ঢাকা, রবিবার, ৫ বৈশাখ ১৪২৮, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ০৫ রমজান ১৪৪২

জাতীয়

সুযোগ পেলেও মেডিক্যালে ভর্তি অনিশ্চিত শাহীনূরের

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৩৩৪ ঘণ্টা, এপ্রিল ৮, ২০২১
সুযোগ পেলেও মেডিক্যালে ভর্তি অনিশ্চিত শাহীনূরের

সিরাজগঞ্জ: মেডিক্যালে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বেলতৈল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র কৃষক আবুল কাশেম (৬২) ও রেনু বেগম (৫৫) দম্পতির ছেলে মো. আরিফুল ইসলাম। এমন খবরে উপজেলার আগনুকালি গ্রামজুড়ে বইছে আনন্দের বন্যা।

২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের এমবিবিএস-এ ভর্তি পরীক্ষায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ কেন্দ্র থেকে অংশ নিয়ে মেধাক্রমে ২৩৩৩তম স্থান অর্জন করেছেন আরিফুল । তিনি বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দ্য বার্ড সেফটি হাউসের সভাপতি মামুন বিশ্বাস বাংলানিউজকে বলেন, ভর্তি পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের মধ্যে আরিফুল পেয়েছেন ৭১ দশমিক ২৫ নম্বর। তার মেডিক্যালে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার কথা শোনার পর থেকে পুরো আগনুকালী গ্রাম জুড়ে আনন্দের বন্যা বইছে। গ্রামের মানুষগুলো তাকে দেখতে ও অভিনন্দন জানাতে তার বাড়িতে এসে ভিড় করছেন।

আরিফুলের পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দরিদ্র কৃষক আবুল কাশেম নিজে মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছিলেন। কিন্তু সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। কাশেমের চার সন্তানের মধ্যে দুই মেয়ে ও দুই ছেলে। দারিদ্রতার কারণে ৭ম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বড় মেয়ে কারিমা খাতুনকে বিয়ে দিলেও বাকি তিন সন্তানকে তিনি শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন। দ্বিতীয় মেয়ে মনজিলা খাতুনকে বিএ তৃতীয় বর্ষে অধ্যায়নরত অবস্থায় বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে আবু রায়হায়ন পাবনার এডওয়ার্ড কলেজে ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স ডিগ্রি পড়াশোনা করছেন। আর সবার ছোট আরিফুল রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন।

স্থানীয়রা বলেন, আরিফুল ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। আগনুকালী পশ্চিম পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পিএসসি পাস করার পর খাষসাতবাড়ীয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এর পাশাপাশি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন। একই স্কুল থেকে এসএসসিতে জিপিএ ৫ এবং পরবর্তীতে রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করেন।

আরিফুল ইসলাম বলেন, স্কুল-কলেজে পড়াশুনার সময় মন চাইলে একটা ভালো পোশাক কিনতে পারতাম না। কারণ আমার জন্ম গরীবের ঘরে। মা-বাবা খুশি হয়ে যা কিনে দিতেন, আমি তাতেই খুশি হতাম। স্কুল ও কলেজে পড়াশুনা করা অবস্থায় বিভিন্ন দিক দিয়ে সহযোগিতা করেছেন স্থানীয় সব শিক্ষকরা। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমি ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারি এ জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।

আরিফুলের বাবা আবুল কাশেম বলেন, নিজে লেখাপড়া করতে পারিনি। ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা করানোর খুব ইচ্ছে ছিল। অনেক কষ্ট করেছি, এখনো করছি। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে নিজের চার বিঘা জমি সম্পূর্ণ বর্গা দিয়ে টাকা নিয়েছি। কিছু জমি বিক্রিও করেছি। এখন একটি সেচপাম্প আছে। সেচপাম্পের আয় দিয়ে সংসার ও সন্তানদের পড়ালেখার খরচ চালাই।

তিনি বলেন, আরিফুলের ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবে। স্বপ্ন পূরণে সে অধিকাংশ সময়ই লেখাপড়ার পেছনে ব্যয় করেছে। আমরা অনেক কষ্ট করেও ওদের বই-খাতার টাকা জোগার করেছি। তবে আল্লাহ আমার ইচ্ছে আর আরিফুলের স্বপ্ন পূরণ করেছেন।

আগনুকালী পশ্চিম পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহবুবুল হোসেন জ্যোত্মা বলেন, আমাদের গ্রামের গর্ব আরিফুল। তিনি আমার স্কুলের ছাত্র ছিল। তিনি ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পাওয়ায় আমরা গর্বিত।

বেলতৈল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ২ নম্বর ওয়ার্ড (আগনুকালি) সদস্য ইয়াকুব আলী বলেন, আরিফুলের বাবা আবুল কাশেম দরিদ্র কৃষক। তার বাড়িতে রয়েছে একটি টিনের ঘর। সেই একটি ঘরেই থাকেন পরিবারের সবাই। এ অবস্থাতে অনেক কষ্ট করেই ছেলে ও মেয়েদের মানুষের মতো মানুষ করেছেন তিনি। খেয়ে না খেয়ে লেখাপড়া খরচ জোগার করেছেন। তবুও কারো কাছে সাহায্য চাননি তিনি। আরিফুলের মেডিক্যালে ভর্তির খবরে গ্রামের সবাই খুশি।

বাংলাদেশ সময়: ০৩৩৪ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৮, ২০২১
আরআইএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa