটার বাঁধ নিমার্ণ করা হয়।  

২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লক্ষ্মীপুরে এসে অন্যান্য প্রকল্পের সঙ্গে ওই বাঁধগুলো উদ্বোধন করেন। কিন্ত ওই দুই উপজেলার আরও প্রায় ৪৫ কিলোমিটার এলাকা এখনো অরক্ষিত। এমন অরক্ষিত এলাকার প্রায় ৩৭ কিলোমিটার জায়গায় প্রতিনিয়ত ভাঙছে। গত চার বছর ধরে প্রতি জোয়ারে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে।

বাংলাদেশ সময়: ১৭৩০ ঘণ্টা, জুন ০১, ২০২১ 
এসএইচডি/এমআরএ/এএটি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa