ঢাকা, বুধবার, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০৮ রবিউস সানি ১৪৪২

জাতীয়

বেকার যুবকদের মডেল হাফিজুল

মো. জাহিদ হাসান জিহাদ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১০৩৩ ঘণ্টা, নভেম্বর ২২, ২০২০
বেকার যুবকদের মডেল হাফিজুল শাহি জাতের পেঁপে চাষ করে বেশ সাফল্য অর্জন করেন হাফিজুল ইসলাম।

কুষ্টিয়া: কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার চিথলিয়া এলাকার কৃষক হাফিজুল ইসলাম। নবম শ্রেণির গণ্ডি পেরিয়ে ইতি হয় লেখাপড়ার।

তারপর থেকে কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

কৃষি অফিসের পরামর্শে এ বছর শাহি জাতের পেঁপে চাষ করে বেশ সাফল্য অর্জন করেন হাফিজুল। মাত্র ১ বিঘা জমিতে ১ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করে এলাকার কৃষকদের মধ্যে সাড়া ফেলে দিয়েছেন তিনি। হাফিজুল এখন এলাকার অন্য চাষিদের কাছে মডেল। তার পুরো বাগানটি যেনো চোখ জোড়ানো এক ক্ষেত। গাছের মাঝ থেকে ডগা পর্যন্ত ছোট, মাঝারি, বড় আকারের পেঁপে ধরে রয়েছে। হাফিজুলের সাফল্য দেখে অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন এই পেঁপে চাষে।

হাফিজুলকে পুরো বাগান ঘুরে দেখা যায়, এ যেনো গাছে টাকা ধরে রয়েছে। এক একটি গাছে প্রচুর পরিমাণে পেঁপে। ৪ দিন আগেও তিনি ৬০ মন পেঁপে বিক্রি করেছেন তার ২২ কাঠা জমির পেঁপে বাগান থেকে।

কথা হয় হাফিজুলের সঙ্গে। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ৫ ভাই এর মধ্যে সবার ছোট ছিলাম আমি। পরিবারের টাকার অভাবে লেখাপড়া করতে পারিনি। মাঠের চাষাবাদ শুরু করি। তারপরে এলাকার অন্য চাষিদের মতো তামাকের চাষ শুরু করি। একসময় দেখি তামাকে একসঙ্গে টাকা পাওয়া যায় ঠিকই কিন্তু প্রচুর কাজ করতে হয়। আর বাড়ির সকলে মিলে এতো কাজের পরেও বিক্রি করলে খুব একটা লাভ হয় না।

তিনি আরও বলেন, ২০১৫ সালে আমাদের চিথলিয়া ব্লকের উপসহকারী কৃষি অফিসার সুকেশ রঞ্জন পাল আমাকে পেঁপে চাষ সম্পর্কে পরামর্শ দেন। কিভাবে বাণিজ্যিকভাবে এ পেঁপের চাষ করা যায় সেটা সম্পর্কে জানি। পরে কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করি পেঁপে চাষ। সেসময় এই পেঁপে চাষ সম্পর্কে অনেকেই অনেক কথা বলতো।

তিনি বলেন, মাত্র ১ বিঘা জমিতে পেঁপের চাষ শুরু করি। গাছ লাগানোর পরে ৩-৪ মাস গাছে পেঁপে ধরলো এবং ৫ মাস পরেই সেটা বাজারে বিক্রির উপযোগী হলো। পেঁপে চাষ খরচ ও খাটুনি কম। আর ভালো দাম পেলে খুবই লাভ হয়। তাই আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। গত বছর ২ বিঘা জমিতে পেঁপে চাষ করি। বিঘাপ্রতি আমার ২০ হাজার টাকা করে খরচ হয়েছিল। আর প্রায় ৯০ হাজার টাকার বেশি করে বিঘা প্রতি পেঁপে বিক্রি হয়েছিলো।

তিনি বলেন, এ বছর আমি ৮ বিঘা জমিতে হাইব্রিড শাহী জাতের পেঁপের চাষ করেছিলাম। অতিরিক্ত বৃষ্টি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আমার ৭ বিঘা জমির পেঁপে গাছ নষ্ট হয়ে যায়। সবে মাত্র এক গাছে ৬-৭ কেজি করে পেঁপে হয়েছিল। বৃষ্টির কারণে গাছগুলো মরে গেলো। তবে সে ক্ষতি পুষিয়ে দিচ্ছে আমার এই ২২ কাঠা জমির পেঁপেতেই।

তিনি আরও বলেন, বাজারে পেঁপের যে দাম তাতে খুবই লাভ। আগে ৩-৪ টাকা কেজি পেঁপে বিক্রি করেছি। তারপরেও লাভ হয়েছে। এখন তো মাঠ থেকেই পাইকারি বিক্রি করছি ২০ টাকা কেজি দরে। বর্তমানে আমার ২২ কাঠা জমিতে ৪৩০-৪৪০টি পেঁপে গাছ আছে। এর মধ্যে ৪০টি রয়েছে পুরুষ গাছ। বাকি সব গাছগুলোতে বেশ ভালো পেঁপে ধরেছে। খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকার মতো।

তিনি আরো বলেন, প্রতি গাছে ২০ কেজি করে পেঁপে পাবো বলে আশাকরি। আর এবার পেঁপের সাইজ খুবই ভালো। আর খেতেও খুব সুস্বাদু। ৪ দিন আগেও এই জমি থেকে ৬০ মন পেঁপে বিক্রি করেছি। এর আগেও ৩ বার পেঁপে বিক্রি করেছি। এক মাস পরপর এ জমি থেকে পেঁপে বিক্রি করি। ইতোমধ্যে আমি এক লাখ টাকার উপরে পেঁপে বিক্রি করেছি। এবং আরো ৫০ হাজার টাকার পেঁপে বিক্রি করবো এই জমি থেকেই। অন্য বছর ৪ বিঘায় যে লাভ হয় না, এ বছর বাজারে দাম ভালো হওয়ায় এক বিঘাতেই তার বেশি লাভ হচ্ছে।

তিনি বলেন, পেঁপে চাষে খুব একটা খরচ নেই। আর পরিশ্রমও কম। আমার কাছ থেকে অনেকেই এই পেঁপে চাষ সম্পর্কে জেনেছে। এছাড়া উপজেলা কৃষি অফিসের লোকজন নিয়মিত আমার ক্ষেত পরিদর্শন করে আমাকে পরামর্শ দেন। যে কারণে কখন কি করতে হবে তা সঠিক নিয়মে করতে পারি।

অন্য চাষের চেয়ে পেঁপে চাষ লাভজনক হওয়ায় হাফিজুল ইসলামের মতো এলাকার অন্য কৃষকরাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন এই পেঁপে চাষে।

একই এলাকার কৃষক মিনহাজ আলী বাংলানিউজকে বলেন, যে পরিমাণ পেঁপে ধরছে তাতে তো দেখছি এই পেঁপে চাষ লাভজনক ফসল। হাফিজুলের দেখা দেখি তার পাশের জমিতে করেবে এই পেঁপে চাষ এমন করে এই পুরো মাঠই তামাকের পরিবর্তে পেঁপে চাষে ঝুঁকবে কৃষকরা। তামাকের মতো তো এতো খাটনির কাজ না, ঘুম কামাই করা লাগে না, মাঠ থেকেই বিক্রি করা যায়। সামনে বছর আমি নিজেও ১০ কাঁঠা জমিতে পেঁপে চাষ করবো বলে মনে করছি।

কৃষক আমিরুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, সবজি হিসেবে পেঁপে খেতে খুবই ভালো লাগে। আর চাষ করতে খরচ কম। এটা চাষ করাও সহজ। আমি ভাবছি ১ বিঘা জমিতে এ শাহী জাতের পেঁপের বাগান করবো।

খুবই কম সময়ে এ পেঁপে চাষ করে কৃষকরা বেশ ভালো লাভবান হতে পারবেন বলে জানান মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র ঘোষ। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, পুষ্টিমানের দিক থেকে পেঁপে খুবই স্বাস্থ্যকর একটি খাদ্য। আর পেঁপের চাষাবাদও খুব সহজ। আর ফলনও খুবই ভালো। বাজারে দামও বেশ ভালো। আমরা কৃষকদের এ পেঁপেসহ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া যায় এমন ফসল চাষাবাদের জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে আমরা কৃষকদের বিনামূল্যে প্রণোদনায় সার, বীজ প্রদান করি। এছাড়া কারিগরি সহযোগিতা এবং পেঁপেসহ বিভিন্ন ফসল চাষের ওপর প্রশিক্ষণ দেই। চিথলিয়া এলাকার হাফিজুল ইসলাম শাহি জাতের পেঁপে চাষ করে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তাকে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেন। এ বছর তিনি বেশ ভালো দাম পেয়েছেন। তার এই সফল্য দেখে অনেক শিক্ষিত বেকার এখন পেঁপে চাষে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশ সময়: ১০৩৩ ঘণ্টা, নভেম্বর ২২, ২০২০
এনটি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa